হারুন হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ে।
মনে হচ্ছে সে কথা কম বলে। কিংবা মাথা নাড়াই তার চাকরি।
দেশের আজ যে অবস্থা তা কিন্তু দেশের জনগণের জন্যে না। খারাপ অফিসারের জন্যে। জনগণ কখনো ভুল করে না।
আপনি আমার বিষয়ে কী খোঁজ পেয়েছেন?
সব খোঁজই পেয়েছি ভাই। প্ৰদীপ জ্বলে উঠলে দূর থেকে টের পাওয়া যায়-আলো দেখা যায়। বুঝলেন রহমান সাহেব, আমি খবর পেয়েছি, আপনি অত্যন্ত অনেস্ট অফিসার। ঘুষ খান না। অন্যায় করেন না। ঠিক শুনি নাই রহমান সাহেব?
জি, ঠিকই শুনেছেন।
আপনার নাম রহমান তো?
আব্দুর রহমান আমার নাম।
এত বড় একটা কাজ যে আপনি করলেন, অনেস্ট অফিসার বলেই করতে পারলেন। ঘুষ-খায় অফিসারের আত্মা থাকে ছোট—সাহস থাকে না। কী হারুন, আমি এই কথা বলি নাই?
হারুন আবার হ্যাঁ-সূচক ঘাড় নাড়ল।
মনিরুজ্জামান গলা নিচু করে বলল, এত বড় একটা কাজ সুন্দরভাবে করার জন্যে আমি ছোটভাই হিসেবে আপনাকে সামান্য উপহার দিতে চাই। না করবেন না। না করলে মনে ব্যথা পাব।
মনিরুজ্জামান হারুনুর রশীদের দিকে তাকিয়ে ইশারা করল। হারুনুর রশীদ ব্রিফকেস খুলে ব্ৰাউন পেপারের একটা মোটা মোড়ক ওসি সাহেবের ফাইলের কাছে রেখে ভারি গলায় বলল—ফিফটি আছে।
ওসি সাহেব বললেন, ফিফটি কি?
ফিফটি থাউজেন্ড স্যার।
মনিরুজ্জামান বলল, উপহার কী কিনব, কী আপনার পছন্দ, তা তো জানি না। এই জন্যেই ক্যাশ। পছন্দমতো একটা কিছু কিনে নেবেন ভাই সাহেব। ছোট ভাইয়ের ওপর মনে কিছু নিবেন না।
আচ্ছা।
বুঝলেন ভাই সাহেব, খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম। আপনি রাগই করেন কি-না। উপহার এক জিনিস আর ঘুষ ভিন্ন জিনিস।
তা তো বটেই।
এখন ভাই সাহেব, মেয়েটাকে বের করে দেন-ঢাকায় নিয়ে যাই।
মেয়েটাকে বলছেন কেন? বলুন স্ত্রীকে বের করে দিন।
ও হ্যাঁ হ্যাঁ। অল্পদিন হয়েছে বিয়ে, এখনো অভ্যস্ত হইনি। যাই হোক, আমি স্ত্রীকে নিয়ে যেতে এসেছি। আমার স্ত্রীর যে বড় চাচা উনিও আসছেন। বাই রোডে আসছেন।
ওসি সাহেব শান্ত গলায় বললেন, ব্যাপারটা আপনি যত সহজ ভাবছেন তত সহজ না। সামান্য জটিলতা আছে।
কী জটিলতা? মনিরুজ্জামান চোখ সরু করে বলল।
আপনার স্ত্রী জবানবন্দি দিয়েছেন, আপনার সঙ্গে বিয়ে হয় নি। যে রাতে বিয়ে হবার কথা সেই রাতে উনি পালিয়ে গেছেন।
ও বললে তো হবে না। ও তো এখন এরকম বলবেই। আরো যে জঘন্য কিছু বলে নাই সেটাই আমার সৌভাগ্য। বিয়ে যে হয়েছে তার কাগজপত্র আছে। দেখতে পারেন। হারুন, কাবিননামাটা দেখাও তো।
হারুন ব্রিফকেস খুলে কাবিননামা বের করল।
মনিরুজ্জামান বলল, খুব ভালো করে দেখেন। আমার স্ত্রীর দস্তখত আছে। দেখতে পাচ্ছেন?
