মা পাশ ফিরলেন। মনে হচ্ছে ঘুমের মধ্যেও তিনি আমার কথা শুনতে পেলেন।
মাঝে মাঝে খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গে
মাঝে মাঝে খুব ভোরে আমার ঘুম ভাঙ্গে। কোন কারণ ছাড়াই হঠাৎ জেগে উঠে দেখি ঘরের ভেতরের অন্ধকারে নরম একটা ভাব। ঘন অন্ধকারকে কেউ যেন তরল করে দিয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে আবার ঘন করে ফেলবে। ধ্বক করে বুকে ধাক্কা লাগে–হচ্ছে কী? ভয়ংকর কিছু কি হচ্ছে? এটাই কি সেই ভয়ংকর মুহুর্ত?
ভয়ংকর মুহূর্তের একটা ইতিহাস আছে। আমি যখন খুব ছোট তখন দাদীজান আমাদের সঙ্গে থাকতেন। মাঝে মাঝে দাদীজানের সঙ্গে আমি রাতে ঘুমুতাম। তার কাছে গল্প শুনতে চাইতে হত না। তিনি নিজের মনেই একের পর এক গল্প বলে যেতেন। তাঁর সব গল্পই ভয়ংকর টাইপের! আজরাইল শিঙ্গা ফুকছে—পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সেই শিঙ্গার কী ভয়ানক আওয়াজ। সেই আওয়াজ কানে যাওয়া মাত্র সমস্ত গর্ভবতী মাদের পেটের সন্তান খালাস হয়ে যাবে। শিঙ্গাটা ফেঁকা হবে— আধো আলো আধো অন্ধকার সময়। তখন দিনও না, রাতও না।
খুব ভোরে যতবার ঘুম ভাঙ্গতো ততবারই মনে হত এই কি সেই শিঙ্গা ফেঁকার সময়? নিজেকে সামলাতে সময় লাগত। আমি এলোমেলো পায়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াতাম। বাড়ির সামনের রাস্তাটা ফাঁকা। একটা মানুষ নেই। মানুষজন যেমন ঘুমুচ্ছে, রাস্তাটাও যেন ঘুমুচ্ছে। কোন একজন জীবন্ত মানুষ রাস্তায় এসে না দাঁড়ানো পর্যন্ত রাস্তার ঘুম ভাঙ্গবে না।
আমি ঠিক করে ফেলি রাস্তার ঘুম না ভাঙ্গা পর্যন্ত আমি বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকব। যে মানুষটা রাস্তার ঘুম ভাঙ্গাবে তাকে দেখে ঘরে ঢুকব। তখন মনে এক ধরনের উত্তেজনা হতে থাকে। কাকে দেখব? কাকে দেখব? কে সেই ঘুম ভাঙ্গানিয়া?
বেশির ভাগ সময়ই নামাজী মানুষদের দেখি। ফজরের নামাজ পড়তে মজিদের দিকে যাচ্ছেন। একবার শুধু বাচ্চা একটা মেয়েকে দেখেছিলাম। তার পরনে লাল ফ্রক,খালি পা, হাতে একটা কঞ্চি। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে কঞ্চি দুলাতে দুলাতে যাচ্ছে। আমার মনটা খানিকক্ষণের জন্যে অন্যরকম হয়ে গেল–মেয়েটা এত ভোরে কোথায় যাচ্ছে? তার মনে এত আনন্দইবা কিসের? পৃথিবী কি সত্যই এত আনন্দময়? আমি বারান্দা থেকে ডাকলাম, এই মেয়ে, এই। সে মাথা ঘুরিয়ে আমাকে দেখে ফিক করে হাসল তারপর আগের মতই কঞ্চি দুলাতে দুলাতে এগুতে লাগল। এরপর থেকে ভোরে ঘুম ভাঙ্গলেই মেয়েটার মুখ আমার মনে আসে। কী সুন্দর মায়া মায়া মুখ। কেমন টুক টুক করে হাঁটছিল।
দুর্গাপুর ডাকবাংলোয় আজ আবার আধো অন্ধকার আধো আলোয় ঘুম ভাঙ্গল। আমি পুরানো অভ্যাসমত বারান্দায় চলে এলাম। পাখিদের চিৎকারে কান পাতা যাচ্ছে না। গ্রামের মানুষরা যে খুব ভোরে জেগে ওঠে তার প্রধান কারণ বোধ হয়—পাখিদের হৈ চৈ। পাখিরা বড় বিরক্ত করে।
