না।
মইরা যাইতাছি রে বেটি, মইরা যাইতাছি।
মইরা যাওন তো ভাল মা। মরণের মত শান্তি বাঁচনের মধ্যে নাই।
ব্যথার ধাক্কা মনোয়ারা আর সহ্য করতে পারছেন না তিনি কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে পড়লেন। একটু পর পর মৃগী রোগির মত তাঁর শরীর শুধু কাঁপছে। তার চোখ ঘোলাটে। কুসুম বলল, মা, আমি উনারে আনতে যাইতাছি… আসব কিনা জানি না।
মনোয়ারা জানেন ঐ মেয়ে আসবে। খবর পাওয়ামাত্র ছুটে আসবে। রাজবাড়িতে থাকলেও ঐ মেয়ে রাজবাড়ির মেয়ে না, সে অন্য এক মেয়ে যে মৃত্যুর হাত থেকে জীবন ছিনিয়ে নিয়ে আসতে পারে। এই মেয়েটা এসে তার পেটে হাত রাখলেই তার ব্যথা কমে যাবে। মনোয়ারা বিড় বিড় করে সূরা ইয়াছিন পড়ার চেষ্টা করছেন। মৃত্যু। যদি এসেই থাকে সূরা ইয়াছিন পাঠে মৃত্যুযন্ত্রণা কমে যাবে…
মনোয়ারার অনুমান ঠিক হয়েছে। রাজবাড়ির পরীর মত মেয়েটা তার পেটে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল, কোথায় ব্যথা বলুন তো?
তিনি ব্যথা কোথায় বলতে পারলেন না। অবাক চোখে কুসুমের দিকে তাকালেন। তারপর তাকালেন পুষ্পের দিকে। পুষ্পের পাশে ফুটফুটে নীতুকেও দেখলেন।
শাহানা বলল, বলুন কোথায় ব্যথা?
একটু আগে তীব্র ব্যথা ছিল এখন তার লেশমাত্র নেই। কি অদ্ভুত কাণ্ড! রাজবাড়ির মেয়ে তার মত হতদরিদ্রের ঘরে উপস্থিত হয়েছে। জানতে চাচ্ছে কোথায় ব্যথা কিন্তু তিনি বলতে পারছেন না। তার লজ্জা লাগতে লাগল। শাহানা বলল, এখন ব্যথা নেই?
জ্বি না আম্মা।
ব্যথাটা যখন উঠে কতক্ষণ থাকে?
এই প্রশ্নের জবাবও মনোয়ারা দিতে পারলেন না। কতক্ষণ থাকে কে জানে। কখনো মনে রাখার চেষ্টা করেন নি। তীব্র কষ্টের ব্যাপার কে আর মনে করে রাখে?
মনে করতে পারছেন না, না?
জি না আম্মা।
ব্যথাটা কি হঠাৎ বাড়ে না আস্তে আস্তে বাড়ে?
মনোয়ারা অসহায় চোখে তাকাচ্ছেন। কোন জবাব দিতে পারছেন না। তিনি আরেকটা ব্যাপারে খুব অবাক হচ্ছেন। মেয়েটা তার পেটে হাত রেখেছিল, হাত এখনও সরিয়ে নেয়নি।
এখন বলুন তো ব্যথাটা ভাত খাবার আগে হয় না পরে হয়?
আম্মা বলতে পারতেছি না।
তিনি যে মেয়েটার প্রশ্নের জবাব দিতে পারছেন না–তাতে মেয়েটা রাগ করছে না বরং হাসছে। কি সুন্দর করে হাসছে! আহা রে, এরকম একটা মেয়ে যদি আমার থাকত! মনোয়ারা সবাইকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ বললেন, আম্মাজি, আফনের উপর আল্লাহপাকের খাস রহমত আছে। আমার বড় মেয়েটার বিবাহ হইতেছে না। আপনে যদি আমার বড় মেয়েটার জন্য একটু দোয়া করেন তাইলে মেয়েটার ভাল বিবাহ হবে।
শাহানা খিলখিল করে হেসে উঠল। শাহানার সঙ্গে গলা মিলিয়ে হেসে উঠল নীতু। কুসুম এবং পুষ্প হাসল না। মনে হল তারা দুজনই লজ্জা পাচ্ছে। শাহানা বলল, আপনার কি জন্যে ধারণা হল আমার উপর আল্লাহর রহমত আছে?
