শাহানা ভাবছে, এই বাজনা তার কাছে যত সুন্দর লাগছে আসলেই কি তা তত সুন্দর, নাকি বিশেষ এই পরিবেশ তাকে অভিভূত করছে? নিস্তব্ধ গ্রাম, মেঘে ভরা আকাশ–দূরের হাওড় সবকিছুই বাজনায় অংশগ্রহণ করছে বলেই কি এমন লাগছে?
যতই সময় যাচ্ছে বাজনা ততই উদ্দাম হচ্ছে–ঢোলবাদক তার ঢোলকে বিশেষ একদিকে মোড় নেওয়ানোর চেষ্টা করছেন। বেহালাবাদক এবং বংশিবাদকের বিস্মিত দৃষ্টি বলে দিচ্ছে ঢোলে কিছু একটা হচ্ছে যা ধরাবাধা নিয়মের বাইরে…। তারা বিপুল উৎসাহে নতুন করে শুরু করল–। শাহানা তার শরীরে এক ধরনের কাঁপন অনুভব করল। শরীরের ভেতরে যে শরীর আছে সেই শরীরে কিছু একটা হচ্ছে।
গান শুরু হল মাঝরাতে। ততক্ষণে নীতু ঘুমিয়ে পড়েছে। সে ঘুমুচ্ছে শাহানার কোলে মাথা রেখে। আকাশে মেঘ আরো বাড়ছে। গুড় গুড় শব্দ হচ্ছে। যেকোন মুহূর্তে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে।
মতি আকাশের দিকে উদ্বিগ্ন চোখে একবার তাকিয়েই গান ধরল–
মরিলে কান্দিও না আমার দায়
ও যাদুধন।
মরিলে কান্দিও না আমার দায়…
ও আমার প্রিয়জন আমার মৃত্যুতে তুমি কেঁদো না। তুমি বরং কাফন পরাবার আগে আগে সুন্দর করে সাজিয়ে দিও। গান শুরু হল খালি গলায়। তার সঙ্গে যুক্ত হলো হারমোনিয়াম, বেহালা ও বাঁশি। অপূর্ব গলা–ভরাট, মিষ্টি, বিষাদ মাখা। কিছুক্ষণ আগের উদ্দাম বাজনার স্মৃতি গাতক মতি মিয়া উড়িয়ে নিয়ে গেল। তীব এক বিষাদ মতি মিয়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই বিষাদ পৃথিবীর বিষাদ নয়। এই বিষাদ অন্য কোন ভুবনের।
শাহানা স্পষ্ট চোখের সামনে দেখতে পেল মানুষটি মরে পড়ে আছে–তার অতি প্রিয়জন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সেই কান্না ছাপিয়ে গান হচ্ছে–
মরিলে কান্দিও না আমার দায়
ও যাদুধন।
মরিলে কান্দিও না আমার দায়…
সাধারণ একজন গ্রাম্য গায়ক–সাধারণ সুর অথচ কি অসাধারণ ভঙ্গিতেই না সে জীবনের নশ্বরতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। মনের গভীরে ছড়িয়ে দিচ্ছে নগ্ন হাহাকার। শাহানার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়তে লাগল। কেউ কি তাকে দেখছে? দেখুক। তার নিজেরও গায়কের সঙ্গে কেঁদে কেঁদে গাইতে ইচ্ছা করছে–
মরিলে কান্দিও না আমার দায়
ও যাদুধন।
মরিলে কান্দিও না আমার দায়…।।
গান ভোররাত পর্যন্ত হবার কথা
গান ভোররাত পর্যন্ত হবার কথা–বৃষ্টির জন্যে সব এলোমেলো হয়ে গেল। অল্পসল্প বৃষ্টি হলে একটা কথা ছিল–আষাঢ় মাসের মুষল ধারার বৃষ্টি। আসর ভেঙে দেয়া ছাড়া গতি কি?
