মতির প্রাথমিক বিস্ময় কেটে গেল। এর আগেও কুসুম গানের শেষে ভাত পাঠিয়েছে। সে জানে, মতি খালি পেটে গান গাইতে আসরে উঠে। গান শেষে অভুক্ত অবস্থায় ঘুমুতে যায়।
জয়নাল দাওয়ায় ভাতের গামলা নামিয়ে রাখল। মতি বলল, হারিকেন থুইয়া যাও জয়নাল–আমার ঘরে বাত্তি নাই। আইজ গান কেন হইছে?
জয়নাল উৎসাহের সঙ্গে বলল, দুর্দান্ত গান ইইছে মতিভাই। গলা একখান আল্লাহপাক আপনেরে দিছিল। সোনাদিয়া,এই গলা বান্ধাইয়া রাখন দরকার। কুসুমেরও গান খুব মনে ধরছে।
বলছে কিছু?
বলছে–মতিভাই আইজ গান গাইয়া মাইনষের চউকে পানি আনছে। মতিভাইয়ের কপালে অনেক দুঃখ।
এই কথা বলল ক্যান?
কুসুমের কি মাথার ঠিক আছে–যা মনে অয় কয়–তয় মতিভাই, জব্বর গান হইছে–পিথিমীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। খাইতে বসেন–ভাত গরম আছে।
তুমিও চাইরডা খাও আমার সাথে জয়নাল।
না না–আফনে খান। আমি যাইগা–বিষ্টি কি নামছে দেখছেন মতিভাই…?
পিথিমী না ডুইব্যা যায়!
উঠোনে পানি জমে গেছে। পানিতে থপ থপ শব্দ তুলে জয়নাল চলে গেল। মতি খেতে বসল। গরম ভাত, ডিমের তরকারি, বেগুন ভর্তা, ডাল–এক্কেবারে রাজা বাদশার খানা।
খেতে খেতে মতির মনে হল–আজ সে আসলেই ভাল গেয়েছে। ভাল গেয়েছে বলেই আল্লাহপাক তার কপালে লিখেছেন–গরম ভাত, ডিমের ঝোল–তাকে তিনি অনাহারে ঘুমুতে দেননি। কুসুম কেউ না–সে শুধুই উপলক্ষ, উছিলা। আল্লাহপাক সরাসরি কিছু করেন না–যা করার উছিলার মাধ্যমে করেন।
চিঠি লেখা বন্ধ করে শাহানা উঠে দাঁড়াল
মিতু,
তুই কেমন আছিস বল তো?
আমি জানি তুই আমার উপর খুব রাগ করে আছিস। তোর কত শখ আমরা তিন বোন মিলে গ্রামে এসে গিয়ে হৈ-চৈ করব। আমার জন্যে তোর শখ মিটল না। মিতু, খুব ছোটবেলা থেকেই আমি ঠিক করে রেখেছিলাম–এ জীবনে কাউকেই কখনো কষ্ট দেব না। দেইও না, শুধু তোর বেলাতেই ব্যতিক্রম হয়। কেন হয় আমি নিজেও জানি না। কেন তোকে আমি বারবার কষ্ট দেই? তুই আমার অতিপ্রিয় এই কারণেই কি? অতি প্রিয়জনদেরই কষ্ট দিতে ইচ্ছে করে।
আজ আমার মনটা খুব খারাপ। এখানে একটা গানের আসর হল। হেলাফেলা ভাব নিয়ে গান শুনতে গিয়ে রীতিমত চমকে গেছি। প্রথমে কিছুক্ষণ বাজনা হল–গ্রাম্য কনসার্ট। একজন নেচে নেচে ঢোল বাজালেন, বাকিরা তাকে সঙ্গত করলেন। আমি বাজনা শুনে অভিভূত হয়েছি এটা বললে কম বলা হবে–আমার চিন্তাচেতনায় একটা ধাক্কা পড়েছে।
কনসার্টের পর শুরু হল গান। এই গ্রামেরই এক গায়ক মতি মিয়া গান শুরু করলেন। বেচারার চোখে কাজল, গায়ে হাস্যকর এক পাঞ্জাবি, যার হাতা ছেঁড়া। রিফু করে সে ছেঁড়া ঢাকা যায়নি। সে হাসিমুখে দর্শকদের মাথা নুইয়ে কয়েকবার সালাম করে গান শুরু করল–মরিলে কান্দিও না আমার দায়–সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখে পানি এসে গেল। মিতু গানের এই প্রচণ্ড শক্তির কথা আমার জানা ছিল না। বাসায় রাতদিনই গান শুনি। ঘরভর্তি এল. পি.