বারান্দা থেকে উঠোনের দিকে তাকিয়ে চমকে গেলাম। পাপিয়া ম্যাডাম হাঁটছেন। তাঁর হাতে কফির মগ। মাঝে মাঝে কফিতে চুমুক দিচ্ছেন (কফি না হয়ে চা-ও হতে পারে। আমি ধরে নিচ্ছি কফি। তিনি চা খান না)। তিনি নিজের মনে হাঁটছেন। ছবির মত একটা দৃশ্য। তার পরনে শাদা শাড়ি। লাল একটা চাদর মাথার উপর দিয়ে রেখেছেন। তাঁকে জীবন্ত একটা ফুলের মত লাগছে। আমার কাছে মনে হল আমি অনেকদিন এমন সুন্দর দৃশ্য দেখি নি। পাপিয়া ম্যাডাম কোনোদিকে তাকাচ্ছেন না। তিনি আছেন আপন মনে। আমি যদি কখনো ছবি বানাই এমন একটা দৃশ্য অবশ্যই রাখব। ছবির নায়িকা খুব ভোরে বাগানে একা একা হাঁটছে। তার হাতে কফির মগ। মাঝে মাঝে সে মাথা উঁচু করে আকাশ দেখার চেষ্টা করছে। আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ছে। আমার খুব ইচ্ছা করছে উঠোনে নেমে যাই। পাপিয়া ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলি। উনি হয়ত খুব রাগ করবেন। কিছু সময় আছে যখন মানুষ একা থাকতে চায়, অতি প্রিয়জনের সঙ্গও তার অসহ্য বোধ হয়। উনার হয়ত এখন ঐরকম সময় যাচ্ছে। আমি লোভ সামলাতে পারলাম না। নীচে নামলাম। ঠিক করে ফেললাম, উঠোনে এমন ভাবে যাব যাতে মনে হবে উনি যে উঠোনে আছেন আমি জানতাম না। আমি যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে উনাকে দেখেছি উনি তা জানেন না। আমি হঠাৎ উঠোনে উনাকে দেখে চমকে উঠেছি এমন একটা অভিনয়। আমার জন্যে সহজ অভিনয়।
আমি আমার অভিনয়ের অংশটা সুন্দর ভাবে করলাম। উনাকে দেখে চমকে উঠে বললাম, ও আল্লা আপনি! কী আশ্চর্য!
উনি হাসি মুখে বললেন, রুমালী তুমি কেমন আছ?
জ্বি ভাল।
আমাকে দেখে চমকে ওঠার ভান করলে কেন? তুমিতো দোতলার বারান্দা থেকেই আমাকে দেখেছ।
চট করে কোন জবাব আমার মাথায় এল না। আমি অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে আছি। কাউকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারার মধ্যে তীব্র একটা আনন্দ আছে। বেশির ভাগ মানুষ এই আনন্দ অনেকক্ষণ ধরে পেতে চান। উনিও কি তা চাইবেন? না-কি আমার কাছ থেকে কোন জবাবের জন্যে অপেক্ষা করবেন না, অন্য প্রসঙ্গে চলে যাবেন?
পাপিয়া ম্যাডাম অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন–সহজ স্বাভাবিক গলায় বললেন, তুমি কি রোজই এত ভোরে ওঠ?
জ্বি না। আজ হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেছে।
আমি খুব আর্লি রাইজার। যত রাতেই আমি ঘুমুতে যাই না কেন—পাঁচটা সাড়ে পাঁচটার দিকে আমার ঘুম ভাঙ্গবেই। তখন আমি নিজের জন্যে এক মগ কফি বানাই। কফি খেতে খেতে টুকটুক করে হাঁটি।
কিছু বলতে হয় বলেই আমি বললাম, খুব ভাল অভ্যাস।
