আনুশকা বিরক্ত গলায় বলল, সমস্যা হবে কেন? কে বলেছে সমস্যার কথা?
রানা বলছে। ওকে একটা টুথব্রাশ আনতে বলেছিলাম, ও ভয়ংকর গলায় বলল—সামনে নাকি গজব।
আনুশকা বলল, তুই ওর কথায় কান দিবি না। টুথব্রাশের কথা ভুলে যা। আঙুলের ডগায় পেস্ট দিয়ে দাঁত মেজে ফেল। মোতালেব কোথায়, মোতালেব? ওর না মাইক্রোবাস ঠিক করার কথা?
রানা কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। আনুশকার কথায় রাগে আবার তার গা জ্বলে গেল। মাইক্রোবাস ঠিক করার দায়িত্ব মোতালেবের না, তার। সে ঠিক করেও রেখেছে। এক ফাঁকে দেখে এসেছে, বাস স্টেশনে চলে এসেছে। পুলিশের নাকের উপর দিয়ে মাইক্রোবাসে চড়ে বসা বুদ্ধিমানের কাজ হবে কি-না তা বুঝতে পারছে না বলেই সে চুপচাপ আছে। নয়তো এতক্ষণে জিনিসপত্ৰ বাসে তুলে ফেলতো। রানার বাথরুমে যাওয়াটা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। এদেরকে পুলিশের হাতে ফেলে যেতেও ইচ্ছা করছে না। কী থেকে কী হয়ে যাবে কে জানে? বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশ ছুয়ে দিলে আঠারো দুগুণে ছত্রিশ ঘা। প্লাস দুঘা এক্সট্রা। সব মিলিয়ে আটত্রিশ ঘা।
প্ল্যাটফর্মের এক জায়গায় গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের দলটি থেকে একজন এদিকেই আসছে। রানার পানির তৃষ্ণা পেয়ে গেছে। বুক খা-খা করছে।
পুলিশ অফিসার আনুশকার কাছে এসে দাঁড়ালেন। আনুশকা তার চামড়ার ব্যাগের ফিতা লাগাচ্ছিল। সে পুলিশ অফিসারের দিকে না তাকিয়েই বলল, কিছু বলবেন?
আপনারা যাচ্ছেন্ন কোথায়?
রাঙ্গামাটি।
ওখানে কি হল্ট করবেন?
জায়গা পছন্দ হলে করব। পছন্দ না হলে করব না।
থাকবেন কোথায়?
হোটেল নিশ্চয়ই আছে। আছে না?
পর্যটনের মোটেল আছে।
তাহলে পর্যটনের মোটেলেই থাকব।
রুম কি বুক করা আছে?
এত কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?
এত কথা জিজ্ঞেস করেছি, কারণ আপনাদের দলেরই একজন খানিকক্ষণ আগে বললেন—আপনারা সেন্ট মাটিন আইল্যান্ডে যাচ্ছেন। যিনি বলেছেন তার নাম মোতালেব।
জরী হাই তুলতে তুলতে বলল, ও কিছু জানে না। শুরুতে আমাদের সেন্ট মাটিন যাবার প্ল্যান ছিল, পরে বদলানো হয়েছে। মোতালেব শেষ খবর পায় নি। আমরা যখন ফাইন্যাল ডিসিশন নিই তখন সে নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছিল।
পুলিশ অফিসার আগের মতোই সহজ গলায় বললেন, আপনাদের নেবার জন্য স্টেশনে একটা মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে। বাসটা রাঙ্গামাটি যাবে না। বাস যাবে টেকনাফ।
এত খবর নিয়ে ফেলেছেন?
পুলিশে চাকরি করি। আমাদের কাজই হলো খবর নেয়া!
আর কী খবর নিলেন?
আরেকটা খবর হচ্ছে—নইমা বলে আপনার যে বান্ধবীকে পাওয়া যাচ্ছে না। বলছিলেন। তিনি চা খাচ্ছেন। স্টেশনের বাইরে টি-স্টল আছে। সেখানে চা খাচ্ছেন।
তাকে কি বলেছেন যে, আমরা তার খোঁজ করছি?
