মা কম্বল ফেলে উঠে বসলেন। কিশোরীদের মত কৌতূহলী গলায় বললেন–সত্যি?
সত্যিতো বটেই। তিনি যে সে লোক না। তিনি হলেন— সেলিমকুমার।
অদ্ভুত শব্দে একটা পাখি ডাকছে। কেমন ভয় ধরানো গলার স্বর। আমি পাখির ডাক শুনছি। কী পাখি ডাকছে মাকে জিজ্ঞেস করে জানা যাবে না। মা এইসব জানেন না। সেলিম ভাইকে জিজ্ঞেস করলে জানা যেত।
মা!
কিরে ব্যথা আবার বেড়েছে?
উহুঁ। ঘুম আসছে না, একটা গল্প বলতো মা। ভুতের গল্প।
ভূতের গল্প আমি জানি নাকি?
ছোটবেলায় কিংবা বড় বেলায় ভূত টুত কিছু দেখ নি?
মা হালকা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ভূত একটাই দেখেছি–তোর বাবাকে। বেশতো বাবা-ভূতের গল্পই বল।
মা চুপ করে গেলেন। আমি বললাম, ভূতের সঙ্গে তোমার বিয়ের গল্পটা বলতো মা।
নিজের বাবাকে ভূত বলছিস লজ্জা লাগছে না?
তুমি বলছ বলেই আমি বলছি।
আমার কথা ভিন্ন।
ভিন্ন হবে কেন? তুমিও যা, আমিও তা–বল মা, তোমাদের গল্প শুনি। প্রেম করে বিয়ে হয়েছিল না বিয়ের পর প্রেম?
প্রেম ফ্রেম আমাদের জীবনে ছিল না।
শুরুতে নিশ্চয়ই ছিল— সেটা বল।
আচ্ছা শোন–একটা ভূতের গল্প শোন, মনে পড়েছে। আমার মায়ের কাছ থেকে শুনেছি–আমার মায়ের বাড়ি ছিল কলসহাটি। মা তখন খুব ছোট, তিন চার মাস বয়স। হয়েছে কী তাঁকে তেল মাখিয়ে রোদে শুইয়ে রাখা হয়েছে। আমার নানি গিয়েছেন পাকঘরে কী একটা আনতে। ফিরে এসে দেখেন মেয়ে নেই। নেই তো নেই। কোথাও নেই। চারদিকে কান্নাকাটি পড়ে গেল। কেউ বলল শিয়ালে নিয়ে গেছে, কেউ বলল বাঘডাসায় নিয়ে গেছে।
আসলে কি ভূতে নিয়ে গেছে?
হুঁ।
দিনে দুপুরে ভূত এসে তোমার মাকে নিয়ে গেল? এই গল্প শুনব না মা। থুকু তোমার সঙ্গে খেলব না।
তুই এমন অদ্ভুত ভাবে কথা বলিস কেন? থুক্কু তোমার সাথে খেলব না। তুই কি আমার সঙ্গে খেলছিস?
খেলছিতো বটেই। আমরা সবাই সবার সঙ্গে খেলি। কারো খেলা ভাল হয়। কারো খেলা ভাল হয় না। খেলার মধ্যে ঝগড়া হয়। খামচা খামচি হয়। কেউ খেলা ফেলে রাগ করে উঠে চলে যায়।
পাগলের মত কথা বলবি নাতো বকু। তোর পাগলের মত কথা শুনতে অসহ্য লাগছে।
আচ্ছা কথা বলব না। তুমি কি আমার কাছ থেকে একটা ভূতের গল্প শুনতে চাও?
তোর কাছ থেকে ভূতের গল্প শুনব? তুই ভূতের গল্প জানিস না-কি?
হ্যাঁ জানি। শোন–অনেককাল আগে আমাদের দেশের ধনবান মানুষরা তাদের ধনরত্ন কী করতেন জান? ধনরত্নের একটা অংশ মাটির নীচে গর্ত করে রেখে দিতেন, যেন দুঃসময়ে ব্যবহার করা যায়। কিংবা তাদের মুত্যুর পর তাদের সন্তান সন্ততিরা ব্যবহার করতে পারে। তখনতো আর ব্যাংক ছিল না। মাটির নীচের গুপ্ত ঘরই হল ব্যাংক।
কী হাবিজাবি শুরু করলি? ঘুমোতো।
আহা শোন না–ঐ সব ধনরত্ন টাকা পয়সা পাহারা দেয়ার জন্যে থাকতো 731
যখ কী?
