কান্নার শব্দ আসছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কে যেন কাঁদছে। চিঠি লেখা বন্ধ করে শাহানা উঠে দাঁড়াল। মনে হচ্ছে নীতু কাঁদছে। এরকম করে সে কাঁদছে কেন? আশ্চর্য তো!
শাহানা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। নীতু না, কাঁদছে পুষ্প। দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। নীতু পুষ্পের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। নীতুর মুখ বিষণ্ণ।
শাহানা বলল, কি হয়েছে নিতু?
নীতু জবাব দিল না। শাহানা পুষ্পের দিকে তাকিয়ে বলল, পুষ্প, কি হয়েছে?
পুষ্প বলল, কিছু হয় নাই।
অকারণে কেউ তো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে না। কিছু একটা নিশ্চয়ই হয়েছে। কি হয়েছে তুমি কি বলতে চাও না?
পুষ্প নাসূচক মাথা নাড়ল। শাহানা লক্ষ্য করল, পুষ্পের ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
নীতু বলল, দাদাজান ওকে মেরেছেন। চড় মেরেছেন।
ও আচ্ছা।
নীতু বলল, ওকে চলে যেতে বলেছেন। ও চলে যাচ্ছে।
শাহানা নিজের ঘরে চলে এল। সমস্যা কিছু হয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে। নীতুর মুখ কঠিন হয়ে আছে। এই মুখ বিদ্রোহিনীর মুখ। সে নিজেকে সামলে রাখতে চেষ্টা করছে।
এমন মানসিক পরিস্থিতিতে চিঠিতে মন বসানো যায় না। শাহানা নিজের ঘরের বিছানায় বসল। সে ভেবেছিল, কিছুক্ষণের মধ্যে নীতু ঘরে ঢুকে পুরো ব্যাপারটা বলবে।
নীতু ঘরে ঢুকল না। কি হয়েছে কিছু জানা যাচ্ছে না। দাদাজান মেরেছেন, অকারণে নিশ্চয়ই মারেননি। একজন বৃদ্ধ সুস্থ মাথার মানুষ অকারণে শিশুর গায়ে হাত তুলবেন না। ব্যাপারটা কি?
ব্যাপারটা সামান্যই। ইরতাজুদ্দিন সাহেব বাংলোঘরের জানালা থেকে দেখেছেন পুষ্প নীতুর হাত ধরে হাঁটছে। কি সব বলছে, নীতু হেসে ভেঙে পড়ছে। তিনি পুষ্পকে ডেকে পাঠালেন। নীতুও সঙ্গে সঙ্গে এল। নীতুকে তিনি চলে যেতে বললেন। নীতু গেল না, দাঁড়িয়ে রইল। তিনি পুষ্পের চোখের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সহজ গলায় বললেন–কি রে, তুই নীতুর হাত ধরে হাঁটছিস কেন? এক ফোঁটা শরীরে এত সাহস! বলেই কারো কিছু বুঝবার আগে প্রচণ্ড চড় কষালেন। পুষ্প এর জন্যে, প্রস্তুত ছিল না বলে ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল। ইরতাজুদ্দিন আরো সহজ গলায় বললেন–কাঁথা বালিশ নিয়ে বাড়ি চলে যা। আর যেন তোকে ঐ বাড়িতে না দেখি।
এখন বিকেল। রোদ মরে এসেছে। নীতুর খুব একা একা লাগছে। পুষ্প নেই। সে তার মাদুর ও বালিশ না নিয়েই চলে গেছে। আপন মনে খানিকক্ষণ বারান্দায় হাঁটল, তারপর গল্পের বই নিয়ে বাড়ির পেছনের বাগানে চলে গেল। সেখানে। কাঁঠালগাছে বড় দোলনা টানানো হয়েছে। দোলনায় দোল খেতে খেতে গল্পের বই পড়া যায়। সঙ্গে আনা বই সব পড়া হয়ে গেছে। নীতু পুরানো একটা বই—জল দস্যু নিয়ে দোলনায় উঠে বসল। সন্ধ্যা পর্যন্ত গল্পের বই পড়ল।
সন্ধ্যা মেলাবার পর শাহানার ঘরে ঢুকে বলল, আপা, পুষ্প তো চলে গেছে, আজ রাতে আমি তোমার সঙ্গে ঘুমুব।
শাহানা বলল, আচ্ছা।
আমরা আর কদিন আছি আপা?
চারদিন। তোর কি চলে যেতে ইচ্ছা করছে?
