সেন্ট্রি-পুলিশ পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। রানা বলল, ভাই সাহেব, কাইন্ডলি একটু শুনবেন? ওসি সাহেবের সঙ্গে একটু প্রাইভেট কথা বলতে চাই—একটু কি বলবেন ওসি সাহেবেকে?
ওসি সাহেব চেয়ারে নাই।
চেয়ারে যখন আসবেন তখন কি বলবেন?
আচ্ছা দেখি।
দেখাদেখি নয়। ভাই, এই কাজটা করতেই হবে। ছোট ভাই হিসেবে এটা আপনার কাছে আমার একটা রিকোয়েস্ট, আবদার। আর শুনুন ভাই, একটু কাছে আসুন।
সেন্ট্রি-পুলিশ কাছে এলো।
রানা দলা পাকিয়ে একটা একশ টাকার নোট এগিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, রেখে দিন, পান খাবেন।
পান খাবার ব্যাপারে পুলিশের কোনো আপত্তি দেখা গেল না। রানা চোখ বন্ধ করে ভাবছে। পরিষ্কার কিছু ভাবতে পারছে না। মাথা জ্যাম হয়ে আছে। শুধু জ্যাম না-যন্ত্রণাও করছে। শুভ্ৰ বকবক করেই যাচ্ছে–
বস্তুর গতি যখন আলোর গতির সমান হয়ে যায়, তখন আইনস্টাইনের রিলেটিভিস্টিক সূত্র অনুযায়ী বস্তুর ভর হয় অসীম। সূত্রটা হচ্ছে—এম ইকুয়েলস টু এম নট, স্কয়ার রুট অব …
রানা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। এরা সুখেই আছে। কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই। সে ঘড়ি দেখল—এগারোটা বাজে। প্ৰায় সাড়ে তিন ঘণ্টা কেটে গেল হাজতে …।
দেখতে দেখতে দুপুর হবে, তারপর সন্ধ্যা হবে, রাত হবে, সকাল হবে, আবার দুপুর হবে, আবার সন্ধ্যা…
রানার গা কাঁটা দিয়ে উঠল। বাথরুমের বেগ প্ৰবল হয়েছে। আর চেপে রাখা যাচ্ছে না। এখন একবার যেতেই হবে। সে সেন্ট্রিকে হাসিমুখে ডাকল, এই যে পুলিশ সাহেব, পুলিশ সাহেব।
কি হইছে?
একটু ভাই বাথরুমে যাওয়া দরকার।
টাট্টি করবেন?
জ্বি না। ছোটটা করব।
একটু আগেই তো করছেন। মিনিটে মিনিটে পিসাব করলে তো হবে না।
রানা হতভম্ব হয়ে দেখল। সেন্ট্রি পুলিশ চলে যাচ্ছে। অথচ তাকে একটু আগে পান খাওয়ার জন্যে একশ টাকা দেয়া হয়েছে। রানা শুকনো মুখে সিগারেট ধরাল। বল্টু উঠে বসেছে। মনে হচ্ছে, সে চোখ ব্ৰঞ্জ করে মটকা মেরে পড়ে ছিল। বল্টু রানার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, রানা শোন, বেগ খুব বেশি হলে এখানেই ছেড়ে দে। খামাখা রিকোয়েস্ট করে লাভ কী? যে দেশের যে নিয়ম। ওদের টাইম টেবিল অনুযায়ী তো আর আমাদের পিসাব ধরবে না। কী আর করা।
রানা শুনেও না শুনার ভান করল। শুভ্ৰ সমানে বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছে— আমাদের প্রচলিত ধারণা হলো, সময় প্রবহমান। নদী যেমন প্রবাহিত হচ্ছে–সময়ও প্রবাহিত হচ্ছে। সময়ের প্রবাহ শুরু হয়েছিল সৃষ্টির আদিতে at the time of Big Bang, সেই প্রবাহ চলছে। নদীর প্রবাহ শেষ হয় সমুদ্রে-সময়ের প্রবাহের শেষ কোথায়? এখন ব্যাপারটা বোঝার জন্যে একটা কাজ করা যাকএকটা থািট এক্সপেরিমেন্ট করা যাক …
রানার ইচ্ছা হচ্ছে, থাবড়া মেরে শুভ্রের বক্তৃতা বন্ধ করে দিতে। এই প্যাচাল বেশিক্ষণ শোনা সম্ভব না। সময়ের শুরু কোথায় হয়েছে তা দিয়ে কিছু যায়-আসে না। তাদের সময়টা কীভাবে যাচ্ছে এটাই বড় কথা।
ব্লাডারের চাপ যে হারে বাড়ছে তাতে মনে হচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যে দুটা ছোট ছোট এক্সপ্লোশান হবে এবং দুটা ব্লাডারই ফেটে যাবে। মানুষের ব্লাডার কাটা থাকে? দুটা, না একটা? এই তথ্যটা শুভ্রের কাছ থেকে জেনে নেয়া দরকার। যে সময় নিয়ে এত প্যাচাল পাড়তে পারে সে নিশ্চয়ই মানুষের ব্লাডারের সংখ্যা জানে।
রানা করুণ গলায় ডাকল—পুলিশ সাহেব! ভাই, একটু কাইন্ডলি শুনে যান তো!
