সিদ্দিকুর রহমান ছেলের দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় ডাকলেন, মাসুদ!
মাসুদ ক্ষীণস্বরে বলল, জি?
তবলা এমন কঠিন বিদ্যা যে এটা শেখার জন্যে মানুষের বাড়িতে রাত কাটাতে হয় এটা জানতাম না। তুমি কি সারারাত তবলা বাজাও, নাকি তবলা শেখার পাশে পাশে কুদ্দুসের মেয়েটার সাথে তবলা বিষয়ে কথা বলে? কুদ্দুসের মেয়ে যেহেতু গান-বাজনার মধ্যে আছে সেও নিশ্চয়ই তবলা বিষয়ে জানে। এই মেয়ে, তুমি জানো না?
পরীবানু কিছু বলল না। খুঁটির আড়ালে চলে গেল।
তোমার নাম কী?
পরীবানু জবাব দিল না। পরীবানুর বাবা কুদ্দুস ভীত গলায় বলল, জনাব, আমার মেয়ের নাম পরীবানু।
সিদ্দিকুর রহমান বললেন, মেয়ে যেমন সুন্দর, নামও সুন্দর। এই মাসুদ, পরীবানু সুন্দর মেয়ে না?
মাসুদ পুরোপুরি পাংশুবৰ্ণ হয়ে গেছে। ভয়ঙ্কর কিছু যে আসছে। সে বুঝতে পারছে। কতটা ভয়ঙ্কর সে-সম্পর্কে তার ধারণা নেই।
সিদ্দিকুর রহমান ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, মাসুদ যাও, পরীবানুর পায়ে কদমবুসি করে বলো— তুমি আমার মা। এটা বলতে দোষের কিছু নাই। মেয়েছেলে মায়ের জাত। বয়সে ছোট মেয়েকেও মা ডাকা যায়। যাও, দেরি করবা না। দেরি আমার ভালো লাগে না। পরীবানু এখন থেকে তোমার মা।
লীলার কাছে মনে হচ্ছে বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটা এখন আর হাসিতামাশা রসিকতার পর্যায়ে নেই। বাড়াবাড়ি ভালো জিনিস না। সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মাসুদ পরীবানুর কাছে এসে বসে পড়ল। হাত দিয়ে পা স্পর্শ করল না, তবে মুখ বিড়বিড় করে বলল, আপনি আমার মা।
পরীবানু কাঁদছে। কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে না, তবে শরীর কাপা দেখে বোঝা যাচ্ছে।
সিদ্দিকুর রহমান বললেন, শাস্তি সামান্য বাকি আছে। আমার এই ছেলে লজার মাথা খেয়েছে। তার এখন লাজলজা নাই। যে-মেয়ের সঙ্গে ভাব ভালোবাসার চেষ্টা করেছে তারেই মা ডাকতেছে। সুলেমান, এখন আমার বেহায়া ছেলেরে কানো ধরে সারা গ্রামে একটা চক্কর দেবার ব্যবস্থা করো। ন্যাংটা করে চক্কর দেয়াবে। গায়ে যেন একটা সুতাও না থাকে। লজ্জা যখন নষ্ট হয়েছে পুরোপুরি নষ্ট হোক। দেরি করবা না, এরে ন্যাংটা করো। এইখানেই করো। মেয়েরা উপস্থিত আছে তাতে কোনো অসুবিধা নাই। মেয়েদের মধ্যে একজন এখন সম্পর্কে তার মা হয়, মার সামনে পুত্র নগ্ন হতে পারে। এতে লজ্জা নাই।
লীলা অবাক হয়ে দেখল, সত্যি সত্যি সুলেমান নামের লোকটা মাসুদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যে-ভঙ্গিতে এগোচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে নগ্ন করার কাজটা সে করবে। লীলা সুলেমানের দিকে এক পা এগিয়ে কঠিন গলায় বলল, সুলেমান শুনুন, খবরদার! যথেষ্ট হয়েছে।
