সুলেমান হ্যাঁ-সূচক ঘাড় কাত করল। সিদ্দিকুর রহমান সহজ গলায় বললেন, কানে ধরে নিয়ে যাবে। ভুল হয় না যেন।
সুলেমান আবারো হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
লীলা বিচারপ্রক্রিয়া শুনল। কিছুই বলল না। সে এই বাড়িতে আর থাকছে। না। চলে যাচ্ছে। বাড়ির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যোগ রাখার আর অর্থ হয় না। পৃথিবীর সবকিছু তার নিজের নিয়মে চলে। এই বাড়ি চলবে বাড়ির নিয়মে। এই বাড়ির নিয়ম যদি হয় কথায়-কথায় কানো ধরে ঘোরানো তাহলে তা-ই সই। লীলা যখন তার ব্যাগ গোছাচ্ছিল তখন মাসুদ এসে তার সামনে দাঁড়াল। লীলা বলল, কিছু বলবে? মাসুদ কথা বলে নি। লীলা একবার ভাবল কিছু উপদেশ দেয়। তেমন কোনো উপদেশ তার মাথায় আসে নি। লীলা বলল, তুমি কিছু বলতে চাইলে বলো। মাসুদ তখন বিড়বিড় করে বলল, আমাকে আপনার সঙ্গে নিবেন?
লীলা বলল, না।
মাসুদ বলল, আমি কী করব বলে দেন।
লীলা বলল, তুমি কী করবে সেটা তুমি চিন্তা করে বের করবে।
মাসুদ সামনে থেকে চলে গেল। তার কিছুক্ষণ পর সত্যি সত্যি তাকে কানে ধরে স্টেশনের দিকে নিয়ে গেল সুলেমান। সুলেমানের পেছনে আছে লাঠি হাতে লোকমান। তাদের পেছনে গ্রামের কিছু লোকজন, কিছু বাচ্চ-কাচ্চা। সিদ্দিকুর রহমান সাহেব বলে দিয়েছিলেন ছেলেকে যেন পরীবানুর বাড়ির সামনে কিছুক্ষণ রাখা হয়। সেই কাজটা করা হলো। পরীবানু বাড়ি থেকে বের হয়ে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ এই দৃশ্য দেখে বাড়িতে ঢুকে গেল।
ট্রেন ছুটছে। আকাশ মেঘলা। বাইরের পৃথিবী অন্ধকার দেখাচ্ছে। দেখতে ভালো লাগছে। দূরের গাছপালাকে কুচকুচে কালো লাগছে।
বাবার কাছ থেকে বিদায়ের দৃশ্য কেমন হবে এটা নিয়ে লীলার মনে সামান্য দুশ্চিন্তা ছিল। তবে লীলা মোটামুটি নিশ্চিত ছিল যে আবেগঘন কিছু হবে না। বাবা স্বাভাবিক সৌজন্যের কিছু কথাবার্তা বলবেন। লীলা ঠিক করেছে, সে বিদায় নেবার সময় তীক্ষ্ণ চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকবে। তার দেখার ইচ্ছা এই অতি কঠিন মানুষটার চোখে পানি আসে কি-না। পানি না এলেও চোখ কি ছলছল করবে?
সিদ্দিকুর রহমান মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, ফি আমানিল্লাহ। যাও। তুমি এসেছিলে, মনে তৃপ্তি পেয়েছি, এর বেশি আমার কিছু বলার নাই। তোমার দাদির একটা গয়না আমার কাছে আছে। আমার খুব শখ গয়নাটা তোমাকে দেই। গয়নাটা নিবে?
লীলা বলল, না।
সিদ্দিকুর রহমান বললেন, তোমার মায়ের একটা খাতা আমার কাছে আছে। নানান সময়ে সে গুটুর গুটুর করে কী সব লিখত। এই বাড়ি ছেড়ে যাবার সময় সে খাতাটা ফেলে গেছে। মনে হয় ইচ্ছা করেই ফেলে গেছে। তুমি চাইলে খাতাটা তোমাকে দিতে পারি।
ইচ্ছা করে ফেলে যাবে কেন?
