আমাকে পুরস্কৃত করবেন?
জি। আপনাকে এমন এক জায়গায় ট্রান্সফারের ব্যবস্থা করব যেখানে খুনের ছড়াছড়ি। প্রতি সপ্তাহে একটা করে মার্ডার হয়—তিনটি রেপ—গোটা দশেক ডাকাতি প্লাস চোরাচালানি। এমন সুবৰ্ণ সুযোগ হেলায় হারাবেন না। ওসি সাহেব। Chance of lite time.
মুনা খিলখিল করে হাসছে। এমন আনন্দিত ভঙ্গিতে সে অনেক দিন হাসে নি। তাকে হাসতে দেখে পাগলীটাও হাসছে। ওসি সাহেব কিছু বললেন না। যেরকম শান্ত ভঙ্গিতে এসেছিলেন সে রকম শান্ত ভঙ্গিতে চলে গেলেন।
তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এক বালতি পানি এবং ঝাটা নিয়ে জমাদার উপস্থিত হলো। দাঁত বের করে বলল, ওসি সাহেব বলছেন, শাড়ি তেল সাবান কী কী জানি। কিনবেন—টেকা দেন।
আনুশকা তার পার্স খুলে টাকা বের করল। জরীর দিকে তাকিয়ে বলল, জরী শোন, তুই কোনো ভয় পাচ্ছিস না তো? না, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে এই ওসি মানুষটা খারাপ না। তোর কোনো বিপদ ওই ওসি হতে দেবে না।
এরকম মনে হবার কারণ কি?
কোনো কারণ নেই–ইনট্যুশন।
এরকম যে কিছু ঘটবে
এরকম যে কিছু ঘটবে রানা জানত। বিপদের ইঙ্গিত মানুষের কাছে আগে আগে পৌঁছে। আল্লাহপাক মানুষকে ইশারা দেন। রানাকেও দিয়েছেন। রানা সেই ইশারা বুঝতে পারে নি। চিটাগাং রওনা হবার সময় সে দেখেছে টেবিলে খালি পানির জগ। এটা হলো প্রথম ইশারা। দ্বিতীয় ইশারা হলো, সে যে বেবিট্যাক্সি নিয়ে রওনা হলো মাঝপথে সেটার স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেল। কার্বোরেটার দিয়ে তেল পাস করছে না। এটা হলো দ্বিতীয় ইশারা। সে নিতান্ত বেকুব বলেই পরিষ্কার ইশারাও ধরতে পারে নি। এতক্ষণে তারা কক্সবাজার পৌঁছে যেত। তার বদলে থানা-হাজতে বসে আছে।
রানার আবার বাথরুম পেয়েছে। এক রাতের টেনশানে ডায়াবেটিস হয়ে গেল নাকি? টেনশানে নানান ধরনের অসুখ-বিসুখ হয়, ডায়াবেটিসও হতে পারে। ঢাকায় পৌঁছেই সুগার টেস্ট করাতে হবে। হাজতে ঢোকার পর এর মধ্যে দুবার বাথরুমে গেছে। তৃতীয় বার যেতে চাওয়া কি ঠিক হবে? শেষে এরা বিরক্ত হয়ে বলবে—পিসাব-পায়খানা যা করার এইখানেই করেন। থানাওয়ালাদের এখন বিরক্ত করা যাবে না। কিছুতেই না। এই সাধারণ সত্যটা দলের কেউ বুঝতে পারছে না। তাদের ভাব দেখে মনে হচ্ছে, তারা এখানেও পিকনিক করছে। এদের ধরে ধরে চাবকাতে হবে।
মোতালেব এর মধ্যে পুলিশ-সেন্ট্রিকে হাত ইশারা করে ডেকে বলেছে—মটু ভাইয়া, চায়ের ব্যবস্থা করা যায়? এই পুলিশের স্বাস্থ্য একটু ভালোর দিকে। ভালোর দিকে বলেই তাকে মটু ভাইয়া বলতে হবে? পুলিশের হাজতে বসে পুলিশকে মটু ভাইয়া বলা! রানা ভেবে পাচ্ছে না। এদের সবার একসঙ্গে ব্ৰেইন শটি সার্কিট হয়ে গেছে কি-না। এত বড় একটা বিপদ যাচ্ছে, সেই বিপদ নিয়ে চিন্তা নেই। কী করে উদ্ধার পাওয়া যায় তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই। মেয়েগুলিকে আলাদা করে ফেলেছে এটাও চিন্তার বিষয়। বিরাট চিন্তার বিষয়। কে চিন্তা করবে? সব চিন্তা কি সে একা করবো? শুভ্ৰ গাধাটা একটা বই নিয়ে কোণায় বসে আছে। এটা কি বই পড়ার সময়? বল্টু কম্বলে হাত-পা গুটিয়ে শুয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে ঘুমুচ্ছে। সঞ্জুকে দেখেও মনে হচ্ছে না। সে ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝতে পারছে। বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশ ছুঁলে বত্রিশ ঘা—এই সত্য যে কোনো বাচ্চাছেলেও জানে। এরা মনে হয় জানে না।
সঞ্জু বলল, রানা কটা বাজে?
