লীলা তাকিয়ে আছে। সে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে বুঝতে চেষ্টা করছে। বুঝতে পারছে বলে মনে হচ্ছে না। সিদ্দিকুর রহমান মেয়ের দিকে তাকিয়ে অভয়দানের ভঙ্গিতে হাসলেন।
লীলা তার সৎমায়ের সামনে বসে আছে। তার মনে ক্ষীণ অস্বস্তি। অস্বস্তির কারণ, তার কেন জানি মনে হচ্ছে— এই অসুস্থ মহিলা হঠাৎ এক নলা ভাত তার মুখের সামনে ধরে আদুরে গলায় বলবেন, মা খাওগো। লীলা। এই মহিলার হাতের নলা কখনো মুখে নিতে পারবে না। অসুস্থ মানুষকে সে কিছু বুঝিয়েও বলতে পারবে না। অসুস্থ মানুষ যুক্তি মানে না। তারা একবার অপমানিত বোধ করলে সেই অপমানবোধ মনের গভীরে ঢুকে যায়। তাদের এলোমেলো জগৎ হঠাৎ করে আরো এলোমেলো হয়। তার ফল শুভ হয় না।
তোমার নামটা বড় সুন্দর, লীলা। নামটা কে রাখছে গো?
মা রেখেছেন।
তোমারে খুব আদর করত?
সব মা-ই তো ছেলেমেয়েদের আদর করে। এমন মা কি আছে যে ছেলেমেয়েদের অনাদর করে?
আমি করি। আমি যেমন করি তারাও করে। এই যে আমার ছেলেটা বাড়িঘর ছেড়ে পালায়ে গেল, আমারে মুখের দেখাও দেখল না।
লীলা কী বলবে ভেবে পেল না। অসুস্থ রমিলার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তুমি কবে যাইবা গো মা?
আমি কাল সকালে যাব।
রমিলা এই কথা শুনে হেসে ফেললেন। মুখে ভাতের নলা তুলতে যাচ্ছিলেন, সেই নলা নামিয়ে রেখে হেসে কুটি-কুটি হলেন। লীলা বলল, হাসেন কেন?
তোমার কথা শুইন্যা হাসি।
আমার কথাটা কি খুব হাসির?
হুঁ হাসির। তুমি কোনোদিন যাইবা না। এইখানেই থাকবা।
ভবিষ্যদ্বাণী করছেন?
যেটা ঘটব সেইটা বললাম। মিলাইয়া দেইখো।
আচ্ছা মিলিয়ে দেখব।
খাওয়া শেষ হইছে গো মা, এখন হাত ধুব।
আসুন আপনার হাত ধুইয়ে দিই।
রমিলা লীলার এই কথায় আবারো হেসে কুটি-কুটি হলেন। এইবার আর লীলা জিজ্ঞেস করল না, কেন হাসেন। রমিলা হঠাৎ হাসি থামিয়ে বললেন, আমার খুব ইচ্ছা ছিল তোমার মুখে একটা ভাতের নলা তুইল্যা দেই। তুমি ঘিন্না পাইবা বইলা দিলাম না। তোমারে দেইখা মনে হয় তোমার ঘিন্না বেশি।
লীলা তাকিয়ে আছে। রমিলা খুব হাসছেন।
আনিসের জ্বর খুব বেড়েছে। সে প্ৰলাপ বিকা শুরু করেছে। সে ক্রমাগত কথা বলে যাচ্ছে। কী বলছে সে নিজে জানে না। একটা ব্যাপার তার খুব ভালো লাগছে— সে যা বলতে চাচ্ছে বলতে পারছে। কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
অসম্ভব রূপবতী একটি মেয়ে চিন্তিত মুখে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এই ব্যাপারটাও তার খুব ভালো লাগছে। মেয়েটি একা দাঁড়িয়ে নেই, তার সঙ্গে আরো অনেকে আছে। সিদ্দিক সাহেবও আছেন। কিন্তু অন্য কাউকেই আনিস স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। মেয়েটিকে দেখতে পাচ্ছে। আনিস মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি ভাববেন না যে আমি আপনাকে চিনি না। আপনাকে আমি খুব ভালোভাবে চিনি। আপনি সিদ্দিক সাহেবের বড় মেয়ে লীলাবতী। আপনার নাম উল্টো করলে কী হয় জানেন— তীবলালী। আমার নাম উল্টো করলে মেয়েদের নাম হয়ে যায় সনিআ। আমার মা আপনাকে দেখলে কী বলত জানেন? আপনাকে দেখলে বলত, আইত্যান্ত সুন্দরী কন্যা। আমার মা অত্যন্ত বলতে পারে না। মাঝখানে একটা ই লাগিয়ে আইত্যান্ত।
