নীতু রান্নাঘরের দিকে গেল। রমিজার মা রান্নাঘরে আছে। তার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করা যায়। এই মহিলাটাও খুব ভাল শুধু হাসে। নীতু বলেছিল, আপনি এত হাসেন কেন? সে বলেছে–মনের দুঃখে হাসি। মনে দুঃখ বেশি তো, এই জন্যে হাসিও বেশি। দার্শনিক ধরনের উত্তর। নীতুর ধারণা, গ্রামের মানুষরা সহজ সরল হলেও সহজভাবে তারা কথা বলতে পারে না। সব কথাতেই শেষ দিকে তারা ছোট একটা প্যাঁচ লাগিয়ে দেয়। এদের কথা বলার ধরনই বোধহয় এ রকম।
নীতু রান্নাঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, কি করছেন?
রানতেছি গো ময়না। খিদা লাগছে?
উহুঁ।
দেরি হইব না, তরকারি নামালেই ভাত দিয়া দিমু।
আপনারে তো বলেছি–আমার খিদে লাগেনি।
কোন দুপুরে ভাত খাইছ–খিদা তো লাগনেরই কথা।
বলেছি তো খিদে হয়নি।
নীতু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। গ্রামের মানুষের এই আরেক সমস্যা–তারা নিজে কি ভাবছে সেটাই বড়। অন্যে কি ভাবছে কি ভাবছে না সেটা জরুরি না। নীতু রান্নাঘর থেকে বের হল। ছাদে উঠলে কেমন হয়? কাঠের সিড়ি তো আছেই–চুপি চুপি উঠে গেলেই হয়। ছাদে উঠে খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা। এর মধ্যে যদি আপা তাকে খুঁজতে শুরু করে এবং খুঁজে না পায় তাহলে বেশ ভাল হয়। তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করার শাস্তি হয়।
ছাদের সিঁড়িটা নড়বড়ে। নিচ থেকে একজনকে ধরতে হয়, তবু খুব সাবধানে উঠলে হয়ত ওঠা যাবে। নীতু সাবধানী মেয়ে। সে সাবধানে উঠবে। হঠাৎ করে বৃষ্টি না নামলেই হয়। আর নামলেও ক্ষতি কি সে ভিজবে। একটু ভিজলেই তার ঠাণ্ডা লাগবে জ্বর হবে নিওমোনিয়া হবে অনেক চিকিৎসা করেও তাকে বাঁচানো যাবে না।
শাহানা অনেকক্ষণ হল ঘর অন্ধকার করে শুয়ে ত যে শুয়ে আছে। ঠিক আলসেমির জন্যে যে শুয়ে আছে তা না–ভাল লাগছে না। মানুষের স্বভাব খানিকটা বোধহয় শামুকের মত। নিজের শক্ত খোলসের ভেতর মাঝে মাঝেই তাকে ঢুকে যেতে হয়। অতি প্রিয়জনের সঙ্গও সে সময় অসহ্যবোধ হয়।
শুয়ে শুয়ে শাহানা ভাবছে, অতি প্রিয়জন বলে তার কি কেউ আছে? মা-বাবাকে প্রিয়-অপ্রিয় কোন দলেই ফেলা যায় না। মা-বাবা শরীরের অংশের মত। কারোর হাত বা পা যেমন প্রিয়-অপ্রিয় কোনটাই হতে পারে মা, মা-বাবাও পারে না। ভাই বোন শরীরের অংশের মত নয়। প্রিয়-অপ্রিয় ব্যাপারটা তাদের ক্ষেত্রে হয়ত আসে… নীতু তার খুবই প্রিয়। কিন্তু নীতুর বছরের বড় মিতু তার তেমন প্রিয় নয়। মিতুর সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলতে লাগে না। মিতুর কথা দীর্ঘ সময় শুনতেও ভাল লাগে না। অথচ মিতু চমৎকার একটা মেয়ে। তাহলে সে তার প্রিয় নয় কেন? রহস্যটা কোথায়?
