ধুন রাখার বিষয় হলেও মতি রাখতে পারছে না। সব কিছুতেই টাকা লাগে। টাকা পাবে কোথায়?
মতি টিনের ট্রাঙ্কের ভেতর থেকে পাঞ্জাবি বের করল। কুচড়ে মুচড়ে কি হয়ে আছে। সেই তুলনায় পায়জামাটা ভাল আছে এক জোড়া পাম্প সু দরকার ছিল। পাম্প সু নেই। কিনতে হবে।
কুসুমকে বললে সে কি পাঞ্জাবিটা রিফু করে দেবে না? তাছাড়া এম্নিতেই কুসুমের সঙ্গে দেখা করা দরকার–মোবারক চাচার সন্ধান কিছু পেয়েছে কি না জানা দরকার। এটা তো আরেক চিন্তার ব্যাপার হল।
কুসুম কলসি নিয়ে পানি আনতে বের হবে এমন সময় মতি উপস্থিত হল। কুসুমের বুক ধ্বক করে উঠল। এই ধ্বক ধ্বক অনেকক্ষণ ধরে করবে তারপর আস্তে আস্তে কমবে। ধ্বকধ্বকানি না কমা পর্যন্ত কথা বলা ঠিক না।
যাও কোথায় কুসুম?
দড়ি কলসি লইয়া বাইর হইছি। কই যাই বুঝেন না?
চাচা কি ফিরছে?
না, ফিরে নাই।
চিডিপত্র দিছে?
চিড়িপত্রও দেয় নাই–আফনে কি বাপজানের খুঁজ নিতে আইছেন না অন্য বিষয় আছে?
মতি ইতঃস্তত করে বলল, একটা কাম কইরা দিবা কুসুম?
কি কাম?
পাঞ্জাবির হাতাটা একটু রিফু কইরা দিবা?
দেন–দিমু নে।
এমন কইরা দিবা যেন সেলাই বুঝা না যায়।
চিকন কাম কি আর আমি পারি! আমার হইল সব মোটা কাম।
গানের আসর করতাছি। শুক্কুরবার দিবাগত রাত্র।
শুনছি।
তুমি আসবা কিন্তু।
রাজবাড়িতে আমারে কে ঢুকতে দিব?
রাজবাড়িতে না–গান হইব গেরামে…।
কুসুম গম্ভীর গলায় বলল, রাজবাড়ির মাইয়া গেরামে আইস্যা গান শুনব না। গান তো আফনে আমরার জন্য করতাছেন না, তারার জন্য করতাছেন। মাটির উফরে বইস্যা গান শোনার শখ তারার নাই।
মতি উৎসাহের সঙ্গে বলল, তুমি তারে চিন না বইল্যা এমন একটা বেফাস কথা বললা। এই মেয়ে রা দশটা মেয়ের মত না।
এ আসমান থাইক্যা পড়ছে?
হুঁ। আসমান থাইক্যাই পড়ছে।
কুসুম খিলখিল করে হাসছে। যে ভাবে হাসছে তাতে মনে হয় কাঁখের কলসি না মাটিতে পড়ে ভেঙে টুকরা টুকরা হয়।
মতি বিরক্ত গলায় বলল, হাস ক্যান?
হাসির ফাঁকে ফাঁকে কুসুম বলল, কেন হাসি আইজ বলব না। কোন একদিন বলব।
রহস্য কইরা কথা বলবা না কুসুম। রহস্য করা ভাল না।
জগৎটার মইধ্যেই খালি রহস্য। রহস্য না কইরা কি করব?
কুসুম কলসি নিয়ে রওনা হয়েছে। মতি মিয়া যাচ্ছে তার পেছনে পেছনে। কসুম বলল, আপনে পিছে পিছে আসতাছেন ক্যান? মতি থমকে দাঁড়াল। তাই তো, সে কেন পেছনে পেছনে যাচ্ছে? কুসুমের মন খারাপ হল। মতি পেছনে পেছনে আসছিল–এত ভাল লাগছিল কুসুমের! সে নিজেই তা বন্ধ করল। কেন? কেন?