লীলাবতী নামের মেয়েটা আনিসকে কী যেন বলল। আনিস তার কথা শুনতে পেল না। সে এখন কারো কথাই শুনতে পাচ্ছে না, শুধু নিজের কথাগুলি পরিষ্কার শুনছে।
ট্রেন থেমে আছে
প্রায় আধঘণ্টার উপর ট্রেন থেমে আছে।
কোন থেমে আছে। কেউ বলতে পারছে না। কতক্ষণ থেমে থাকবে তাও কেউ বলতে পারছে না। ব্যাপারটা নিয়ে কাউকে চিন্তিত মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সবাই খুশি। জানালার পাশে একটা সিট নিয়ে লীলা বসেছে। বেঞ্চের সর্বশেষ সিট বলে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসেছে। লীলার পাশেই মঞ্জু। তার হাতে ফ্লাস্ক ভর্তি গরম পানি। চা বানানোর সরঞ্জাম। ভদ্রলোকের প্রধান শখ চলন্ত ট্রেন বা বাসে নিজের হাতে বানিয়ে চা খাওয়া। মঞ্জুর মেজাজ খারাপ। তার আরো কিছুদিন থাকার ইচ্ছা ছিল। জায়গাটা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার আগেই চলে যেতে হচ্ছে এটা কেমন কথা? চলে আসার সময় কইতরী এমন কান্না শুরু করল যে তার নিজের চোখেও পানি এসে গেল। তিনি গম্ভীর গলায় ঘোষণা দিলেন– মা, কাঁদিস না। আমি লীলাকে পৌছে দিয়ে চলে আসব। তারপর যতদিন ইচ্ছা নিজের মতো থাকব। ভদ্রলোকের এককথা। আমি ভদ্রলোক।
লীলাদের উল্টোদিকের বেঞ্চে কান্ত হয়ে আনিসুর রহমান শুয়ে আছে। এই গরমেও তার গায়ে মোটা চাদর। শীত লাগছে–এই কথাটা সে কাউকে বলতেও পারছে না। আশেপাশে কেউ থাকলে সুটকেস খুলিয়ে সুটকেস থেকে সে আরেকটা চাদর বার করত। পায়ের তালুতে শীত বেশি লাগছে। একজোড়া মোজা পরলেও হতো। সে চোখ খোলা রাখতে পারছে না। চোখে রোদ লাগছে।
আনিসুর রহমান কলেজের চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। এখন সে যাচ্ছে মায়ের কাছে। ডাক্তার দেখিয়ে প্রথমে শরীর সারাবে। পরেরটা পরে দেখা যাবে। তার যাত্ৰাসঙ্গী হয়েছে বড় সাহেবের মেয়ে লীলা। এটা অস্বস্তিকর। পরিচিত কেউ না থাকলে ভালো হতো। পরিচিত কেউ থাকা মানেই কিছু সৌজন্যমূলক কথাবার্তা। অসুস্থ অবস্থায় কোনো কথাবার্তা বলতে ইচ্ছা করে না। কথা শুনতেও ভালো লাগে না। তবে লীলা মেয়েটা ভালো। তার মধ্যে লোক দেখানো ব্যাপারটা নেই। শরীর কেমন? খারাপ লাগছে?— এই জাতীয় কোনো কথাই সে বলছে না। জানোলা দিয়ে মুখ বের করে সে আছে নিজের মতো। মঞ্জু আনিসের কাছে এসে বলল, আমার কাছে বালিশ আছে, নিজের বালিশ বিছানার চাদর ছাড়া আমি বের হই না। আপনাকে দেব?