সুলেমান থমকে দাঁড়াল। হতভম্ব হয়ে তাকাল। একবার লীলার দিকে আরেকবার সিদ্দিক সাহেবের দিকে। সিদ্দিক সাহেব এখন সিগারেট ধরাবার চেষ্টা করছেন। বাতাসের কারণে সিগারেট ধরানো যাচ্ছে না। দেয়াশলাই বারবার নিভে যাচ্ছে। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে আশেপাশে কী ঘটছে না-ঘটছে তা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই।
মাসুদ মেঝেতে বসেছিল। লীলা তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। লীলা হাত বাড়িয়ে বলল, আসো আমার সঙ্গে। মাসুদ সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। লীলা হাত ধরে তাকে নিয়ে বাগানের দিকে রওনা হলো। মাসুদ এখন কাঁদতে শুরু করেছে। শব্দ করেই কাঁদছে।
সিদ্দিক সাহেবের সিগারেট শেষ পর্যন্ত ধরেছে। তিনি সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন– এ আমার বড় মেয়ে। আমার বড় মেয়ের কথার উপরে আর কোনো কথা নাই। আজ থেকে তার কথাই খাবাড়ির শেষ কথা। তোমরা ভিড় করে থাকবে না। যাও, যে যার কাজে যাও।
অতি দ্রুত লোকজন সরে গেল। সিদ্দিকুর রহমান আবারো ইজিচেয়ারে শুয়ে পড়লেন। চোখ বন্ধ করে বললেন— সুলেমান, আমার বড় মেয়েকে কেমন দেখিলা? বাপকা বেটি না?
জি, বাপকা বেটি।
মাসুদরে আমি ন্যাংটা করে শাস্তি দিতাম না। এই শাস্তি দেয়া যায় না। তারপরেও এরকম একটা শাস্তির কথা কেন বললাম জানো?
জি না।
আমার বড় মেয়ে কী করে সেটা দেখার জন্যে। যেরকম করবে ভেবেছিলাম সে-রকম করেছে। মাশাল্লাহ! মেয়েটা হয়েছে অবিকল তার মার মতো। যেরকম চেহারা, সেরকম স্বভাবচরিত্র।
সিদ্দিকুর রহমানের চোখে দ্বিতীয়বার পানি এসেছে। তার বড় ভালো লাগছে।
সুলেমান!
জি?
আবার জিজ্ঞেস করতেছি, ভেবেচিন্তে বলো। এই মেয়ে বাপকা বেটি না?
জি, বাপকা বেটি।
একটা মজার কথা বলি শোনো— আমার দাদাজান একবার সন্ধ্যাকালে করলেন কী, লম্বা একটা বাঁশের মাথায় একটা হারিকেন ঝুলায়ে বাশটা বাড়ির উঠানে পুতে দিলেন। সবাই জিজ্ঞেস করল, ব্যাপার কী? দাদাজান বললেন, একটা ঘটনায় আমার মনে খুব আনন্দ হয়েছে। এইজন্যে কাজটা করলাম। সবাই জানতে চাইল, ঘটনা কী? দাদাজান বললেন— ঘটনা। কী আমি বলব না। আমার মনের আনন্দটা সবাই দ্যাখা। আনন্দের পেছনে ঘটনা জানার দরকার নাই। দাদাজানের মতো আজ আমার মনেও আনন্দ হয়েছে। বাশের আগায় একটা হারিকেন আজকেও ঝুলাও।
সুলেমান বলল, জি আচ্ছা।
কেউ যদি জানতে চায় ঘটনা কী— কিছু বলব না। সব ঘটনা সবার জানার দরকার নাই। সকখঘটনা শুধু আল্লাহপাকই জানবেন। আর কেউ না।
জি আচ্ছা।
রাতে বড়খানার ব্যবস্থা করো। মাংস রান্নার জন্যে ফজলুরে খবর দিয়া আনো।
জি আচ্ছা। পশ্চিমের পুকুরে জাল ফেলব?
হুঁ, ফেলো। জাল টানার সময় আমার মেয়েরে নিয়া যাবে। সে দেখে মজা পেতে পারে।
