আপনার কথা শুনে হাসি।
আমার কথা শুনে কেন হাসলে?
লীলা বলল, কী জন্যে হেসেছি তার কারণ আমি জানি না। অন্য একজন হয়তো জানেন। কিন্তু তিনি তো কিছু বলেন না।
সিদ্দিকুর রহমান মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। লীলা তাকিয়ে আছে তার বাবার দিকে। কেউ চোখের পাতা ফেলছে না। মনে হয়। একজন অন্যজনকে বোঝার চেষ্টা করছে।
লীলাদের বাড়ি মঞ্জুর পছন্দ হয়েছে
লীলাদের বাড়ি মঞ্জুর পছন্দ হয়েছে। এ বাড়িতে আজ তাঁর তৃতীয় দিবস। পছন্দের মাত্রা প্রতিদিনই বাড়ছে। লক্ষণ ভালো নয়। চক্রবৃদ্ধি হারে যদি পছন্দ বাড়তে থাকে তাহলে একসময় দেখা যাবে তিনি এখানেই স্থায়ী হয়েছেন। তিনি কোথাও স্থায়ী হতে চান না। শিকড় বসানো গাছের স্বভাব। তিনি গাছ না, মানুষ। মানুষের কোথাও শিকড় বসাতে নেই।
তবে এই বাড়ির প্রতিটি মানুষকে তার মনে ধরেছে। সবচে মনে ধরেছে লীলার দুই বোনকে। কইতরী এবং জইতরী। আদর করে এদেরকে এখন তিনি ডাকছেন ‘কই’ এবং জই। কইতরী তার সঙ্গে আছে ছায়ার মতো। জাইতরী তাকে লক্ষ করে দূর থেকে। সে হয়। দরজার আড়াল থেকে তাকে দেখবে কিংবা গাছের আড়াল থেকে দেখবে। কইতরীর মতো রূপবতী বালিকা তিনি তাঁর জীবনে দ্বিতীয়টি দেখেন নি— এই ঘোষণা কয়েকবারই দেওয়া হয়েছে। কইতরীকে নিয়ে তিনি খানিকটা দুশ্চিন্তাও বোধ করেছেন। অতি বড় রূপসী ঘর পায় না— এই প্রবাদের কারণে। তাছাড়া মেয়েটির চুলও লাল। লাল চুলের মেয়েরা কোথাও স্থায়ী হতে পারে না। তাদের কলমিলতার মতো ঘুরে বেড়াতে হয়।
উঁচু কপালি চিড়ল দন্তী পিঙ্গল কেশ
ঘুরবে কন্যা নানান দেশ।
মঞ্জুর সেবার জন্যে যাকে নিযুক্ত করা হয়েছে তাকেও তাঁর খুব পছন্দ হয়েছে। লোকটির নাম বন্দু। বয়স ত্ৰিশের মতো। গাঢ় কৃষ্ণবর্ণের ক্ষীণকায় একজন মানুষ। ছয় ফুটের মতো লম্বা। সে মনে হয় তার শারীরিক দৈর্ঘের কারণে লজ্জিত। তার চেষ্টা কুঁজো হয়ে, বাঁকা হয়ে লম্মা শরীরটা যতটা পারে কমিয়ে রাখা। বন্দুর দোষ হলো, সে সারাক্ষণ কথা বলে। আর তার গুণ হলো, সেইসব কথা শুনতে ভালো লাগে।
দুপুরবেলা বদু মঞ্জুর সারা শরীরে সরিষার ঝাঝানো তেল মাখিয়ে দলাইমলাই করে। আরামে তার চোখ বন্ধ হয়ে ঘুম পেয়ে যায়। তখন তার মনে হয়, মানবজীবনের সার্থকতা এই দলাই-মলাইয়ে। সবচে মজার কথাগুলি বদু এই সময় বলে।
বুঝছেন স্যার, আমার চাচাজি কিন্তুক হুঁ হুঁ হুঁ…।
হুঁ হুঁ হুঁ আবার কী? পরিষ্কার করে বলো।
সবকিছু পরিষ্কার করে বলা যায় না। স্যার। কিছু ভাবে বুঝতে হয়। ভাবে বুঝেন। নজর কইরা ভাব দেখেন।
কী ভাব দেখাব?
বাঁশের আগাত লণ্ঠন জ্বালাইছে, দেখেন নাই? এখন বলেন দেখি ঘটনা!
বলতে পারছি না। কী ঘটনা?
পাকা দালান থুইয়া টিনের ঘরে থাকে, বলেন দেখি কী ঘটনা?