মনোয়ারা শান্ত গলায় বললেন, আম্মাজি, আপনে দূর্গারে মরণের হাত থাইক্যা টাইন্যা বাইর কইরা আনছেন। আমি পেটের ব্যথায় মইরা যাইতেছিলাম। আপনে পেটে হাত দিছেন সাথে সাথে ব্যথা নাই।
আপনার ব্যথাটা আলসারের। এইসব ব্যথা হঠাৎ করে আসে আবার হঠাৎ করে যায়। আমি হাত না রাখলেও ব্যথাটা চলে যেত।
আম্মাজি, আপনে আমার মেয়েটার জন্যে দোয়া করেন। আমার মন বলতেছে আপনে বললেই আল্লাহপাক শুনবে।
শাহানা অস্বস্তি বোধ করছে। সে অস্বস্তি দূর করে কুসুমের দিকে তাকিয়ে সহজ গলায় বলল, আপনার এই মায়াবতী মেয়েটার যেন খুব ভাল বিয়ে হয় এই প্রার্থনা করছি। তার বর যেন হয় জ্ঞানবান, বুদ্ধিমান, বিত্তবান ও হৃদয়বান।
নীতু হাসতে হাসতে বলল, তুমি অনেক কিছু বাদ দিয়ে গেছ আপা–ন্যায়বান, কান্তিমান ও দয়ালু।
শাহানা বলল, হ্যাঁ, সে হবে ন্যায়বান, কান্তিমান ও দয়ালু।
মনোয়ারার মুখ দেখে মনে হচ্ছে তিনি মোটামুটি নিশ্চিত এ জাতীয় একটি ছেলের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে হতে যাচ্ছে।
শাহানা বলল, আপনার কন্যার বিবাহপর্ব শেষ হল, এখন আসুন আপনার অসুখের ব্যাপার দখি। আমার কাগজ-কলম লাগবে–নোট নেব। কাগজ কলম আছে?
কুসুম না-সূচক মাথা নাড়ল।
পুষ্প যাও, কোনখান থকে কাগজ কলম নিয়ে আস।
কাগজ-কলম আনতে পুষ্প রাজবাড়ির দিকেই ছুটে গেল। বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে শাহানা অপেক্ষা করছে। এত বড় একটা গ্রাম, কাগজ কলম আছে এমন কেউ নেই? স্কুল, মাদ্রাসা মক্তব কিছুই নেই? জায়গাটা কি সত্য পৃথিবীর বাইরে?
গানের আসর বসেছে
গানের আসর বসেছে। মঞ্চ তৈরি হয়েছে। রইসুদ্দিনের বাংলাঘরের দর্মার বেড়া সরিয়ে তৈরী হয়েছে মঞ্চ। চারদিক খোলা, উপরে টিনের ছাদ। দুটা হ্যাজাক বাতি উপর থেকে ঝুলছে। চাটাই পেতে গায়কদের ও বাজনাদারদের বসার ব্যবস্থা। যাত্রার মঞ্চের মত মঞ্চ–চারদিকেই দর্শক।
দর্শকদের বসার কোন ব্যবস্থা নেই। যে যেখানে পেরেছে বসেছে। শাহানা ও মিতুর জন্যে চেয়ার এসেছে। সেই চেয়ার পাতা হয়েছে বাঁশের চাটাইয়ের উপর। প্রচুর লোক সমাগম হয়েছে। শুধু শাহানাদের চারপাশ খালি। এদের আশেপাশে কেউ বসছে না। মঞ্চের দক্ষিণ দিকের একটা অংশ মেয়েদের জন্যে আলাদা করা। সেখানে গাদাগাদি ভিড়। এই ছোট্ট গ্রামে এত মানুষ আছে শাহনা ভাবেনি। রীতিমত জনসমুদ্র। মাইক নেই–সবাই কি শুনতে পারবে? দুবোন কৌতূহলী চোখে চারদিক দেখছে–তাদের পায়ের কাছে পুষ্প। আনন্দ ও উৎসাহে সে ঝলমল করছে। পুষ্প ধারাবর্ণনা দিয়ে যাচ্ছে।
ঐ যে বুড়া লোকটা দেখতাছেন আপা–উনার নাম পরাণ। পরাণ ঢোলী–পিথিমীর মইধ্যে শ্রেষ্ঠ।