মতি বলল, কুসুম, আমি যাই–পাঞ্জাবিটা ঠিকঠাক কইরা রাখবা।
কুসুম জবাব দিল না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল মতি হন হন করে যাচ্ছে। একবার কি সে পেছনে ফিরবে না? পেছন ফিরলেই দেখত কুসুম দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কুসুম পানি না এনেই বাড়িতে ফিরে এল।
মনোয়ারার পেটের ব্যথা সকাল থেকে শুরু হয়েছে। ব্যথা এখন অল্প। ব্যথার লক্ষণ ভাল না। তিনি লক্ষণ দেখেই বলতে পারছেন। অল্প ব্যথাই কিছুক্ষণের ভেতর প্রবল হবে এবং তার জগৎ-সংসার অন্ধকার করে দেবে। তখন বার বার শুধু মনে হবে–ইশ, একটু বিষ কেউ যদি এনে দিত। বিষ খেয়ে শান্তিতে ঘুমানো যেত। মৃত্যু তো ঘুমের মতই।
মনোয়ারা চাপা ব্যথা নিয়ে খাটে বসে আছেন ভয়াবহ ব্যথার যে সময় তাঁর সামনে তার কথা ভেবে বিষণ্ণ বোধ করছেন। তাঁর খুব ইচ্ছা রাজবাড়ির ডাক্তার মেয়েটাকে শরীরটা দেখান। যে মেয়ে দূর্গাকে মৃত্যুর কোল থেকে তুলে নিয়ে এসেছে। তাকে কি সামান্য ব্যথার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না? অবশ্যই পারবে কিন্তু রাজবাড়ির মেয়েকে খবর দিয়ে এখানে আনেন কি করে? সেটা কিছুতেই সম্ভব না। মেয়েটা প্রায়ই বেড়াতে বের হয়। একা একা পাগলের মত হাঁটে। এ রকম কোন একটা সময়ে সে যদি নিজেই হাঁটতে হাঁটতে চলে আসত!
মনোয়ারা দেখলেন কুসুম ফিরেছে। গেল আর ফিরল, এর মধ্যে পানি আনা হয়ে গেল? না, পানি নিশ্চয়ই আনেনি। তার শরীরে আবার সেই জ্বীন ভর করেছে। তিনি ক্ষীণ গলায় ডাকলেন, কুসুম।
কুসুম দরজা ধরে দাঁড়াল। জবাব দিল না।
পানি আনছস?
না।
না ক্যান?
ইচ্ছা করছে না এই জন্যে আনি নাই।
ঘরে এক ফোঁটা পানি নাই।
ঘরে তো চাউল নাই, টেকাপয়সাও নাই–খালি পানি দিয়া কি হইব–ভাল। হইছে পানিও নাই।
মনোয়ারা মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। আহা রে, কি মিষ্টি কি সুন্দর মুখ! এ রকম একটা সুন্দর মেয়ের তিনি কিনা বিয়ে দিতে পারছেন না। মনোয়ারা হঠাৎ লক্ষ্য করলেন–কুসুমের গলায় পীর সাহেবের হলুদ সূতাগাছা নেই। সুতাগাছা সে কি করেছে? ফেলে দিয়েছে? সে কি জানে না এটা কত বোড় অলক্ষণ…
মেয়ের সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলতে তার ইচ্ছা করছে না। প্রবল ব্যথায় তার শরীর থর থর করে কাপছে। তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এই তীব্র যাতনা সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই–তার কেন, কারোরই নেই।
কুসুম, ও কুসুম।
কি?
মইরা যাইতাছি রে মা!
না না, তিনি ভুল বলেছেন। তিনি মরে যাচ্ছেন না–তিনি বেঁচে আছেন এবং অনেক দিন এই ভয়ংকর কষ্ট সহ্য করার জন্য বেঁচে থাকবেন। তার জন্যে মৃত্যু হবে আনন্দময় অভিজ্ঞতা।
রাজবাড়ির মেয়েটা একবার যদি তাকে দেখত! তার মন বলছে মেয়েটা এসে তার পেটে হাত রাখামাত্রই তার ব্যথা কমে যাবে।
কুসুম, ও কুসুম!
হুঁ।
রাজবাড়ির মেয়েটারে খবর দিয়া আনবি মা?
