আল্লাহপাক যদি নির্ধারণ করে রাখেন আমাকে তো করতেই হবে।
আপনি খুব আল্লাহভক্ত মানুষ।
জ্বি আম্মা। তবে উনাকে ভক্তির চেয়ে ভয় বেশি করি।
দোজখের আগুনে আপনাকে পোড়াবেন সেই ভয়?
দোজখে শুধু যে আগুন থাকে তা না–খুব ঠাণ্ডা দোজখও আছে। বড়ই শীতল।
সেকী— জানতাম না তো!
দোজখের একটা জায়গা আছে নাম হল জামহারীর–বড়ই শীতল স্থান মানুষের কল্পনাতেও আসবে না এমন শীতল। তবে সবচে ভয়ংকর হল— জুব্বল হুযন।
জুব্বল হুযনটা কী?
জুবুল হুনের অর্থ হল আম্মা বিষাদের ঘাঁটি। এই জায়গাটা জাহান্নাম দোজখের অতি ভয়ংকর স্থান। আমাদের নবী-এ করিম বলেছেন সুম্বুল হুযন প্রধান দোজখ— অতি ভয়ংকর সেই স্থান।
মওলানা সাহেবের গা থেকে আতরের গন্ধ আসছে। আতরের গন্ধ সাধারণত তীব্র হয়ে থাকে। গন্ধ নাকে এলেই মৃত মানুষের কথা মনে আসে। মওলানা সাহেবের আতরের গন্ধ সেরকম না। মিষ্টি গন্ধ।
কাশবনের কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে গেল। দুটা লং শট নেয়া হবে দুদিক থেকে সময় লাগল পুরো দুঘণ্টা। ডিরেক্টর সাহেব একটা বাড়তি শটও নিলেন— ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে ক্যামেরাম্যান কাশবনে শুয়ে পড়লেন। কাশফুলের ভেতর দিয়ে আকাশ ধরা হল। বাতাসে কাশফুল ক্যামেরার লেন্স ঢেকে দিচ্ছে আবার সরে যাচ্ছে। ডিরেক্টর সাহেব বললেন, এই শটটা ব্যবহার করতে পারব না। তবু নিয়ে রাখলাম। আকাশে শাদা মেঘ থাকলে ভাল হত। শাদা কাশফুল থেকে শাদা মেঘ। White to White.
এতদূর হেঁটে এসে মার অবস্থা কাহিল। তিনি একটা গাছে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছেন। একটু পরপর পানি খাচ্ছেন। তার চোখের নীচ কালো হয়ে আছে। সাধারণত রাতে ঘুম না হলে চোখের নীচে কালি পড়ে। মার চোখের নীচে কালি পড়েছে রোদে হেঁটে। আমি তার পাশে গিয়ে বসতেই তিনি বিরক্ত মুখে বললেন, ঐ মওলানার সঙ্গে কী নিয়ে এত গুজগুজ করছিলি?
ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলাপ করছিলাম মা। দোজখের শ্রেণীবিভাগ শিখছিলাম। গরম দোজখ ঠান্ডা দোজখ এইসব। তোমার তো মনে হচ্ছে অবস্থা কাহিল। ফিরবে কীভাবে?
ফিরব কীভাবে মানে? যেভাবে এসেছি সেইভাবে ফিরব।
তোমার পা ফুলে গেছে মা। ফোলা পা নিয়ে হাঁটতে পারবে না। তোমাকে কোলে করে নিয়ে যেতে হবে। কে তোমাকে কোলে নেবে সেইটা হচ্ছে কথা। দেখি তোমার হাতটা। জ্বর এসেছে কি না দেখি।
দূরে থাক! খবর্দার আমার গায়ে হাত দিবি না!
আমার দৌড় দিয়ে কাশবনে ঢোকার দৃশ্যটা কেমন হয়েছে মা?
