এই অবস্থায় মিতু একদিন এসে বলল–আপা, তোমার সঙ্গে কিছু জরুরি কথা আছে। শুনবে?
শাহানা না বলার আগেই মিতু তার কথা বলা শুরু করল—বিয়ে ঠিকঠাক হবার পরে তুমি ভয়ে এমন অস্থির হয়ে পড়েছ কেন? একজন মানুষের ভেতর অনেক রহস্য থাকে, বুঝলে আপা, রহস্যের জট খুলতে খুলতে সাত-আট বছর লেগে যায়। এই সাত-আট বছরে সংসারে নতুন শিশু আসে–পারিবারিক বন্ধনে জড়িয়ে যেতে হয়। বিয়েটা মজার এবং আনন্দের একটা ব্যাপার। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তোমার ফঁসির হুকুম হয়েছে। আর তুমি তো প্রচণ্ড বুদ্ধিমতী মেয়ে। তুমি তো তোমার স্বামীকে খুব সাবধানে নিজের মত করে তৈরি করে নিতে পারবে। তুমি যা চাও, দেখবে, আস্তে আস্তে অবস্থা এমন হবে যে ভদ্রলোকও তা-ই চাইবেন। মাঝরাতে বাতি জ্বালিয়ে গম্ভীর গলায় বলবেন–শাহানা, কিছু মনে কর না, হঠাৎ ঘুম ভাঙল। এখন আমার প্রিয় উপন্যাসের পাতা না পড়লে আর ঘুম আসবে না। অবস্থা এ রকম হতে বাধ্য। অসুবিধা হবে আমার বা আমার মত মেয়েদের।
কি অসুবিধা?
আমি তো আপা হাবা-টাইপ মেয়ে। আমি বিয়ের পর পর স্বামীর প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকব। আমার মনে হতে থাকবে, এই পৃথিবীতে আমার জন্ম হয়েছে স্বামী নামক মানুষটিকে খুশি করার জন্যে এবং সেই খুশি করতে গিয়ে এমন সুর ছেলে মানুষি করব যে আশেপাশের সবাই বলবে-ছিঃ ছিঃ!মেয়েটার কি লজ্জাশরম নেই?
তোর কি ধারণা তুই হাবা-টাইপ মেয়ে?
না, আমি আসলে খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে, তবে চিন্তা-ভাবনা করি হাবার মত।
কেন?
এম্নি। আচ্ছা তুমি এমন মুখ শুকনো করে থেকো না। চল এক কাজ করি–তিনজনে মিলে কোথাও ঘুরে আসি–খুব হৈ চৈ করে আসি।
কোথায় যাবি?
সুখানপুকুর যাবে? চল দাদাজানকে দেখে আসি। ঐ বাড়িটাতে আমার খুব যেতে ইচ্ছা করে। চল না আমরা তিন বোন মিলে হুট করে এক রাতে উপস্থিত হয়ে দাদাজানকে চমকে দেই।
শাহানা শান্ত স্বরে বলেছিল, কাউকে চমকে দিয়ে আমি তোর মত আনন্দ পাই না। আমি ঢাকাতেই থাকব–কোথাও যাব না।
শহরের বাইরে কিছুদিন থাকলে তোমার কিন্তু খুব ভাল লাগবে আপা। ঠাণ্ডা মাথায় বিয়ে টিয়ে এইসব নিয়ে চিন্তা করতে পারবে। এক কাজ কর–আমাদের নেবার দরকার নেই–তুমি বরং মনসুর ভাইকে নিয়ে যাও। বিয়ের আগের ভালবাসাবাসি দাদাজানের রাজপ্রাসাদে হোক। আমি বলব মনসুর ভাইকে?
না।
একটা সেকেন্ড থট দাও আপা, প্লীজ।
কোন থটই দেব না।
শাহানা তার কথা রাখেনি। ঢাকার বাইরে তার থাকার ব্যাপার নিয়ে সে অনেক ভেবেছে। তারপর হঠাৎ ঠিক করেছে–সে যাবে সুখানপুকুর কিন্তু মিতুকে সঙ্গে নেবে না। মানুষের মন এত বিচিত্র কেন?
বৃষ্টি পড়ছে। কি সুন্দর ঝম ঝম শব্দ! শাহানা উঠে বসল। রমিজের মা হারিকেন ” হাতে ঘরে ঢুকে বলল–ছোট আফা কই? ছোট আফা?
ঘরেই আছে। কোথায় যাবে।
ঘরে নাই। আমার বুক ধড়াস ধড়াস করতাছে আফা।
বুক ধড়াস ধড়াস করার কিছু নেই–ও ছাদে উঠে ভিজছে।
কি কন আফা! কি সর্বনাশের কথা!
কোন সর্বনাশের কথা না–চল যাই, আমি নামিয়ে আনছি।
বৃষ্টিতে ভিজে ছাদ পিচ্ছিল হয়ে আছে। রেলিং-নেই ছাদের এক কোণায় উবু হয়ে নীতু বসে আছে। শাহানা বলল, কি হয়েছে নীতু?
নীতু জবাব দিল না।
তুই কি আমার উপর রাগ করে ছাদে এসে বসে আছিস?
হুঁ।
আয় নিচে যাই। সাবধানে পা ফেলবি। যা পিছল ছাদ! আমার হাত ধর।
নীতু বলল, আমার কারো হাত ধরার দরকার নেই।
সময় হোক তখন দেখা যাবে, কারোর না কাঠের হাত ধরার জন্যে পাগল হয়ে গেছিস।
রমিজার মা নিচে কাঠের সিড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। রমিজার মার পাশে ইরতাজুদ্দিন সাহেব। একজন কামলা ইরতাজুদ্দিন সাহেবের মাথায় ছাতা ধরে আছে। ইরতাজুদ্দিন সাহেব বিস্মিত হয়ে ভাবছেন–মেয়ে দুটির মাথা কি পুরোপুরি খারাপ?
ইরতাজুদ্দিন সাহেব নীতুকে সঙ্গে নিয়ে
ইরতাজুদ্দিন সাহেব নীতুকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে বের হয়েছেন। তাঁর মন বিষণ্ণ। ভুরু কুঁচকে আছে। তিনি দুই নাতনীকে সঙ্গে নিয়েই বেড়াতে বের হতে চেয়েছিলেন। শাহানা আসতে রাজি হয়নি। তার মুখের উপর কেউ না বলবে এতে তিনি এখনো অভ্যস্ত হননি যদিও এই ব্যাপারটি এখন হচ্ছে।
শ্রাবণ মাসের সকাল। আকাশে চকচকে রোদ। রোদ তাদের কাবু করতে পারছে। কারণ তারা যাচ্ছে ছায়ায় ছায়ায়। তারপরেও দুজন লোক দুটা ছাতা হাতে পেছনে পেছনে আছে।
নীতুর শরীর ভাল না। বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডা লেগে গেছে। সর্দি হয়েছে–নাক বন্ধ। মনে হয় একটু জ্বরও এসেছে। জ্বরের কথা সে কাউকে বলেনি। নিজের অসুখবিসুখের কথা তার কাউকে বলতে ভাল লাগে না। ছায়ায় ছায়ায় হাঁটতে তার বেশ মজা লাগছে–শুধু কাদার জন্যে পা নোংরা হয়ে গা ঘিনঘিন করছে এইটুকুই কষ্ট। গ্রামের একটা জিনিশই তার খারাপ লাগে–কাদা।
ইরতাজুদ্দিন বললেন–এই গ্রামের জমিজমা যা দেখছিস সবই একসময় ছিল। আমাদের।
নীতু বলল, এখন আমাদের না?
না।
না থাকাই ভাল। আমার জমিজমা একদম ভাল লাগে না। আমার ভাল লাগে সমুদ্র। সমুদ্র যদি কেনা যেত তাহলে আমি একটা ছোটখাট সমু্দ্র কিতাম।
ইরতাজুদ্দিন সাহেবের ভুরু আরও কুঁচকে গেল। মেয়েটা প্রাকটিক্যাল হয়নি। বাস করেছে ঘোরের মধ্যে। নীতু বলল, দাদাজান, আমিন গম্ভীর হয়ে আছেন কেন?
আমি সবসময়ই গম্ভীর।
একা একা থাকেন তো, এই জন্যেই গম্ভীর হয়ে পড়েছেন। একা একা থাকলেই মানুষ গম্ভীর হয়, বদমেজাজী হয়।