–সিডি ডিস্ক। গান শুনে কতবার অভিভূত হয়েছি–চোখে পানি এসেছে কিন্তু গ্রামের আসরের গ্রাম্য সেই গায়কের গান শুনে চোখে যে পানি এসেছে তার জাত আলাদা। এই গায়ক তার গান দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন–মানব জীবন ক্ষণিকের। ডাক্তার হিসেবে এই তথ্য আমার অজানা নয় তারপরেও মনে হল জীবনে এই তথ্যটির মর্ম প্রথম উপলব্ধি করলাম।
গান শুনতে শুনতে আমার কি ইচ্ছা হচ্ছিল জানিস? আমার ইচ্ছা হচ্ছিল চেয়ার ছেড়ে মঞ্চে উঠে যাই। গায়কের পাশে গিয়ে বসি। গায়ককে বলি–শুনুন, আপনি কোন দিন আমাকে ছেড়ে যেতে পারবেন না। আপনাকে আমৃত্যু আমার পাশে পাশে থাকতে হবে। আপনি কোনদিনও আর আসর করে গান গাইতে পারবেন না—বাকি জীবন আপনাকে গান গাইতে হবে শুধুই আমার জন্যে।
তুই কি ভাবছিস আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে? ঘোরের মত তৈরি হয়েছে তো বটেই। এই ঘোর সামাল দেবার ক্ষমতাও আমার আছে। যে মেয়ে দুদিন পর জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটিতে পিএইচ. ডি করতে যাবে সে এক অশিক্ষিত মূর্খ গ্রাম্য গায়ককে কখনো বলতে পারবে না–আপনি আমাকে ছেড়ে যেতে পারবেন না। বলতে পারা উচিতও বোধহয় না। ঐ গ্রাম্য গায়ক একটা বিদ্যা আয়ত্ত করেছেন। ঐ বিদ্যার ক্ষমতা সম্পর্কেও তার ধারণা নেই। ঐ বিশেষ বিদ্যাটির প্রতি ভালবাসা তার দিকে নিয়ে যাওয়া কোন কাজের কথা না।
কিন্তু মিতু, আমি এতই অভিভূত হয়েছি যে আমার মন শুধুই কাঁদছে–। বার বার মনে হচ্ছে, আমি যদি এই গ্রামের অশিক্ষিত দরিদ্র এক তরুণী হতাম–তাহলে কি চমৎকার হত! ছুটে যেতাম তার কাছে। হায় রে! আমার জন্ম হয়েছে অন্য জগতে–আমি রাজবাড়ির মেয়ে–ভীরু ধরনের মেয়ে, যার সাহস ঢাকা থেকে একা একা সুখানপুকুরে উপস্থিত হবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর বাইরে যাবার ক্ষমতা যার নেই। প্রতিভার প্রাথমিক পর্যায় চারাগাছের মত। সতেজ ছোট্ট একটা চারাগাছ যে লক লক করে বেড়ে ওঠার জন্যে অপেক্ষা করছে। প্রাথমিক পর্যায়ে তাকে সযত্নে রক্ষা করতে হয়। তারপর এক সময় সে মহীরুহে পরিণত হয়, তখন আর তার কোন কিছুরই প্রয়োজন নেই। আচ্ছা মিতু, আমি কি… না থাক।
মিতু, তুই চলে আয়। আমার খুব একা একা লাগছে। শরীরটাও ভাল নেই–গানের আসর থেকেই জ্বর জ্বর ভাব নিয়ে ফিরেছি। দেখতে দেখতে জ্বর বেড়েছে। শারীরিক অবস্থাও ঘোর তৈরির একটি কারণ হতে পারে…। তুই চলে আয় মিতু–তোকে নিয়ে দু-একদিন খুব বেড়াব, তারপর ঢাকায় চলে আসব। নিজের ভুবনে–নিজের জগতে। বাইরের কোন কিছুই তখন আর আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। আমরা আধুনিক মানুষ–কচ্ছপের মত শক্ত খোলে ভেতর থাকাই আমাদের জন্যে নিরাপদ।