জানি না কেমন হয়েছে। তুই আমার সঙ্গে কথা বলিস না।
আমি মার পাশে বসে আছি। তাকিয়ে আছি কাশবনের দিকে। বাতাসে কাশফুল দুলছে। অদ্ভুত সুন্দর একটা দৃশ্য। ডিরেক্টর সাহেব দূর থেকে হাত ইশারায় ডাকছেন। বুকে ধক করে একটা ঝাঁকুনি লাগল। কাকে তিনি ডাকছেন? আমাকে নাতো? আমার হাত-পা শক্ত হয়ে গেল। মা বললেন, একী কাণ্ড! তুই বসে আছিস কেন? মঈন ভাই তোকে ডাকছেন।
ইচ্ছে করছে ঠিক যে ভাবে দৌড়ে কাশবনে ঢুকেছি সেভাবে ছুটে যাই। আশ্চর্য আমি হাঁটতেও পারছি না। আমি তার কাছে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, খুব টায়ার্ড?
এইসব ক্ষেত্রে বলতে হয় না, টায়ার্ড না। এই বলে মিষ্টি করে হাসতে হয়। আমি তা করলাম না। আমি বললাম–হ্যাঁ, টায়ার্ড।
তোমার অভিনয় খুব ভাল হচ্ছে।
দৌড় দিয়ে কাশবনে ঢুকে যাওয়া— এর মধ্যে অভিনয়ের কী আছে?
অনেক কিছুই আছে। একজন বড় অভিনেতা কী করেন? ইমপ্রোভাইজেশন করেন। খুব সচেতন ভাবে যে করেন তা না— সাবকনশাসলি করেন। তুমি কাশবনে ঢোকার মুখে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে গেলে তারপর পলকের জন্যে পেছনে ফিরে বনে ঢুকে গেলে। তোমাকে দাঁড়াতেও বলা হয় নি, পেছনে ফিরতেও বলা হয় নি। কাজটা তুমি করলে তোমার মত। আমার খুব পছন্দ হয়েছে।
আমি বিড়বিড় করে কিছু একটা বললাম। থ্যাংক য়্যু জাতীয় কিছু। তবে পরিষ্কার শোনা গেল না।
ডিরেক্টর সাহেব বললেন, তুমি আগেভাগে বল নি কী করবে। আমরাও জানতাম না কী করবে কাজেই আগের শট এন জি হয়ে গেল। নতুন করে ন্যামেরা ঠিকঠাক করতে হল। আগে ক্যামেরা ফিক্সড ছিল–এখন ক্যামেরা তোমাকে অনুসরণ করেছে। আসল যে কথা সেটা মন দিয়ে শোন আসল কথা হচ্ছে, তোমার অভিনয় আমার খুব পছন্দ হয়েছে।
সেলিম ভাইয়ের অভিনয় কেমন হচ্ছে?
ওকে যা বলা হচ্ছে সে তা করতে পারছে। যে-কোন ভাল পরিচালক সেলিমকে দিয়ে কাজ আদায় করে নিতে পারবেন, এর বেশি কিছু না। তুমি যে-কোনো পরিচালকের সঙ্গে অভিনয় করতে পারবে। সে পারবে না।
এক সময় হয়তো শিখে ফেলবেন। তখন পারবেন।
না, তাও পারবে না। অভিনয়কলা একটা পর্যায় পর্যন্ত শেখা যায়। মিডিওকার অভিনেতা হবার জন্যে যতটুকু অভিনয় জানতে হয় ততটুকু অভিনয় শেখানো যায়। তার বেশি শেখানো যায় না।
আমরা রওনা হব কখন?
এখনই রওনা হব। আমি চা করতে বলেছি— চা-টা হোক, চা খেয়েই রওনা দেব।
আমি প্রোডাকশনের কাউকে চা বানাতে দেখলাম না। ইউনিটের সঙ্গে সঙ্গে ছোট্ট আউটডোর কিচেন যায়। এখানে আসে নি। তবে ডিরেক্টর সাহেব যখন চা খাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তখন চা আসবে। আসতেই হবে। আমি মায়ের দিকে তাকালাম–তিনি দূর থেকে একদৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমাদের মধ্যে কী কথা হচ্ছে তা জানার জন্যে তিনি কৌতূহলে ছটফট করছেন। মায়ের পাশে মওলানা মেরাজ মাস্টার। তিনিও নিজ মনে কথা বলে যাচ্ছেন। হয়ত দোজখ কত প্রকার ও কী কী তা বোঝাচ্ছেন।