জি।
চারজন সাক্ষী আছে। সাক্ষী কারা এইটাও একটু লক্ষ করুন। আপনারা পুলিশের লোক, কিছুই আপনাদের চোখ এড়াবে না। তবু মনে করিয়ে দেয়া। একজন আছেন মিনিস্টার, প্রতিমন্ত্রী না, আসল মন্ত্রী। একজন আর্মির ব্রিগেডিয়ার, একজন হচ্ছেন ইউনিভার্সিটির ফুল প্রফেসর। আরেকজন বিশিষ্ট শিল্পপতি এ আর খান। নাম শুনেছেন আশা করি।
বলেন কী! এঁরা সবাই কি আপনার আত্মীয়?
জি না। তবে পরিচিত।
সাধারণত দেখা যায়, বিয়েতে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনরা সাক্ষী হয়। আপনার বেলাতেই ব্যতিক্রম দেখলাম।
আমার সবই ব্যতিক্রম। দেখলেন না—বৌকে বিয়ের পরেই ভাগিয়ে নিয়ে চলে গেল। তবে হজম করতে পারে নাই-বদহজম হয়ে গেছে। হা-হা-হা।
আপনাকে খুব আনন্দিত মনে হচ্ছে।
অবশ্যই আনন্দিত। আম ছালা সব ধরা পড়ে গেছে। সাথের বদগুলোকে মাইন্ড পিটন দিয়েছেন তো?
জি না, দেই নাই। ভদ্রলোকের ছেলেপুলে, পিটন দিয়ে শেষে কোন বিপদে পড়ি!
কোনো বিপদে পড়বেন না। আমি তো আছি আপনার পিছনে। আমি মানুষটা ছোটখাটো কিন্তু আল্লাহর দয়ায় আমার যোগাযোগ ভালো।
সেটা বুঝতে পারছি।
অনেকেই বুঝতে পারে না। প্রয়োজন বোধ করলে হেভি পিটন দিয়ে দেন। এদের চুরির মামলায় ফেলে নাকানি-চুবানি খাওয়ানো যায় না? আমার স্ত্রীর গায়ে চার লাখ টাকার জড়োয়া গয়না ছিল—এই মামলা … ধান দেখেছে, বুলবুলি দেখে নাই। এইবার বুলবুলি দেখবে। ছোট্ট বুলবুলি।
হারুনুর রশীদ বলল, স্যার আপনি কাইন্ডলি বেগম সাহেবকে রিলিজ করে দেন। আমরা ঢাকার দিকে রওনা হয়ে যাই। বেলাবেলি পৌঁছতে হবে।
এত সহজে তো ভাই হবে না। মামলা করেছেন, আমরা আসামি কোর্টে চালান দেব। কোর্ট যা করার করবে।
সে কী?
আপনি মামলা করেছেন ঢাকায়—আমরা আসামি ঢাকা পাঠাব।
তাহলে এত যন্ত্রণার প্রয়োজন নাই। মামলা তুলে নিব। আপনি আমার স্ত্রীকে শুধু রিলিজ করে দিন।
সেটাও সম্ভব না। একটা বেড়াছেড়া লেগে যাবে বলে মনে হয়।
কী বেড়াছেড়া?
যাদের থানা-হাজতে আটকে রেখেছি তারা এত সহজে ছেড়ে দেবে তা মনে হয় না।
যারা আমার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছে ওদের ওপর আমার কোনো রাগ নাই। ছেলেমানুষ ভুল করেছে। মানুষমাত্রই ভুল করে। তাছাড়া সমস্যাটা মূলত তৈরি করেছে আমার স্ত্রী। কাজেই শাস্তি যা দেবার আমি আমার স্ত্রীকেই দেব। আপনি ওদের ছেড়ে দিন। আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে চলে যাই।
আপনি বিকেলে আসুন।
বিকেলে আসব কেন?
আমি আসতে বলছি। এইজন্যে আসবেন।
ওসি সাহেব, আপনি তো ঝামেলা করছেন। আমি ঝামেলা পছন্দ করি না।
ঝামেলা আমিও পছন্দ করি না। মহিলাকে আমি ছেড়ে দিলাম, আপনিও গাড়িতে করে জোর করে নিয়ে গেলেন, পরে দেখা গেল আসলেই আপনাদের বিয়ে হয় নি।
