ইরতাজুদ্দিন অস্পষ্টভাবে কি যেন বললেন। পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত গলায় বললেন–নীতু শোন, আমাদের এই কাঠের দোতলা অনেক দূর থেকে দেখা যায়। চারদিকে হাওড়, আশেপাশে কোন দোতলা বাড়ি নেই। সারা রাতেই অনেকগুলি বাতি জ্বলে…
নীতু তাকিয়ে আছে। দাদাজান কি বলতে চাচ্ছেন সে বুঝতে পারছে না। দাদাজানের কথা শুনতে এখন তার ভাল লাগছে না– ছুটতে ছুটতে যে বাচ্চাগুলি যাচ্ছে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতেই ভাল লাগছে। এরা এত মজা করছে, আশ্চর্য! একজন আবার ইচ্ছা করে একটু পর পর কাদায় গড়াগড়ি খাচ্ছে–
নীতু।
জি।
আমাদের এই বাড়িতে অনেক বড় বড় মানুষ এসেছেন। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এসেছিলেন পাখি শিকারে। দেশবন্ধু সি. আর. দাস এসেছিলেন। একবেলা থাকবেন বলে এসে চারদিন ছিলেন। আমার বাবা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন–অনেকের সঙ্গে তার জানাশোনা ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন শান্তিনিকেতন শুরু করেন তখন তিনি তার ফান্ডে পাঁচ হাজার এক টাকা চাঁদা দিয়েছিলেন। সেই সময় পাঁচ হাজার এক টাকা–অনেক টাকা।
পাঁচ হাজারের সঙ্গে আবার এক কেন দাদাজান?
আল্লাহ বেজোড় সংখ্যা পছন্দ করেন, এই জন্যে দান-টান করলে বেজোড় সংখ্যায় দিতে হয়।
ও আচ্ছা।
পাখি শিকারের জন্যে বাবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও দাওয়াত করেছিলেন। উনি পাখি শিকার পছন্দ করেন না বলে আসেননি। উনি খুব সুন্দর একটা চিঠি লিখে জবাব দিয়েছিলেন। সেই চিঠি তোর বাবার কাছে আছে।
বাবার কাছে নেই দাদাজান। বাবা সেই চিঠি বাংলা একাডেমীতে দিয়ে দিয়েছেন।
তোর বাবার বুদ্ধি বেশি তো–সবকিছুতে মাতব্বরি করবে। ব্যক্তিগত একটা চিঠি বাংলা একাডেমীকে দেয়ার কি আছে? যাই হোক, আমি যা বলতে চাচ্ছি তা হচ্ছে–আমাদের এই বাড়ি ছিল বিখ্যাত এক বাড়ি–হাওড় অঞ্চলের এই বাড়ি সবার চোখে পড়ে। সেটাই স্বাভাবিক। একাত্তর সনের মে মাসে পাকিস্তানী মিলিটারী যখন গানবোট নিয়ে হাওড় অঞ্চলে ঢুকল তাদের চোখেও এই বাড়ি পড়ল। তারা তো অন্ধ না। তাদের চোখ আছে।
নীতু মনে মনে হাসল। দাদাজান কি বলতে চাচ্ছেন সে এখন বুঝতে পারছে। কিন্তু তাঁকে সে কিছু বুঝতে দিল না–এমন ভাব করল যেন সে কিছুই বুঝতে পারছে না। ইরতাজুদ্দিন বললেন, ওরা গানবোট নিয়ে আমার বাড়ির ঘাটে ভিড়ল। আমি দেখা করতে গেলাম। ওরা আমার সঙ্গে খুবই ভদ্র ব্যবহার করল। আমার বাড়িতে উঠে কিছুক্ষণের জন্যে বিশ্রাম করতে চাইল। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত একদল মানুষ। বিশ্রাম করতে চাইলে আমি কি বলব–না, বিশ্রাম করা যাবে না? ওরা তো খালি হাতে আসেনি–অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ নিয়ে এসেছে। নিরস্ত্র মানুষের মুখের উপর না বলা যায়, অস্ত্রধারী মানুষের মুখের উপর না বলা যায় না। এই সত্য পৃথিবীর সবাই জানে–শুধু তোর বাবা জানে না। এই জন্যেই তোর বাবাকে আমি শুধু গাধা বলি না, বলি শ্ৰেষ্ঠ গাধা।
নীতু লক্ষ্য করল, তার দাদাজান অসম্ভব রেগে গেছেন। তার ফর্সা মুখ লাল টকটকে হয়ে গেছে–তিনি অল্প অল্প কাঁপছেন।
ইরতাজুদ্দিন বিলের পানিতে একদলা থুথু ফেলে বললেন, কেউ বলুক দেখি এই গ্রামের কোন মানুষ মিলিটারী মেরেছে কি না। কেন মারেনি? আমার জন্যেই মারেনি। এত কিছু তোর বাবা জানে–এটা জানে না? তার কতবড় সাহস–সে সে সে…
ইরতাজুদ্দিন কথা শেষ করলেন না, টকটকে লাল চোখে তাকালেন। নীতু কিছু বলবে না বলবে না করেও শান্ত স্বরে বলল, দাদাজান, বাবা আমাদের বলেছেন যে মিলিটারী এই গ্রামের কাউকে মারেনি… কিন্তু…
কিন্তু আবার কি?
