পানির দেশে গিয়েছ–সাবধানে থাকবে। হুটহাট করে পানিতে নামার দরকার নেই। তোমার মা ঠিক করেছে এবার ঢাকায় এলেই তোমাকে সাঁতার শেখানো হবে। তোমরা ভাল থেকো। তোমার জন্যে গল্পের বই পাঠালাম। ইতি তোমার বাবা…
চিঠিতে কোথাও নীতুর বান্ধবীর জন্মদিনের কথার উল্লেখ নেই। চিঠি পড়লে তবে তো উল্লেখ থাকবে। তবে নীতু জানে, তার বান্ধবী যথাসময়ে টেলিফোন পাবে। বাবা তার চিঠিটা তার সেক্রেটারীকে দেবেন। সেক্রেটারী চাচা সেই চিঠি ফাইলবন্দী করবেন–চিঠিতে জরুরি কোন ব্যাপার থাকলে সেই মত ব্যবস্থা করবেন।
নীতু বাবার চিঠি হাতে নিয়ে গম্ভীর মুখে বসে আছে। বইয়ের প্যাকেট খুলে দেখতে ইচ্ছা করছে না। রাগ লাগছে। সে চিঠি নিয়ে উঠে গেল–আপাকে পড়তে দিতে হবে। তার নিজের চিঠি–অন্যকে পড়তে দিতেও ভাল লাগে না। চিঠি তো আর গল্পের বই না যে সবাই মিলেমিশে পড়বে।
শাহানা তার ঘরে বাতি নিভিয়ে শুয়েছিল। মাত্র সাতটা বাজে। এই সময় কেউ বিছানায় শুয়ে থাকে? নীতু দরজার বাইরে থেকেই ডাকল–আপা আসব?
শাহানা বলল, আয়।
ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছি কেন?
এম্নি শুয়ে আছি।
মাথাব্যথা নেই তো?
না।
মন খারাপ?
হুঁ। মন একটু খারাপ।
কেন?
শাহানা বিছানায় উঠে বসতে বসতে বলল, জানি না কেন। যদি জানতেম আমার কিসের ব্যথা তোকে জানাতেম।
বাবা আমাকে চিঠি লিখেছেন–পড়বে?
উহুঁ।
চিঠিতে তোমার একটা খবর আছে।
কি খবর?
নীতু এসে খাটে পা দুলিয়ে বসল। পা নাচাতে নাচাতে বলল, তোমার তো খুব বুদ্ধি, দেখি আন্দাজ কর তো কি খবর।
ঠিকঠাক আন্দাজ করতে পারলে আমাকে কি দিবি?
যা চাইবে তাই দেব।
শাহানা তরল গলায় বলল, আমার বিয়ে সংক্রান্ত কোন খবর আছে। হয়ত ডেট ফাইন্যাল হয়েছে কিংবা মা বিয়ের কেনাকাটার জন্যে কোলকাতা বা ব্যাংকক যাচ্ছেন। ঠিক হয়েছে?
হুঁ।
নীতু ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল। আপার বুদ্ধি দেখে মাঝে মাঝে তার এত বিস্ময়বোধ হয়! সব মানুষের বুদ্ধি যদি আপর মত হত তাহলে পৃথিবীতে বাস করাই কঠিন হত। ভাগ্যিস সবার বুদ্ধি আপার মত না।
আপা।
উঁ।
পুষ্প মেয়েটাকে তোমার কাছে কেমন লাগছে?
ভাল তো। সারাক্ষণ তোর পেছনে ঘুর ঘুর করছে। মেরী হ্যাড এ লিটল ল্যাম্বের মত অবস্থা।
খুব মিথ্যা কথা বলে আপা–বানিয়ে বানিয়ে সারাক্ষণ মিথ্যা গল্প।
গল্প তো বানিয়ে বানিয়েই বলতে হবে–টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি এঁরা তো বানিয়ে বানিয়েই গল্প লেখেন।
আচ্ছা আপা, তুমি কি খুব বড় ডাক্তার?
হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?
সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে তুমি এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ডাক্তার।
কে ছড়াল? পুষ্প?
খোদেজার মা নামের একজন ধাই আছে–সে ছড়াচ্ছে আর পুষ্প ছড়াচ্ছে–কথা ছড়ানোয় এই মেয়ে ওস্তাদ। কোথাও কিছু শুনলেই দশ জায়গায় ছড়াবে।
এই গ্রামে কোথায় কি হচ্ছে তুই তাহলে সব জানিস?