মতি খুব মন খারাপ করে ভিজতে ভিজতে ঘরে ফিরেছে। ঘরে পৌঁছার পর মনে হয়েছে কেরোসিন নেই, হারিকেন জ্বালানো যাবে না। আজ বিকেলেই বোতলের সবটুক কেরোসিন হ্যাজাক লাইটে ভরতে হয়েছে। ঘরের জন্যে আর কেনা হয়নি।
ভেজা কাপড় বদলানোর জন্যে শুকনো কাপড় খুঁজে বের করতে হবে। অন্ধকারে এই কাজটা করা সম্ভব না। পাঞ্জাবির পকেটে রাখা দেয়াশলাই ভিজে চুপ চুপ করছে। ঘরে আর কোন দেয়াশলাই আছে বলেও মনে হয় না।
আলোর চেয়েও বড় সমস্যা–অসম্ভব খিদে লেগেছে। ভরপেটে গান গাইতে ওস্তাদের নিষেধ আছে। মতি ভরপেটে গানের আসর করে না। সে দুপুরে খেয়েছিল তারপর আর কিছু খায়নি। খিদেয় শরীর ভেঙে আসছে। প্রচণ্ড ঝাল কোন তরকারি দিয়ে গরম গরম ভাত খেতে ইচ্ছা করছে। তরকারি না হলেও ক্ষতি নেই–গরম ভাত হলেও হবে। শুকনো মরিচ ভেজে, পেঁয়াজ তেল মাখিয়ে একটা ভর্তা বানাতে পারলে সেই ভর্তামাখা ভাত খেতে হবে অমৃতের মত। ভাত রাঁধার উপায় নে, আগুন নেই। থাকলেও রাঁধতে ইচ্ছা করবে না। শরীর ঝিম ঝিম করছে–জ্বর আসবে হয়ত। শরীর অশক্ত হয়ে পড়েছে, অল্পতেই জ্বরজারি হয়। গান-বাজনা পরিশ্রমের কাজ। শরীর ঠিক না থাকলে গান-বাজনা হয় না। মতি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল–শরীর ঠিক রাখবে কি ভাবে–দুবেলা খাওয়াই জুটে না।
অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে শুকনো লুঙ্গি বের করল, গেঞ্জি বর করল। কাঁথা বের করে গায়ে দিল–শীত লাগছে। গায়ে কাঁপন ধরেছে।
খিদের জন্যে শরীর ঝিম ঝিম করছে। চিড়া বোধ হয় আছে। কয়েক মুঠো শুকনো চিড়া চিবিয়ে পানি খেয়ে শুয়ে থাকা যায়। শরীর যদিও ভাত ভাত করছে। করলে তো লাভ হবে না। সবই আল্লাহপাকের নির্ধারণ করা। তিনি যদি ঠিক করে রাখেন দু মুঠো শুকনো চিড়া তাহলে শুকনো চিড়াই খেতে হবে। উপায় কি!
অন্ধকারে মতি যে হাড়িতে চিড়া রাখা ছিল সেই হাড়ি খুঁজে পেল না। ভালই হল। খিদে পেটে ঘুম আসে না–কিন্তু খিদে প্রচণ্ড হলে ভাল ঘুম হয়। রাতটা পড়েছে ঘুমের।
গান গেয়ে মতি আজ খুশি। সে জানে সে ভাল গেয়েছে। এইসব জিনিশ কাউকে বলে দিতে হয় না। বোঝা যায়। নিজের মনই নিজেকে বলে দেয়। রাজবাড়ির মেয়ে দুটির গান ভাল লেগেছে কি না কে জানে। মনে হয় লাগেনি। গানের মাঝখানে দুজন উঠে গেল। মতি সবচে ভাল যে গানটি গেয়েছে সেটা শুনে যেতে পারল না।
তুই যদি আমার হইতি
আমি হইতাম তোর–
কোলেতে বসাইয়া তোরে করিতাম আদর…
এই গান তারা না শোনায় ভালই হয়েছে। এই গানের মর্ম শহরের মানুষের বোঝার কথা না। সবার জন্য সব জিনিশ না…
মতি জাগনা আছ?
কে?
আমি। আমি জয়নাল।
মতি দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল। ছাতি মাথায় জয়নাল উঠোনে দাঁড়িয়ে। তার হাতে হারিকেন। অন্য হাতে গামছা বাঁধা এলুমিনিয়ামের গামলা।
বিষয় কি জয়নাল?
ভাত আনছি।
মতি বিস্মিত হয়ে বলল, ভাত?
হ ভাত। কুসুম পাঠাইছে। গান শেষ হইতেই কুসুম কইল–জয়নাল ভাই, আমারে এট্টু আগাইয়া দেন। আগাইয়া দিলাম। শেষে কইল, মতি ভাইয়ের জন্যে ভাত লইয়া যান।