সেন্ট্রি অন্য দিকে তাকিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছে। সে এখন মনে হয় কোনেও শুনতে পারছে না। পান খাওয়ার জন্যে একশ টাকা না দিয়ে দুশ টাকা দেয়ার দরকার ছিল। অ্যামাউন্ট কম হয়েছে।
এই যে ভাই, প্লিজ। ছোট একটা কথা শুনে যান।
সেন্ট্রি গভীর মনোযোগে দাঁত খোঁচাচ্ছে। দাঁত খোঁচানো শেষ হলো নিশ্চয়ই কান খোঁচাবে। খোঁচাখুঁচি যাদের স্বভাব তারা স্থির থাকতে পারে না। তাদের সবসময় কিছু-না কিছু খোঁচাতে হয়।
রানা আবার করুণ গলায় ডাকল–পুলিশ সাহেব। ব্রাদার। একটু শুনবেন?
মনিরুজ্জামান ওসি সাহেবের সামনে
মনিরুজ্জামান ওসি সাহেবের সামনে বসে আছে। মনিরুজ্জামানের গায়ে থ্রি পিস সুট, লাল টাই! কোটের বাটন হোলে পাতাসহ গোলাপের কুঁড়ি। গোলাপটা ঠিক আছে-পাতা দুটি মরে গেছে। মনিরুজ্জামানের মুখে তেলতেলে ভাব হাসি। সে আজ সারা দিনে প্রচুর পান খেয়েছে বলে মনে হয়। দাঁত খয়েরি বর্ণ ধারণ করেছে। ঠোঁট দুটিও লাল। মনিরুজ্জামানের হাতে সাদা রুমাল। কিছুক্ষণ পরপর ঠোঁট মোছার জন্যে রুমাল ব্যবহার করতে হচ্ছে।
মনিরুজ্জামানের পাশে আছে হারুনুর রশীদ। হারুনুর রশীদের কাজ হচ্ছে মনিরুজ্জামানকে ছায়ার মতো অনুসরণ করা। হারুনুর রশীদ পাতলা একটা পাঞ্জাবি পরে আছে। নিচে গেঞ্জি নেই বলে পাঞ্জাবির ভেতর দিয়ে তার লোমভৰ্তি বুক দেখা যাচ্ছে। হারুনুর রশীদের মুখ খুব গম্ভীর। সেই তুলনায় মনিরুজ্জামানের মুখ হাসি-হাসি।
মনিরুজ্জামান বলল, তারপর ওসি সাহেব, ভাই, কেমন আছেন বলেন দেখি।
জি, ভাল আছি।
সকলে চলে আসতাম–ফার্স্ট ফ্লাইট পেলাম না। গাড়িতে রওনা হলে পৌঁছতে পৌঁছতে বিকাল হবে। সেকেন্ড ফ্লাইটে এসেছি।
ভালো করেছেন।
আমি এসেই আপনার বিষয়ে খোঁজখবর করেছি; খবর যা পেয়েছি তাতে মনটা ভালো হয়েছে। আমি হারুনুর রশীদকে বললাম, এরকম অফিসার যদি দশটা থাকে, তাহলে দেশ ঠিক হয়ে যায়। কী হারুন, বলি নাই?