যখ হচ্ছে যক্ষ। শোন নি — যক্ষের ধন? যখ বানানো হত কী ভাবে জান মা? যখ বানানোর প্রক্রিয়াটা মজার। নয় থেকে দশ বছর বয়সের একটা ছেলেকে যখ বানানো হতো। তাকে গোসল করিয়ে নতুন জামা-কাপড় পরিয়ে সাজানো হত। চোখে সুরমা দিয়ে চুল আচড়ে দেয়া হত। কোলে বসিয়ে দুধ ভাত খাওয়ানো হত। তারপর নিয়ে যাওয়া হত গুপ্ত ঘরে। সেখানকার ধনরত্ন তার সামনে রাখা হত। একজন পুরোহিত মন্ত্র পড়তে পড়তে ধনরত্ন তার হাতে জিম্মা করে দিতেন। পুরোহিত বলতেন–হে যখ, তোমার হাতে এইসব রত্ন-রাজি তুলে দিলাম। তোমার দায়িত্ব হল এর রক্ষণাবেক্ষণ করা। আইনানুগ উত্তরাধিকারী ছাড়া তুমি এই ধনরত্ন কখনো হস্তান্তর করবে না। যে ছেলেটা যখ হবে সে সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে একসময় কোলেই ঘুমিয়ে পড়ত। তখন তাকে সেখানে শুইয়ে সবাই চুপি চুপি উঠে আসত। গুপ্ত ঘরে জ্বলতো একটা ঘিয়ের প্রদীপ। তারা উপরে উঠে এসেই ঘরের মেঝের গুপ্ত কুঠুরি চিরদিনের মত বন্ধ করে দিত। এক সময় ছেলেটির ঘুম ভাঙ্গতো। আতংকে অস্থির হয়ে সে ছোটাছুটি করত। মাকে ডাকতো, বাবাকে ডাকত। তার কান্না তার আর্ত চিৎকার কেউ শুনতে পেত না। ছেলেটার মৃত্যু হত সেই ধনরত্নপূর্ণ গুপ্ত কুঠুরিতে।
আমি থামলাম। মা হতভম্ব হয়ে বললেন–এই ভয়ংকর গল্প তুই কোথায় শুনলি!
আমি বললাম, এটা কোন ভয়ংকর গল্প না মা। পুরানো ভারতের সাধারণ একটা গল্প। ভারতবর্ষের যেখানেই মাটির নীচে ধনরত্ন পাওয়া গেছে সেখানেই ছোট বালকের কংকাল পাওয়া গেছে।
কে বলেছে তোকে?
ঘুমাও মা। আমার ঘুম পাচ্ছে।
এইসব আজে বাজে গল্প কখনো বলবি না।
আচ্ছা আর বলব না।
এই গল্পটা তোকে কে বলেছে?
আমি জবাব দিলাম না। ঘুমের ভান করলাম। মা আরো কয়েকবার এই বকু, এই বকু বলে আমার গায়ে ধাক্কা দিলেন। আমি চমৎকার ঘুমের অভিনয় করলাম। মা চুপ করে গেলেন।
আমার ঘুম আসছে না। আমি জেগে আছি। গল্পটা আমাকে বলেছেন আমাদের ডিরেক্টর মঈন সাহেব।
যখ বানানোর প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর ছবি বানানোর শখ। ছবিটি কেমন হবে তাই তিনি পাপিয়া ম্যাডামকে বুঝাচ্ছিলেন। আমি দূর থেকে শুনছিলাম। পাপিয়া ম্যাডাম বললেন, এই ছবি বানিয়ে লাভ কী?
ডিরেক্টর সাহেব বললেন, মানুষ যে কত ভয়ংকার হতে পারে তা দেখানো।
পাপিয়া ম্যাডাম বললেন, এখনতো আর কেউ যখ বানাচ্ছে না। সেই ভয়ংকার মানুষরাতো নেই।
ডিরেক্টর সাহেব বললেন, যারা যখ বানাতো তারা কিন্তু ভয়ংকর ছিলেন না। সাধারণ মানুষই ছিলেন। তাদের সংসার ছিল, ছেলেমেয়ে ছিল। তাঁরা ধর্ম-কর্ম করতেন, দান ধ্যান করতেন। তার পরেও ভয়ংকর ব্যাপারটা কোন না কোন ভাবে তাদের চরিত্রে ছিল। ছিল না?
