দিনের আলো নিবে এল সূয্যি ডোবে ডোবে।
আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে
মেঘের উপর মেঘ করেছে, রঙের উপর রঙ।
মন্দিরেতে কাঁসর ঘণ্টা বাজল ঠঙ ঠঙ।
পরের অংশ রূপার কাছে অস্পষ্ট। রূপা দেখল এক সন্ধ্যাবেলা তার মা ব্যাগ। স্যুটকেস নিয়ে চলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যদিও তিনি বলেছেন, চিটাগাং যাবেন আসলে তী-না, তিনি থাকবেন ঢাকাতেই। আকবরের মা বুয়া রূপাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল, তোমার বাপ-মার ছাড়াছাড়ি হইছে।
রূপা বলল, ছাড়াছাড়ি কি?
ছাড়াছাড়ি হইল তালাক। তারার তালাক হইছে।
তালাক কি?
তোমার মা অন্য এক লোকরে হাঙ্গা বইছে।
হাঙ্গা বইছে মানে কি?
অত কিছু বলতে পারব না। তোমার কপাল ভাঙছে।
পুরো বিষয়টা হারুন মেয়েকে ব্যাখ্যা করলেন। সুন্দর করেই ব্যাখ্যা করলেন। তিনি মেয়েকে বললেন, তোমাদের ক্লাসে এমন কেউ কি আছে যাকে তুমি সহ্য করতে পার না। দেখলেই রাগ লাগে।
রূপা বলল, আছে সুমি নাম।
সে কি করে?
পেনসিল দিয়ে আমাকে খোঁচা দেয়। একদিন আমার স্যান্ডেলে থুথু দিয়েছিল। আমার অংক বইয়ের পাতা ছিঁড়েছে।
সুমি অন্য সেকশানে চলে গেলে ভালো হয় না?
খুব ভালো হয় বাবা।
তোমার মার সঙ্গে আমার এই অবস্থা হয়েছে। তোমার মা চলে গেছেন অন্য সেকশানে।
মা তো তোমাকে পেনসিল দিয়ে খোঁচা দেয় না।
বড়রা পেনসিলে খোঁচা দেয় না। কথা দিয়ে খোঁচা দেয়। তোমার মা কথার খোঁচা দেন। আমিও দেই। খোঁচাখুঁচি করতে করতে দুইজনই ক্লান্ত। তোমার মা অনেক বেশি ক্লান্ত বলেই এখন অন্য এক ভাল মানুষকে বিয়ে করেছেন। বুঝেছ?
হুঁ।
তোমার মা চাচ্ছেন তুমি তাদের সঙ্গে গিয়ে থাক। আমিও তাই চাচ্ছি। তোমার বয়স খুব কম। এই বয়সের ছেলেমেয়েদের জন্যে মায়ের আদর দরকার। মা তুমি কি যাবে তোমার মার সঙ্গে?
রূপা বলল, না।
হারুন বললেন, তোমার জন্যে যা ভাল তাই তোমার করা উচিত। তোমার জন্যে ভাল হল তোমার মার সঙ্গে থাকা। আমি প্রতি সপ্তাহে তোমাকে দেখতে যাব। খেলনা চকলেট এইসব নিয়ে যাব।
আমি মার সঙ্গে থাকব না। তোমার সঙ্গে থাকব।
রূপা! তুমি তোমার মায়ের মতই জেদি হচ্ছ।
আমি তোমার সঙ্গে থাকব।
আচ্ছা যাও আমার সঙ্গে থাকবে। একটু বড় হও দেখবে কত ধানে কত চাল। আমি কথার খোঁচা দিতে শুরু করব। তুমি পালাবার পথ পাবে না।
শায়লা মেয়েকে নিজের কাছে রাখার অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কোনো লাভ হয় নি।
রূপী তার মাকে টেলিফোন করল। শায়লা বললেন, তোর খবর কি?
রূপা বলল, ভাল।
জরুরি একটা বিষয় নিয়ে তোর সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছিলাম।
বল।
কথাটা তোর বাবার বিষয়ে। সে আশেপাশে নাই তো?
না।
তোর বাবা ইদানীং খুব বিরক্ত করছে।
কি করছে?