রানা জবাব দিল না। ফালতু কথা বলার সে কোনো প্রয়োজন দেখছে না। কটা বাজে এটা জেনে হবে কী?
কথা বলছিস না কেন?
চুপ থাক গাধা।
সঞ্জু বলল, তুই আমার ওপর রাগ করছিস কেন? আমি কি তোদের এনে জেলে ঢুকিয়েছি?
বললাম তো চুপ করে থাক।
রানার কথাবার্তা বলতে ভালো লাগছে না। উদ্ধার পাওয়ার বুদ্ধি বের করতে হবে। মাথায় কোনো বুদ্ধি আসছে না। সবার আগে যা করতে হবে তা হলোথানাওয়ালার সঙ্গে একটা আন্ডারাষ্ট্যান্ডিংয়ে আসা। যদি হাজতে রাত কাটাতে হয়—তাহলে কম্বল-টম্বল লাগবে। খাওয়াদাওয়া লাগবে। এইসব কাজে পয়সা খরচ করতে হয়।
রানা বলল, বান্টু ঘুমাচ্ছে নাকি? আশ্চর্য! সঞ্জু, বল্টুটাকে কানে ধরে তোল তো।
কেন? ঘুমাচ্ছে ঘুমাক না। ট্রেনে সারারাত ঘুম হয় নি।
তোল বললাম।
তুই এমন টেনশানে আছিস কেন? কী হয়েছে?
কী হয়েছে বুঝতে পারছিস না?
না।
ভালো। তাহলে তুই আর শুধু শুধু জেগে আছিস কেন? তুইও ঘুমিয়ে পড়। আয়, আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমা।
শুধু শুধু টেনশান করে তো কোনো লাভ নেই।
শুভ্র বই থেকে মুখ তুলে বলল, ওরা একটা ভুল করেছে। ভুলটা যখন ধরা পড়বে তখন লজ্জিত হয়ে আমাদের ছেড়ে দেবে।
রানা বলল, গাধার মতো কথা বলবি না। শুভ্ৰ। গাধামি কথা বন্ধ করে যা করছিস তাই কর। বই পড়। জ্ঞান বাড়া। কী বই এটা?
ব্ৰিফ হিষ্টরি অব টাইম। সময় ব্যাপারটা আসলে কী তা বলার চেষ্টা করা হয়েছে।
মোতালেব কৌতূহলী হয়ে বলল, সময় ব্যাপারটা কী?
শুভ্ৰ বেশ আগ্রহের সঙ্গে সময় কী তা বলতে শুরু করল। সঞ্জু এবং মোতালেব দুজনই শুনছে। বেশ মন দিয়েই শুনছে।
রানা ভেবে পাচ্ছে না কেন সে একদল গাধাকে নিয়ে রওনা হলো? এই বুদ্ধি কে তাকে দিল? সে ঠিক করেছে, এই ঝামেলা থেকে একবার বের হতে পারলে কানে হাত ধরে দশ বার উঠ-বোস করবে। কোরান শরিফ হাতে নিয়ে পশ্চিম দিকে মুখ করে বলবে, আর কোনোদিন এই জাতীয় দায়িত্ব নেবে না।