শাহানা সুখানপুকুর আসবে শুনে সবচে বেশি লাফালাফি শুরু করেছিল মিতু। শাহানা বলল, দল বেঁধে সবাই চলে গেলে মার সঙ্গে কে থাকবে? মার শরীর ভাল না। মার সঙ্গে তো একজন কারও থাকা দরকার। মিতু কয়েক মুহূর্ত শাহানার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আচ্ছা আমি থাকব। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার মধ্যে মিতু চোখে চোখে অনেক কথা বলে ফেলল। সেই কথাগুলি হচ্ছে—তুমি আমাকে নিতে চাচ্ছ না কেন আপা? আমি কি করেছি? কিছুদিন পরে তুমি বাইরে চলে যাচ্ছ, আবার কবে আসবে না আসবে কে জানে! এই কিছুদিন তোমার সঙ্গে সঙ্গে থাকতে চাই। তুমি তাতে রাজি হচ্ছ না কেন? আমি যে তোমাকে কি প্রচণ্ড ভালবাসি তুমি জান না?
মিতুর প্রতি কি শাহানার গোপন কোন ঈর্ষা আছে? হয়ত আছে। ঈর্ষা করার মত কিছু কি তার আছে? মিতু সহজ সরল ধরনের মেয়ে। তার পড়তে ভাল লাগে না। বইয়ের ধারে কাছেও সে যায় না।
পরীক্ষার আগে আগে বই নিয়ে বসে আর প্রতি দশ মিনিট পর পর বলে–সর্বনাশ হয়েছে, এইবার ধরা খাব।
মা কঠিন গলায় বলেন–ধরা খাব আবার কি রকম কথা? ধরা খাব মানে কি?
ধরা খাব মানে হচ্ছে গোল্লা খাব।
কথাবার্তাগুলি আরেকটু সুন্দর কর মা।
আচ্ছা যাও–এখন থেকে সুন্দর করে কথা বলব–শান্তিনিকেতনী ঢং-এ অর্ধেক কথা বলব নাকে–হি হি হি।
মিতু কোন পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করতে পারেনি–সব পরীক্ষায় টেনে টুনে সেকেন্ড ডিভিশন মার্ক। এতেই সে খুশি। সে সব কিছুতেই খুশি। তাকে কেউ বকলেও সে খুশি। যেন এই পৃথিবীতে সে বকা খেয়ে খুশি হবার জন্যে এসেছে। মিতুকে কি শাহানা তার এই খুশি হবার অস্বাভাবিক গুণের জন্যে ঈর্ষা করে? করতে পারে।
শাহানার বিয়ে ঠিকঠাক করার পর তার মন খুব খারাপ হল নিতান্তই অপরিচিত একটি ছেলে। কয়েকদিন মাত্র দেখা হয়েছে। দুবার রেস্টুরেন্টে গিয়ে চা খেয়েছে। একবার গাড়িতে করে মেঘনা ব্রীজ পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এসেছে। ছেলেটি কেমন সে কিছুই জানে না। তার সঙ্গে জীবনের বাকি অংশটা কাটাতে হবে। কি রকম হবে সে জীবন? গভীর রাতে যদি তার হঠাৎ প্রিয় কোন বইয়ের কয়েকটা পাতা পড়তে ইচ্ছা করে তাহলে সে কি বলবে—রাত তিনটায় বাতি জ্বালিয়েছ কেন? বাতি নেভাও। চোখে আলো লাগছে। কিংবা মাঝে মাঝে যখন মানুষের শামুকের মত তার নিজেকে গুটিয়ে ফেলতে ইচ্ছা করে তখন সে বিরক্ত হয়ে বলবে না তো–কি হয়েছে তোমার, দরজা বন্ধ করে বসে আছ কেন? সমস্যাটা কি? সে তো সমস্যাটা কি বলতে পারবে না। তখন কি হবে? বিয়ের কিছুদিন পর ছেলেটিকে যদি অসহ্যবোধ হয়–তখন? বুক ভর্তি ঘৃণা নিয়ে সে প্রতি রাতে তার সঙ্গে ঘুমুতে যাবে? মাঝে মাঝে সে যখন জড়ানো গলায় বলবে–এই, কাছে আস। তখন তাকে কাছে এগিয়ে যেতে হবে? সমস্ত অন্তরাত্মা হাহাকার করে উঠলেও তাকে হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরতে হবে ঘামে ভেজা একটা শরীর। কোন মানে হয়?