মাছ পাঠাচ্ছে, তরিতরকারি পাঠাচ্ছে। টেলিফোনে খোঁজ-খবর করছে। ব্যাপারটা আমার কাছে ভাল লাগে না, টগরের বাবার কাছেও না। টগরের বাবা অতিমাত্রায় ভদ্র। সে কখনো কিছু বলবে না। কিন্তু সে যে বিরক্ত হচ্ছে তা বুঝা যাচ্ছে। এই মাসের ১২ তারিখ সে কি করেছে তা-কি জানিস?
জানি না।
আমাকে দামী একটা শাড়ি পাঠিয়েছে। ১২ তারিখ তোর বাবার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল এই উপলক্ষে শাড়ি। এখন ব্যাপারটা আমার জন্যে কতটা অস্বস্তিকর বুঝতে পারছিস? যে বিয়ের অস্তিত্বই নেই সেই বিয়ের দিন আবার কি?
ঠিক বলেছ মা।
টারের বাবা আমাকে বলল, তুমি তোমার প্রথম হাজব্যান্ডকে নিয়ে কোনো একটা রেস্টুরেন্টে ডিনার করে এসো। ঘণ্টা দুই স্মৃতি রোমণ কর।ভদলোককে কিছু সময় দাও। ভদ্রলোক তোমার হাত ধরতে চাইলে হাত ধরতে দাও। তিনি তোমাকে মিস করেন। কি রকম বিব্রতকর অবস্থা বুঝতে পারছিস?
পারছি।
তুই কি তোর বাবাকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলতে পারবি?
পারব তবে বলব না।
বলবি না কেন?
কারণ সমস্যাটা তোমার, আমার না। তোমার সমস্যা তুমি সমাধান করবে। বাবাকে টেলিফোন করে বলবে, স্টপ দিস ননসেন্স। মা টেলিফোন রাখলাম। রূপী ফোনের লাইন কেটে দিন। হারুন তখনি মেয়ের পাশে এসে দাড়ালেন, আগ্রহ নিয়ে বললেন, এতক্ষন তুই কি তোর মার সঙ্গে কথা বলছিলি?
রূপা বলল, হ্যাঁ।
কি বলল তোর মা?
হাবিজাবি কথা।
হাবিজাবি কি কথা?
আমি ভাল আছি, তুমি কেমন আছে এই জাতীয় কথাবার্তাকে বলে হাবিজাবি muit
আর কিছু বলেনি?
না।
আমার বিষয়ে তোর মা কিছু বলেছে?
না।
আজ একটা বিশেষ দিন তো। আমি ভাবলাম এই বিষয়ে তোকে কিছু বলল কি না।
বিশেষ দিনটা কি?
তোর মার সঙ্গে আজ আমার প্রথম দেখা হয়।
তোমাদের তো আর প্রেমের বিয়ে না। প্রথম দেখাটা এত ইস্পর্টেন্ট কেন হবে?
হারুন লজ্জিত গলায় বললেন, তোর মাকে দেখে বাসায় ফিরে বিরাট এক কবিতা লিখেছিলাম। বয়স কম ছিল তো। খানিকটা বোকাও ছিলাম। পুরো কবিতাটা আমার মুখস্ত আছে। শুনবি?
রূপা বলল, না শুনব না। তুমি ছাদে চলে যাও। নিজের মনে কবিতা আবৃত্তি করতে থাক। ছাদে অনেক গাছপালা আছে, তারা তোমার কবিতা শুনে মজা পাবে। বাবা প্লিজ।
চারা লাইন শোন। চার লাইন কবিতায় তোর তেমন কোনো ক্ষতি হবার কথা না।
রূপা হতাশ গলায় বলল, শুনাও।
হারুন সঙ্গে সঙ্গে আবৃত্তি শুরু করলেন। তাকে আনন্দে অভিভূত হতে দেখা গেল। রূপা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল।
আষাঢ়ের কলি ছিল
সময় সন্ধ্যা
চারদিক সুনসান
জীবন বন্ধ্যা॥
গিয়েছিলাম মালিবাগ
বাড়ি নম্বর সাত
কিছু সময় কাটালাম
হয়ে গেল রাত।
আমার এক বন্ধু
নাম সুমন
বলল সে আজ তুমি
থাকে কিছুক্ষণ
শায়লা নামে এক মেয়ে
ঐ বাড়িতে থাকে।
দেখবে তার শান্ত মুখ
কোন এক ফাঁকে…