বলতে পারছি না। কী ঘটনা?
চাচাজির জিন-সাধনা আছে। এই হইল ঘটনা।
কী সাধনা?
জিন-সাধনা। উনার দুই পালা জিন আছে। এরা দুই ভাই।
কী উল্টা-পাল্টা কথা বলো?
শুনতে না চাইলে বলব না। জবান বন্ধ করলাম। তয় আমি ছিলাম। তার পাংখা বরদার। রাইতের পর রাইত আমি তারে পাংখা দিয়া হাওয়া দিছি। তার অনেক ঘটনা স্বচক্ষে দেখা।
কী দেখেছ?
সেটা তো বলব না।
কেন বলব না?
সব কিছু বলা ঠিক না। পাগলা হন্টন সাবের ভূত থাকে শহরবাড়িত। মাঝে মধ্যে সে গিয়া বড় স্যারের সাথে ইংরেজিতে গফসফ করে। সেই গফসফও আমি শুনেছি।
কী শুনেছ?
সেটা তো আফনেরে বলব না। আমার অন্ত শখ নাই। গোপন জিনিস। আমি লাড়াচাড়া করি না।
বড় সাহেব সম্পর্কে যত কথাই তিনি শোনেন না কেন, মানুষটাকে তাঁর পছন্দ হয়েছে। শুধু পছন্দ নয়, বেশ পছন্দ। তার কাছে মনে হচ্ছে, এমন বিনয় এবং ভদ্রতা তিনি খুব কম মানুষের মধ্যে দেখেছেন। শরীফ ঘরের মানুষদের মধ্যেই শুধু এই জিনিস দেখা যায়। লীলার বাবা যে অতি বড়ঘরের মানুষ এই বিষয়ে তিনি এখন একশ ভাগ নিশ্চিত।
সিদ্দিকুর রহমান গতকাল দুপুরে মঞ্জুকে বলেছেন, আপনি আমার মেয়েটাকে কষ্ট করে নিয়ে এসেছেন। আপনার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই। আমি আপনাকে সামান্য সম্মান করতে চাই।
মঞ্জু বিস্মিত গলায় বললেন, আপনার কথা বুঝতে পারছি না। সম্মানের মধ্যেই তো আছি। নতুন করে আর কী সম্মান করবেন?
একটু বিশেষ সম্মান করতে চাই।
মঞ্জু অবাক হয়ে বলেছেন, আচ্ছা ঠিক আছে। করেন, কী করতে চান। আমি দেখতে চাই ব্যাপারটা কী? সন্মান পাওয়ার জন্যে নয়, ঘটনা কী জানার জন্যে।
মঞ্জু ঘটনার জন্যে অপেক্ষা করছেন। এখনো কিছু ঘটে নি। কবে ঘটবে বোঝা যাচ্ছে না। সিদ্দিকুর রহমান যে ব্যাপক কিছু করবেন। এটা আন্দাজ করা যাচ্ছে। যে-কোনো বড় কর্মকাণ্ডের জন্যে ব্যাপক প্রস্তুতি লাগে। সমস্যা একটাই, লীলা হয়তো হুট করে বলে বসবে–একদিনের জন্যে বাবার দেশ দেখতে এসেছিলাম। দেখা হয়েছে। এখন চলে যাই। আমার শখ মিটে গেছে।
লীলাকে অগ্রাহ্য করা অসম্ভব ব্যাপার। লীলা যদি বলে চলো যাই, তাকে যেতেই হবে। যে সব মেয়ের নাক খাড়া এবং যাদের চিবুক ঘামে তাদের নিয়ে এই সমস্যা। তাদের কথা আগ্রাহ্য করা যায় না। লীলার নাক খাড়া এবং তার চিবুক ঘামে। খুবই খারাপ লক্ষণ।
বড় সম্মান তাকে কী দেখানো হবে এটা নিয়ে তিনি একধরনের দুশ্চিন্তার মধ্যেই আছেন। কারো সঙ্গে যে বিষয়টা নিয়ে আলাপ করবেন। সেই সুযোগও হচ্ছে না। তিনি যে কামরায় থাকেন তার পাশের কামরাতেই আনিসুর রহমান বলে এক যুবক থাকে। জাইতরী, কইতরী দুই বোনকে সন্ধ্যাবেলায় পড়ায়। জয়গির টাইপ ব্যাপার হবে। মঞ্জু। কয়েকবারই তার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করবার জন্যে গিয়েছিলেন। সে প্রতিবারই মুখ শুকনো করে বলেছে, আমার শরীরটা ভালো না। পরে কথা বলি?