জি, বলা হয়েছে।
থ্যাংক য়্যু। থ্যাংক য়্যু ভেরি মাচ।
আমরা আরেকটা খবর নিয়েছি। ঢাকায় ওয়্যারলেস করে জেনেছি। আইজি নুরুদ্দিন সাহেবের আনুশকা নামে কোনো ভাগ্নী নেই।
আনুশকা মোটেই চমকাল না। সে এত স্বাভাবিকভাবে তার ব্যাগ ঠিক করছে। যে রানা মুগ্ধ হয়ে গেল। একেই বোধহয় বলে ইস্পাতের নার্ভ। এই নাৰ্ভ কতক্ষণ ঠিক থাকে তা দেখার ব্যাপার। বেশি টেনশানে ইস্পাতের নার্ভেরও ছিড়ে যাবার কথা। আনুশকার নার্ভ কখন ছিড়বে? রানা সেই দৃশ্য দেখার জন্যে অপেক্ষা করতে পারছে না। তার বাথরুমে না গেলেই নয়। সে বাথরুমের সন্ধানে রওনা হলো।
পুলিশ অফিসার বললেন, আপনারা কি আমাদের সঙ্গে থানায় যাবেন?
আনুশকা বলল, হ্যাঁ, যাব।
তাহলে চলুন।
এখন তো যেতে পারব না। হাত-মুখ ধোব, চা খাব, তারপর যাব। আপনারা এতক্ষণ অপেক্ষা করবেন?
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছি। আর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না।
শুভ্ৰ এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। সে অবাক হয়ে বলল, কথাবার্তা কী হচ্ছে আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
পুলিশ অফিসার বললেন, থানায় চলুন। থানায় যাওয়ামাত্রই সব জলের মতো পরিষ্কার বুঝে যাবেন। পুলিশের অনেক কথাই বাইরে অর্থহীন মনে হয়। থানা হাজতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি শব্দের অর্থ পরিষ্কার হয়ে যায়।
থানায় যেতে হবে কেন?
সেটাও থানায় গেলেই জানতে পারবেন।
এতক্ষণে গাড়ি থেকে সবাই নেমে এসেছে। পুলিশের কথাবার্তা যথেষ্ট উদ্বেগের সঙ্গে শুনে যাচ্ছে। জরীর চোখে-মুখে হতভম্ব ভাব। রানা তাহলে ভুল বলে নি। সমস্যা কিছু একটা হয়েছে। জরী বলল, ব্যাপার কী রে আনুশকা? উনি আমাদের থানায় যেতে বলছেন কেন?
আনুশকা সহজ গলায় বলল, ওনার ধারণা, আমরা মনিরুজ্জামান নামের এক ভদ্রলোকের স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়ে এসেছি। এই জন্যেই আমাদের থানায় যেতে বলছেন?
জরী আগের চেয়েও অবাক গলায় বলল, মনিরুজ্জামানের স্ত্রীটি কে?
মনে হচ্ছে তুই। যে বদমাশটার সঙ্গে তোর বিয়ে হবার কথা ছিল ওর নামই তো মনিরুজ্জামান, তাই না?
জরীর মুখে কোনো কথা ফুটল না। সে বড়ই অবাক হয়েছে। আনুশকা বলল, তোরা সবাই হাত-মুখ ধুয়ে তৈরি হয়ে নে। আমরা থানায় যাচ্ছি। চা ওখানেই খাব।
নীরা ভীত গলায় বলল, এসব কী হচ্ছে? শুধু শুধু থানায় যাব কেন?
পুলিশ অফিসার অমায়িক ভঙ্গিতে হাসলেন।
আনুশকা বলল, আমরা আমাদের মালপত্র কী করব? এখানে রেখে যাব, না সঙ্গে নিয়ে যাব?
সেটা আপনাদের ব্যাপার। আপনারা ঠিক করবেন। দেরি করবেন না, চলুন।
আনুশকা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, রানা কোথায় গেল? ও হচ্ছে আমাদের টিম লিডার। মালপত্রের ব্যাপারে ওর ডিসিশন লাগবে।
