রানা টয়লেট খুঁজে বেড়াচ্ছে। বিপদের সময় কিছুই পাওয়া যায় না। এ পর্যন্ত দুজনকে জিজ্ঞেস করল, টয়লেট কোথায়? দুজনই এমনভাবে তাকাল যেন এই শব্দটা জীবনে প্ৰথম শুনছে। শব্দের মানে কী জানে না। স্টেশনের কাউকে ধরা দরকার। এরাও সব উধাও। নইমাকে দেখা যাচ্ছে। বেশ হাসি-খুশি মুখে আসছে। হাতে পত্রিকা। নইম বলল, এই রানা, যাচ্ছ কোথায়?
টিয়লেট খুঁজছি। টয়লেটটা কোথায় জানো?
আমি কী করে জানব?
না জানলে বলো জানি না। রেগে যাচ্ছ কেন?
মেয়েদের টয়লেট সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করাই অভদ্রতা। এই জন্যে রেগে যাচ্ছি। তোমার কি ইমারজেন্সি?
হ্যাঁ, ইমারজেন্সি।
তবড় টয়লেট, না ছোট টয়লেট?
কী যন্ত্রণা! ছোট।
তাহলে কোনো একটা ট্রেনের কামরায় ঢুকে পড়লেই হয়। ছুটে বেড়াচ্ছ কেন?
বিপদের সময় সব এলোমেলো হয়ে যায়, এটা খুবই সত্যি। সাধারণ ব্যাপারটা তার মাথায় আসে নি কেন? রানা লাফ দিয়ে সামনের একটা ট্রেনের কামরায় উঠে গেল।
নইম অপেক্ষা করছে। রানা নামলে তাকে একটা মজার জিনিস দেখাবে। রানা রাজি থাকলে তাকে নিয়ে আরেক কাপ চা খাবে। ওরা নিশ্চয়ই তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিছুক্ষণ টেনশানে ভুগুক। হু কেয়ারস?
রানা নামতেই নইমা বলল, চাটগাঁর লোকরা ঘুমুচ্ছি-কে কী বলে জানো? তারা বলে, ঘুম পাড়ি। ঘুম কি ডিম নাকি যে ডিম পাড়ার মতো ঘুম পাড়বে? হি-হি-হি।
রানা ধমকের সুরে বলল, হাসি বন্ধ করো।
হাসি বন্ধ করব মানে?
কেলেংকেরিয়াস ব্যাপার হয়ে গেছে। পুলিশ আমাদের অ্যারেক্ট করেছে।
তুমি এত ফালতু কথা বলো কেন?
মোটেও ফালতু কথা বলছি না। অবস্থা সিরিয়াস। উই আর আন্ডার অ্যারেস্ট।
আমরা কী করেছি? ডাকাতি করেছি?
তোমরা ডাকাতির চেয়েও বড় জিনিস করেছ। অন্যের বউ ভাগিয়ে নিয়ে চলে এসেছে।
রানা, তোমার ব্ৰেইনের নাট-বল্টু সব খুলে পড়ে গেছে। তুমি ঢাকায় গিয়েই ধোলাইখালে চলে যাবে। নাট-বল্টু লাগায়ে নেবে। তোমার যা সাইজ, রেডিমেড পাওয়া যাবে না। লেদ মেশিনে বানাতে হবে।
রানা আগুন-চোখে তাকাল। সে ভেবে পাচ্ছে না পুরুষ এবং মেয়ের মস্তিষ্কের ঘিলুর পরিমাণ সমান হওয়া সত্ত্বেও মেয়েরা পৃথিবীর কিছুই বোঝে না কেন?
যে বাস ওদের টেকনাফ নিয়ে যাবে বলে এসেছে সেই বাসে করেই ওরা থানায় যাচ্ছে। পুলিশের দুজন লোক বাসে আছে। একজন বসেছে ড্রাইভারের পাশে, অন্যজন আনুশকাঁদের সঙ্গে। নইম সেই পুলিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে করুণ গলায় বলল, আচ্ছা, চিটাগাং-এর লোেকরা ঘুমাচ্ছি না বলে ঘুম পাড়ি বলে কেন? ঘুম কি ডিম যে পাড়তে হয়? সবাই হো-হো করে হাসছে। পুলিশ অফিসারটি হাসছে না।
সে তাকিয়ে আছে শুভ্রর দিকে। শুভ্ৰ বলল, আপনি কি আমাকে কিছু বলবেন?