খাতায় আমার সম্পর্কে, আমার দাদিজান সম্পর্কে অনেক অন্দমন্দ কথা আছে। মনে হয় তোমার মা চেয়েছিল। আমি লেখা পড়ে মনে কষ্ট পাই।
খাতাটা আমি নিব।
সিদ্দিকুর রহমান বললেন, মা শোনো, তোমার পড়াশোনার খরচ, বিবাহের খরচ সব আমি দিতে চাই।
আপনাকে কিছু দিতে হবে না।
আচ্ছা ঠিক আছে।
বাবা, আমি এখন রওনা দেই।
তোমার জন্যে পালকি আনতে লোক গেছে। পালকি আসুক, তারপরে যাবে।
কথাবার্তার এই পর্যায়ে লীলা লক্ষ করল, তার বাবার চোখে পানি। তিনি চট করে মাথা সরিয়ে ফেললেন যেন লীলা চোখের পানি দেখতে না পায়।
মায়ের লেখা খাতা লীলা বেশ খানিকটা পড়ে ফেলেছে পালকিতে আসতে আসতে–
আজ শুক্রবার। জুম্মাবার। আমার মনে কোনো শান্তি নাই। আমি আজ ফজরের নামাজ পড়িয়া আল্লাহপাককে বলিয়াছি— ও আল্লাহগো, ও দয়াময়, তুমি দয়া করো। তুমি ডাইনির হাত হইতে আমাকে উদ্ধার কর। মানুষ কী প্রকারে এমন হইতে পারে?
আমি আমার দাদি শাশুড়িকে ডাইনি বলিতেছি। ইহা অতীব অন্যায়। কিন্তু কত দুঃখে বলিতেছি, তাহা কি কেউ বুঝিবে? গত বুধবারের ঘটনা। বুধবারে এই অঞ্চলে বিরাট হাট বসে। উনি লোকজন নিয়া হাটে গিয়াছেন। বাড়ি প্রায় খালি। আমার দাদিশাশুড়ি আমাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। আমি উনার সম্মুখে উপস্থিত হইতেই উনি বলিলেন, নাতবউ, তোমার বুনি দুইটা এত বড় কেন? বিবাহের পূর্বেই কেউ হাতাপিতা করিয়াছে? বিবাহের পূর্বে হাতাপিতা করলে বুনি বড় হয়।
আমি এতই অবাক হইলাম যে আমার জবান বন্ধ হইল। আমি চুপ করিয়া আছি, তখন ডাইনি বলিল, ব্লাউজ খোল, আমি তোমার বুনি দেখব।
আমি বলিলাম, আপনি যদি আমাকে কোনোদিন এই জাতীয় কথা বলেন। তাহলে আমি খেজুরের কাঁটা দিয়া আপনার চোখ গালাইয়া দিব। আল্লাহর কসাম।
এই হইল ঘটনা। এই ঘটনা আমি কাহাকে বলিব? কে আমার কথা শুনিবে? উনি তাহার দাদিজানের বিষয়ে অন্ধ। কেন অন্ধ তাহাও বুঝি না।
ও আল্লাহপাক, ও দয়াময়, তুমি এই খবিস ডাইনির হাত হইতে আমাকে উদ্ধার করো।
লীলা ট্রেনের জানালা থেকে মাথা ভেতরে নিয়ে এলো। হঠাৎ তার খানিকটা মন খারাপ লাগছে। কেন লাগছে তা বুঝতে পারছে না। সে মঞ্জুমামার দিকে তাকাল। বেচারার আরো কিছুদিন থাকার ইচ্ছা ছিল। লীলা জোর করেই তাকে নিয়ে এসেছে। ট্রেনে উঠার সময় তার বেশ মন খারাপ ছিল। এখন আর মন খারাপ নেই। মহাউৎসাহে তিনি রাজনীতির আলাপ জুড়েছেন।
শুনেন, পরিষ্কার হিসাব শুনেন–বাঙালি জাতি যুক্তভাবে কিছু করতে পারে না। বাঙালি বিযুক্ত জাতি। ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াইয়ের জাতি। এখানে যুক্তফ্রন্ট চলে? চলে না। হক সাহেব বিরাট বোকামি করেছেন। আমাদের দরকার লাঠির শাসন। মিলিটারির শাসন। বাঙালি গরমের ভক্ত, নরমের যম। বুঝেছেন কিছু?