হুঁ জানি। মতি মিয়া নামে যে গায়ক আছে সে নাকি যেখানে যত কঠিন রোগ আছে তাদের সবাইকে শুক্রবার তাঁর বাসায় যেতে বলেছে।
রোগিদের নিয়ে মিছিল করবে?
উহুঁ–শুক্রবারে তিনি তোমাকে দাওয়াত করে নিয়ে যাবেন। তুমি বিনাপয়সায় সব রোগি দেখে দেবে। পুষ্পের এক বড় বোন আছে, যার নাম–কুসুম। সেও তোমাকে দেখাবে।
কুসুমের কি অসুখ?
কি অসুখ পুষ্প জানে না। পুষ্পের ধারণা, কুসুমের কোন অসুখ নেই–তোমাকে দেখতে চায় এই জন্যে অসুখের ভান করছে। সে নাকি খুব ভান করতে পারে। কুসুমের সঙ্গে জ্বীন থাকে। তোমাকে আেগেই বলেছি।
বললেও ভুলে গেছি। কুসুমের সঙ্গে তাহলে দ্বীন থাকে!
তার চুল খুব লম্বা, একেবারে পায়ের পাতা পর্যন্ত। লম্বা চুলের মেয়েদের খুব জ্বীনে ধরে। এই জন্যে সে ঠিক করে ফেলেছে চুল কেটে তোমার মত ছোট করে ফেলবে।
আমাকে তো সে দেখেনি–বুঝল কি করে আমার চুল ছোট?
তোমাকে দেখেছে। তুমি একবার সাপের আড্ডাখানায় উপস্থিত হয়েছিলে, তখন দেখেছে।
শাহানা আবার বিছানায় শুয়ে পড়ল। ক্লান্ত গলায় বলল–একটু আগে তোর সঙ্গে আমার একটা বাজি হল না? বাজির শর্ত ছিল–আমি বাজিতে জিতলে যা চাইব তাই তুই আমাকে দিবি।
হুঁ। আমার সাধ্যের মধ্যে থাকলে দেব। কি চাও তুমি?
আমি চাচ্ছি–তুই এখন চলে যা। কথা বলতে আর ভাল লাগছে না।
নীতু আহত গলায় বলল, তুমি এম্নি বললেও তো আমি চলে যেতাম–শুধু শুধু, বাজির কথা তুললে কেন? আমার কথা শুনে তুমি বিরক্ত হচ্ছ এটা প্রথমে বললেই হত।
চট করে উঠে দাঁড়াল। তার কান্না পেয়ে গেছে। কেঁদে ফেলার আগেই তাকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। সে ছুটে ঘর থেকে বেরুতে গিয়ে দরজার চৌকাঠে বাড়ি খেয়ে মাথা ফুলিয়ে ফেলল।
নীতুর খুব একা একা লাগছে। মনে হচ্ছে সারা বাড়িতে সে একা। পুষ্প থাকলে এতটা একা লাগত না। পুষ্প গেছে তার মার কাছে। নতুন শাড়ি সে তার মাকে দেখাতে গেছে। রাতে মনে হয় আর ফিরবে না। দাদাজান বাংলোঘরে। প্রতি রাতেই তিনি একা একা দীর্ঘ সময় বাংলোঘরে বাতি জ্বালিয়ে বসে থাকেন। এই সময় কেউ আশেপাশে গেলেই তিনি বিরক্ত হন। সবাইকে মনে হয় চিনতেও পারেন না। গত রাত্রে নীতুর কিছু করার ছিল না–বাংলোঘরের দিকে গেছে। জানালা দিয়ে বুকে, দেখতে পেয়ে দাদাজান ভুরু কুঁচকে বললেন, কে?
নীতু বলল, আমি।
দাদাজান ভুরু কুঁচকে তাকিয়েই রইলেন। মনে হল চিনতে পারছেন না। নীতু প্রায় পালিয়ে চলে এল।
আচ্ছা এখন সে কি করবে? আপার কাছে যাওয়া যাবে না। দাজানের কাছে যাওয়া যাবে না, সে করবে কি? গল্পের বই পড়বে? গল্পের বই পড়তে তার কখনই খারাপ লাগে না–কিন্তু এখন পড়তে ইচ্ছা করছে না। এই বাড়িতে রাতে গল্পের বই পড়ার অনেক অসুবিধা। আলো কম। কিছুক্ষণ বই পড়লেই তার মাথা ধরে যায়।
