প্রবল ঘুমে দূর্গা আচ্ছন্ন হয়ে আসছে। ঘুমের ঘোরেই সে শুনল–শিশু কাঁদছে। কাছে কোথাও নয়–দূরে, অনেক দূরে—এই শিশুটি তার। হারানো দুই কন্যাই কি আবার ফিরে এসেছে?
খোদেজার মা শাহানার দিকে অকিয়ে বলল, আফা, এই মেয়ে বড় হইলে আপনের মত সুন্দর হইব–দেখেন কি গায়ের রঙ! ওমা, আপনের দিকে প্যাটপ্যাট কইরা আবার দেখি চায়। আপনেরে হিংসা করতেছে আফা…।
শাহানা দরজা খুলে বের হয়েছে। কোনদিকে না তাকিয়ে সে প্রায় ছুটে যাচ্ছে। সে চায় না কেউ তাকে এখন দেখুক। তার চোখ ভর্তি পানি। চোখ ছাপিয়ে এত পানি কেন আসছে তাও সে জানে না।
না, সে কোনদিন বড় ডাক্তার হতে পারবে না। বড় ডাক্তাররা হন আবেগশূন্য–তারা অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক যন্ত্র। শাহানা শাড়ির আচলে চোখ মুছে নিজেকে শান্ত করল। তার ইচ্ছা হচ্ছে সে কিশোরীদের মত ছুটতে ছুটতে যায়–কিন্তু তার শরীর অবসন্ন। পা চলছে না।
তার পেছনে পেছনে মতি যাচ্ছে। অদ্ভুত এক ধরনের শব্দ হওয়ায় শাহানা পেছন ফিরে মতিকে দেখল। মতি শব্দ করে কাঁদছে।
শাহানা বলল, কি হয়েছে আপনার?
মতি অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, কিছু হয় নাই। এত আনন্দ হইতেছে, মনে হইতেছে চিকুর দিয়া কান্দি।
শাহানা হাসল। তার মনে হচ্ছিল তাকে হাসতে দেখে মতিও নিজেকে সামলে নিয়ে হাসার চেষ্টা করবে–তা হল না। মতি কাঁদছেই।
বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। শাহানা বলল, আপনাকে আমার পেছনে পেছতে, আসতে হবে না। আপনি আপনার বাড়িতে চলে যান।
আপনার জন্যে একটা ছাতি নিয়া আসি।
আমার জন্যে কিছু আনতে হবে না। আমি আজ বৃষ্টিতে ভিজব। অনেকদিন বৃষ্টিতে ভেজা হয় না। বাবা বৃষ্টির সময় আমাদের ছাদে যেতে দেয়া বাবার ধারণা ছাদে গেলেই–আমাদের মাথায় বজ্রপাত হবে।
শ্রাবণমাসের বৃষ্টিতে বজ্রপাত হয় না।
তাই না-কি? জানতাম না তো। হলেও আজ আমিনের সাধ মিটিয়ে ভিজব।
মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঘোর বর্ষণ। শাহনা খুশি খুশি গলায় বলল, খবর্দার আপনি আমার পেছনে পেছনে আসবেন না।
শাহানা এবার কিশোরীদের মতোই ছুটছে। তীরের ফলার মত বৃষ্টি এসে তাকে বিঁধছে। হাওয়ায় উড়ছে শাড়ির আঁচল। সে ছুটে যাচ্ছে হাওড়ের দিকে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সে হাওড়ের পানি ছুঁয়ে দেখবে।
হাওড়ের দিক থেকে শোঁ শোঁ শব্দ আসছে। বাতাস পেয়ে ফুলে ফেঁপে হাওড় হয়েছে সমুদ্রের মত। ভয়ংকর আক্রোশে সে গর্জন করছে…
ইরতাজুদ্দিন সাহেব তাঁর শোবার ঘরে