হ্যাঁ, বলব। আপনার নাম শুভ্র?
জি।
আপনার বিরুদ্ধে আলাদা স্পেসিফিক অভিযোগ আছে। গুণ্ডামির অভিযোগ। আপনি রশীদউদ্দিন ভূইয়া নামে বুফেকারের কেয়ারটেকারকে মারধর করেছেন। চাকু দিয়ে ভয় দেখিয়েছেন এবং এক পর্যায়ে তাকে চলন্ত ট্রেন থেকে ঠেলে নিচে ফেলে দেবার চেষ্টা করেছেন।
শুভ্ৰ শুধু একবার বলল—আমি?
বলেই সে চুপ করে গেল। অন্য সবাই চুপ। শুধু নইমা এখনো হেসে যাচ্ছে। চিটাগাং-এর লোকেরা ঘুমিয়ে পড়াকে কেন ঘুম পাড়ি বলে—এটা কিছুতেই তার মাথায় ঢুকছে না।
অয়ন বাসের রড ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মুনার পাশে খালি জায়গা আছে। সে যেখানে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে মুনার পাশের জায়গাটাই সবচে কাছে। কাজেই অয়ন যদি সেখানে গিয়ে বসে কেউ অন্য কিছু মনে করবে না। সে ঠিক ভরসাও পাচ্ছে না। মুনা যদি ফট করে কিছু বলে বসে।
রানা বলল, তুই হাঁদার মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বোস না।
অয়ন মুনার পাশে বসতে গেল। মুনা বলল—আপনার গা থেকে বিশ্রী গন্ধ আসছে। অন্য কোথাও গিয়ে বসুন।
অয়ন আগের জায়গায় ফিরে গেল।
থানার লকআপে
ওসি সাহেব তাদের থানার লকআপে ঢুকিয়ে দিলেন। ছেলেরা এবং মেয়েরা আলাদা হয়ে গেল। এই ওসি সাহেবকে স্টেশনে দেখা যায় নি। তিনি স্টেশনে যাননি। ভদ্রলোকের বয়স বেশি না। ভদ্র চেহারা। পুলিশের ভদ্র চেহারা হলে অস্বস্তি লাগে। মনে হয় কিছু একটা ঝামেলা আছে। তা ছাড়া ভদ্রলোক পাঞ্জাবি, পরে আছেন। পুলিশের লোক থানার ভেতরে পাঞ্জাবি পরবেন কেন?
জেনানা ওয়ার্ডে এক অল্পবয়স্ক পাগলীকে রাখা হয়েছে। সে বমি করে পুরোটা ভাসিয়ে ফেলেছে। সে শুধু বমি করেই ক্ষান্ত হয়নি—মনের আনন্দে নিজের বমিতে গড়াগড়ি করছে। ভয়ংকর গন্ধ। কোনো স্বাভাবিক মানুষ এর মধ্যে থাকতে পারে না। প্রথমে নইমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। ফিসফিস করে বলল, এখানে এক ঘণ্টা থাকলে আমি মরে যাব। আমি সত্যি মরে যাব। কেন আমি তোদের সঙ্গে এলাম! কেন এলাম? কেন এলাম? নইমার হিষ্টিরিয়ার মতো হয়ে গেল।
আনুশকা বলল, ন্যাকামি করবি না। এখন ন্যাকামির সময় না।
আমি ন্যাকামি করছি? আমি করছি ন্যাকামিঃ আমি ন্যাকামি করছি?
চুপ কর। এক কথা বারবার বলবি না।
নইমা ওয়াক ওয়াক করতে লাগল। সে যেভাবে ওয়াক ওয়াক করেছে–মনে হয় কিছুক্ষণের মধ্যে তার পাকস্থলির পুরোটা বের হয়ে আসবে।
আনুশকা কঠিন গলায় বলল, তুই যদি ওয়াক ওয়াক বন্ধ না করিস তাহলে আই স্যোয়ার বাই দ্য নেম অব গড—এই বমির খানিকটা তোকে খাইয়ে দেব। নইমা ওয়াক ওয়াক বন্ধ করল। তবে সে বসে পড়ল। মনে হচ্ছে সে সত্যি সত্যি অজ্ঞান হয়ে যাবে। সে ক্ষীণ স্বরে বলল, আনুশকা আমি মরে যাচ্ছি। আমি সত্যি মরে যাচ্ছি। নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। তালাবদ্ধ ঘরে আমি থাকতে পারি না। আমার ক্লস্টোফোবিয়া আছে।