না, চারদিন পরই যাব।
তোর কি মন বেশি খারাপ?
হুঁ।
ছাদে যাবি? চল ছাদে বসে গল্প করি। যাবি?
হুঁ যাব। দাঁড়াও, এক মিনিট। দাদাজানকে একটা কথা বলে আসি।
রাগারাগি করবি না তো?
না।
খবরদার! রাগারাগি করবি না। আমি কি আসব তোর সাথে?
উহুঁ।
ইরতাজুদ্দিন নামাজঘরে বসেছিলেন। মাগরিবের নামাজ শেষ করে তসবি টানছেন। নামাজঘরে মোমবাতি জ্বলছে। মশা তাড়াবার জন্যে ধূপ জ্বালানো হয়ছে। ধূপের গন্ধে গা কেমন কেমন করে। নীতু নামাজঘরে ঢুকল না। দরজা ধরে দাঁড়াল। ইরতাজুদ্দিন তসবি নামিয়ে রেখে বললেন, কিছু বলবি?
নীতু বলল, হ্যাঁ।
বল শুনি।
নীতু খুব স্পষ্ট করে বলল, দাদাজান, আপনি অকারণে পুষ্প মেয়েটাকে মেরেছেন। বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। খুব অন্যায় করেছেন।
ইরতাজুদ্দিন শান্ত ভঙ্গিতে বললেন, মানুষ হয়ে জন্মালে এইসব ছোটখাটো অন্যায় করতে হয়। পশুরাই শুধু কোন অন্যায় করে না। আমি তো আর পশু না। আমি মানুষ।
দাদাজান, অন্যায় করেছেন। আমি প্রচণ্ড রকম রাগ করেছি আপনার উপর। আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত ঐ মেয়েটিকে ডেকে ক্ষমা চাইবেন ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এ বাড়ির কোন খাবার খাব না।
তাই নাকি?
হ্যাঁ তাই।
নীতু দরজার পাশ থেকে সরে এল। ইরতাজুদ্দিন ব্যাপারটার কোন গুরুত্ব দিলেন না। বাচ্চা একটা মেয়ের কথায় গুরুত্ব দেবার কিছু নেই। এক বেলা না খেলে কিছু। হয় না। তিনি আবারো তসবি টানতে লাগলেন।
নীতু ছাদে বসে শাহানার সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প করল। মজার মজার গল্প। একবার তাদের স্কুলে এক বানরওয়ালা বানরের খেলা দেখাতে এসেছিল–বানরটা হঠাৎ ছুটে এসে নাইন বি সেকশানে ঢুকে কি কাণ্ডকারখানা শুরু করল। তিথি নামে একটা মেয়ের গলা জড়িয়ে ধরল। মেয়ে চিঙ্কার দিয়েই অজ্ঞান। গল্প শেষ করে রান্নাঘরে ঢুকে রমিজের মা কি করে কুমড়ো ফুলের বড়া তৈরি করে সেটা আগ্রহ করে দেখল।
রাতে ঘুমুতে গেল না খেয়ে।
নোয়ারার মনে সকাল থেকে কু ডাকছিল
মনোয়ারার মনে সকাল থেকে কু ডাকছিল। মনে হচ্ছিল আজ ভয়ংকর কিছু ঘটবে। কেউ খুব খারাপ কোন খবর নিয়ে আসবে। বিব্রত গলায় সেই খারাপ খবর দিয়ে বলবে–সবই আল্লাহপাকের ইচ্ছা। আল্লাহপাক যা করেন মানুষের মঙ্গলের কথা চিন্তা কইরা করেন। উনি পরম দয়ালু রাহমানুর রহিম। যদিও মনোয়ারা তার জীবনে আল্লাহর পরম দয়ার তেমন কোন পরিচয় পাননি। তার কাছে প্রায়ই মনে হয়–আল্লাহ খুব কঠিন হৃদয়ের কেউ–মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাকে বিচলিত করে না। তার বিশাল সৃষ্টিজগৎ। মানুষের মঙ্গল নিয়ে চিন্তা-ভাবনার তাঁর সময় কোথায়? যার সামান্য ইশারায় জগৎ সৃষ্টি হয়, তার ইচ্ছা হলেই সমগ্র মানবজাতির দুঃখ-কষ্ট দূর হবার কথা। তা তো হয় না–মানুষের দুঃখ কষ্ট শুধুই বাড়ে–শুধুই বাড়ে।