ইরতাজুদ্দিন সাহেব তাঁর শোবার ঘরে ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে আছেন। তাঁর মুখ জানালার দিকে। দোতলার জানালা বলে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। তিনি শাহানাকে ভিজতে ভিজতে হাওড়ের দিকে যেতে দেখলেন–আবার ফিরে আসতেও দেখলেন। তার মধ্যে কোন রকম বাহ্যিক চাঞ্চল্য দেখা গেল না। তিনি যে ভাবে আধশোয়া হয়ে বসেছিলেন ঠিক সে ভাবেই রইলেন। ইজিচেয়ারের হাতলে পেতলের বাটিতে পেঁপে কেটে দেয়া হয়েছে। তিনি তা স্পর্শও করেননি। সকাল ৯টার মত বাজে। এই সময়ে তাঁর এক বাটি পাকা পেঁপে খাবার কথা। কবিরাজের পরামর্শমত দীর্ঘদিন ধরে খাচ্ছেন–আজ তার ব্যতিক্রম হল।
তিনি দুই নাতনীকে দেখে যে প্রবল আনন্দ পেয়েছিলেন সেই আশপ স্থায়ী হয়নি। তিনি মেয়ে দুটির সঙ্গে মিশতে পারছেন না। মেয়ে দুটিও তাঁর সঙ্গ তেমন পছন্দ করছে না। নীতু সারাক্ষণ ঘুরছে পুষ্পকে নিয়ে। প্রবল উৎসাহে তাকে লেখাপড়া শেখানো হচ্ছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে জ্ঞান বিতরণের মহৎ উদ্দেশ্যেই তার সুখানপুকুর আগমন। গল্প করার জন্যে তাকে যখনই ডাকা হয় তখনি সে বলে–একটু পরে আসব দাদাজান। এখন কাজ করছি। সেই একটু পর আর আসে না।
নীতুর যেমন পুষ্প জুটেছে শাহানার তেমন কেউ জুটেনি। ইরতাজুদ্দিন সাহেব, নিশ্চিত হয়েছেন–এই মেয়েটি একা থাকতেই বেশি পছন্দ করে। বেড়াতে এসেছে, কোথায় হৈ-চৈ করবে তা না, বেশির ভাগ সময়ই হাতে মোটা একটা বই। সেটা গল্পের বইও না, ডাক্তারি বই। অথচ মেয়েটা এমনভাবে বইটা পড়ে যে মনে হয় দারুণ মজার কোন গল্পের বই পড়ছে।
ইরতাজুদ্দিন সাহেব ভেবে রেখেছিলেন, মেয়ে দুটিকে তিনি নিজে গ্রাম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাবেন–কিন্তু মেয়েদের তাতে কোন উৎসাহ দেখা গেল না। ছোটটি ঘর থেকেই বের হতে চায় না–বড় জন বেড়াতে চায়–কিন্তু একা একা। মেয়ে দুটি তাঁকে পছন্দ করছে না।
এ সময়ের আধুনিক মেয়েদের মন পাবার কলা-কৌশল তার জানা নেই। তিনি চেষ্টা করেছেন নিজের মত। ছাদে উঠতে চেয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে ছাদে ওঠার সিড়ি বানিয়ে দিয়েছেন। কাঁঠাল গাছে চওড়া দোলনা লাগিয়ে দিয়েছেন। হাওড় দেখার জন্যে বড় একটা বজরা নৌকা আনিয়ে ঘাটে বেঁধে রেখেছেন। মেয়ে দুটি তার আন্তরিক চেষ্টার কোন মূল্য দিচ্ছে না। তারা আছে নিজেদের মত।
ইরতাজুদ্দিন সাহেবের এখন মনে হচ্ছে, তিনি সামান্য ভুল করেছেন। এরা দুদিন থাকার জন্যে এসেছিল, দুদিন থেকে চলে গেলেই ভাল হত।
জোর করে আটকে রেখে তিনি এদেরও কষ্ট দিচ্ছেন, নিজেও খুব সূক্ষভাবে হলেও কষ্ট পাচ্ছেন। তিনি মেয়েদের কষ্টটা বুঝতে পারছেন, কিন্তু মেয়ে দুটি তার কষ্ট বুঝতে পারছে না। দিনের পর দিন একটা বিশাল বাড়িতে একা থাকার কষ্ট মেয়ে দুটি জানে না।
তার বয়স হয়েছে। মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করার মত বয়স। এই অপেক্ষা প্রিয় ও ঘনিষ্ঠজনদের চারপাশে নিয়ে করা যায়–কিন্তু একা একা নির্বান্ধব পুরীতে বসে অপেক্ষা করা যায় না।