বাবা বলেছেন এই গ্রামের ছটা মেয়েকে মিলিটারী ধরে নিয়ে এসেছিল–আমাদের এই বাড়িতেই তাদের রেখেছিল। মিলিটারী চলে যাবার সময় তাদের সঙ্গে করে নিয়ে যায়। পরে এই মেয়েগুলির আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।
ইরতাজুদ্দিন তাকিয়ে আছেন। তাঁর চোখে পলক পড়ছে না। নীতু তার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল।
ঘাটে নৌকা ভিড়েছে। ইরতাজুদ্দিন নামলেন। তার পা খানিকটা টলতে লাগল। ইরতাজুদ্দিন সাহেবের পেছনে পেছনে নীতু নামল। নৌকার মাঝি দুজন মাথা নিচু করে বসে আছে। একবারও মাথা তুলছে না। তীরে নেমে নৌকার মাখা শক্ত করে ধরা দরকার এ কথাও তাদের মনে নেই।
মাঝিরা নৌকা নিয়ে ফিরে যাচ্ছে–উত্তরের নৌকা, ঘাটায় নৌকা রেখে আসবে। মাঝিদের একজন অস্পষ্ট গলায় বলল–এক আঙুল মেয়ে কিন্তু কি সাহস! এইটা হইল কশের গুণ–কত বড় বংশ দেখন লাগব না? জোকের মুখে এক মুঠ লবণ দিয়া দিছে। আচানক ব্যাপার।
মতি টাকা ধার করেছে
মতি টাকা ধার করেছে। সুদিতে একশ টাকা। সে জানে এই টাকাটা ফেরত দিতে বিরাট যন্ত্রণা হবে। প্রতি মাসে পঁচিশ টাকা করে দেয়া সহজ কথা না। আসল থেকেই যাবে। আসল আর দেয়া হবে না। কি আর করা–সুন্দর করে একটা গানের আসর করতে টাকা লাগে। আবদুল করিমকে আনতেই একশ টাকা বায়নায় চলে যাবে। হ্যাজাক বাতি লাগবে। গানের দিন বৃষ্টি নামলে সাড়ে সর্বনাশ।
গানের জায়গা নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। মতির ইচ্ছা গান রাজবাড়িতে হবে না। রাজবাড়িতে গান হলে গাঁয়ের লোক শুনতে পাবে না। রাজবাড়িতে গান হওয়ার একটাই সুবিধা–বৃষ্টি-বাদলায় কিছু হবে না।…..
গানের দিন মতি গায়ে কি দেবে তা নিয়েও দুশ্চিন্তা হচ্ছে। সিল্কের হলুদ পাঞ্জাবিটা কনুইয়ের কাছে অনেকখানি হেঁড়া। সুন্দর করে রিপু না করলে দেখা যাবে। দলের অধিকারী ছেঁড়া পাঞ্জাবি পরে উপস্থিত হওয়া ভাল লক্ষণ না। এতে দলের উপর আস্থা কমে যায়। সাদা সিল্কের একটা উনি থাকলে গলায় ঝুলিয়ে দেয়া যেত। তাতে পাঞ্জাবির হাতার ভেঁড়া ঢাকা পড়ত। তার কোন উর্নি নেই। বিছানার চাদর গলায় ঝুলিয়ে তো আর আসরে নামা যায় না। কাজলদানী খুঁজে বের করে কাজল বানাতে হবে। চোখে কাজল দিতে হবে। তার ওস্তাদ বলেছিলেন–মতি মিয়া শোন–আসরে যখন নামবি–চোখে কাজল দিবি, মুখে ছুনু-পাউডার দিবি। কাঁকই দিয়া সুন্দর কইরা চুল আঁচড়াইবি, যেন আসরে নামলেই পরথম সবে বলে আঁহা কি সৌন্দর্য! পরথমে দর্শনদারি, তারপর গুণ বিচারি। আসলে আদব-কায়দার দিকে খিয়াল রাখবি–গানের চেয়ে বড় আদব-কায়দা। আদব-কায়দা চোখে পড়ে–গান পড়ে কানে। চোখ কানের চেয়ে বড়। ধুন রাখিসরে ব্যাটা। এইটা ধুন রাখার বিষয়।
