ইরতাজুদ্দিন চামচে করে এক টুকরা পেঁপে মুখে দিলেন। খুব মিষ্টি পেঁপে। ফজলি আমের মত মিষ্টি–নীতু আর শাহানকে কি পেপে দেয়া হয়েছে? তিনি ভারি গলায় ডাকলেন–রমিজের মা।
রমিজের মা ঘরে ঢুকল না। ঢুকল শাহানা। সে এর মধ্যে ভেজা শাড়ি পাল্টেছে। টাওয়েল জড়িয়ে মাথায় চুল শুকাচ্ছে। শাহানা বলল, আপনার কি কিছু চাই দাদাজান?
ইরতাজুদ্দিন বললেন, না।
ঐ মহিলার একজন মেয়ে হয়েছে। খুব সুন্দর ফুটফুটে মেয়ে। শেষ সময়ে সহজ ডেলিভারি হয়েছে।
তোর ডাক্তারি বিদ্যা কাজে লেগেছে?
হুঁ লেগেছে। আপনার কি শরীর খারাপ?
না।
শাহানা খাটের এক মাথায় বসতে বসতে বলল, আপনার নিষেধ অমান্য করে আমি গিয়েছি, সে জন্যে কি আপনি আমার উপর রাগ করেছেন?
না।
আমার উপর রাগ করার আপনার নিশ্চয়ই নিজস্ব কিছু কারণ আছে যদিও আমি তা ধরতে পারছি না। আপনি দয়া করে আমার উপর রাগ করবেন না।
রাগ করছি না।
যাই দাদাজান?
আচ্ছা যা।
যাই বলার পরেও শাহানা খাটের পাশে বসে রইল। সে একটা বিশেষ কথা বলার জন্যে আসছে, কথাটা এতই মুহূর্তে বলবে, পরে বলবে বুঝতে পারছে না। বিশেষ কোন কথা বলার জন্যে বিশেষ বিশেষ মুহূর্ত লাগে। কোন কোন মানুষ সেই মুহূর্তগুলি ধরতে পারে। অনেকেই পারে না। যেমন সে পারে না।
দাদাজান।
হুঁ।
আপনার এই সুন্দর বাড়িটার কোন নাম নেই কেন?
আপনার বাড়ি বলছিস কেন? বাড়িটা তোদেরও না? এটা আমাদের সবার বাড়ি।
বাড়িটার সুন্দর একটা নাম থাকলে ভাল হত।
ইরতাজুদ্দিন উৎসাহের সঙ্গে বললেন, দে একটা নাম দে। সুন্দর নাম দে। ময়মনসিংহ থেকে সাইনবোর্ড বানিয়ে এনে তোরা থাকতে থাকতে লাগিয়ে দেব।
শাহানা আরেকটু ঝুঁকে এসে বলল–এই বাড়িটাকে একটা হাসপাতাল বানিয়ে ফেললে কেমন হয় দাদাজান?
ইরতাজুদ্দিন তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলেন। শাহনা উৎসাহের সঙ্গে বলল, বাড়িতে পা দেয়ার পর থেকেই আমার মনে হচ্ছে–এখানে খুব সুন্দর একটা হাসপাতাল হয়।
আমাদের পঁচপুরুষের ভিটাকে তুই হাসপাতাল বানাতে চাস? এইসব বুদ্ধি কে মাথায় ঢুকিয়েছে? তোর বাবা?
বাবা কিছু বলেননি–যা বলার আমি নিজ থেকে বলছি।
ইরতাজুদ্দিন আহত গলায় বললেন–পূর্বপুরুষের কত স্মৃতি জড়ানো ভিটা, তার কোন মূল্য নেই তোর কাছে?
তাঁর মাথার শিরা দপদপ করছে। তিনি বুকের উপর চাপ ব্যথাও অনুভব করছেন। সূক্ষ এক আতংকও অনুভব করছেন। তার দিন শেষ হয়ে এসেছে তিনি আর অল্প কিছু দিন বাঁচবেন, তারপর এরা তার এই অসম্ভব সুন্দর বাড়িটা নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে। মৃত্যুর আগে বাড়িটা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিলে কেমন হয়?
শাহানা লক্ষ্য করল, তার দাদাজান হাসছেন। আন্তরিকভাবেই হাসছেন। সে বলল, হাসছেন কেন দাদাজান?
ইরতাজুদ্দিন বললেন, এম্নি হাসছি।
তিনি পেঁপের বাটি হাতে নিতে নিতে বললেন, রমিজের মাকে বল তোদের পেঁপে কেটে দিতে। খুব মিষ্টি পেঁপে। আমি নিজে এত মিষ্টি পেঁপে কখনো খাইনি।
ইরতাজুদ্দিন চামচ দিয়ে পেঁপের গায়ে লেগে থাকা কালো বিচি আলাদা করছেন। বিচিগুলি পুঁতে দিলে হয়। পেঁপে গাছ ফলবতী হতে বেশি সময় লাগে না–কে জানে তিনি হয়ত এই পেঁপে খেয়ে যেতে পারেন।
পুষ্পকে নতুন শাড়ি কিনে দেয়া হয়েছে
পুষ্পকে নতুন শাড়ি কিনে দেয়া হয়েছে। সবুজ রঙের শাড়ি। কালো শরীরে সবুজ শাড়ি এত সুন্দর মানিয়েছে! নীতুর একটু মন খারাপ লাগছে–কেন তার গায়ের রং এত ফর্সা হল! গায়ের রঙ পুষ্পের মত কুচকুচে কালো হলে সেও অবশ্যি একটা সবুজ শাড়ি কিনত। পুষ্প আজ তার বিছানা-বালিশ নিয়ে এসেছে। এখন থেকে রাতেও এই বাড়িতে থাকবে। বিছানা-বালিশ বলতে একটা মাদুর আর একটা বালিশ। বালিশটা খুব বাহারী–ফুল লতা পাতা আঁকা। সরু সূতায় পুষ্পের নাম লেখা।
নীতু এখন শাহানার সঙ্গে ঘুমুচ্ছে না। তার জন্য আলাদা ঘর। সে এবং পুষ্প এই ঘরে শোয়। ঘরটা নীতুর খুব পছন্দ হয়েছে। এই ঘর থেকে হাওড় দেখা যায়। তবে এই ঘরের সমস্যা একটাই ভোরবেলা জানালা দিয়ে সূর্যের আলো একেবারে মুখের উপর এসে পড়ে। ঘুম ভেঙে যায়। ছুটিছাটার দিনে অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমুতে ইচ্ছা করে। এই ঘরে থাকলে সে উপায় নেই।
সন্ধ্যা সাতটা। ইরতাজুদ্দিন কিছুক্ষণ আগে নীতুকে খামবন্ধ চিঠি দিয়েছেন। নীতুর বাবার চিঠি। তিনি হাতে হাতেই নীতুর চিঠির উত্তর পাঠিয়েছেন। সেই চিঠি পড়ে নীতুর মন খারাপ হল। কারণ চিঠি পড়ে পরিষ্কার বোঝা যায়, নীতুর বাবা নীতুর। চিঠি না পড়েই জবাব দিয়েছেন। অতি বোকা মেয়েও সেটা বুঝবে। নীতু বোকা মেয়ে না। তিনি লিখেছেন
মা নীতু,
তোমার চিঠি পড়ে খুব ভাল লাগল। দাদার বাড়িতে তোমরা খুব আনন্দ করছ জেনে খুশি হয়েছি। (এই লাইন পড়েই নীতু বঝেছে বাবা চিঠি না পড়েই জবাব দিচ্ছেন। কারণ নীতু তার চিঠিতে কোথাও লেখেনি তারা খুব আনন্দ করছে।
ন তারিখে তোমার মা সিঙ্গাপুর যেতে চাচ্ছে—সে শাহানার বিয়ের কিছু কেনাকাটা করবে। মনে হচ্ছে আমাকেও সঙ্গে যেতে হতে পারে। কাজেই ইচ্ছা করলে তোমরা দাদার বাড়িতে কয়েকদিন বেশি কাটিয়ে আসতে পার।
(নীতু পরিষ্কার বুঝছে চিঠির এই প্যারাটি আপার জন্যে লেখা। বাবা জানেন আপা এই চিঠি পড়বে। পড়ে জানবে যৈতার বিয়ের কেনাকাটার জন্যে তাঁরা সিংগাপুর যাচ্ছেন। এই কথাগুলি আপাকে আলাদা করে চিঠি লিখে জানালেও হত। তা তিনি জানাবেন না।)
