ভেড়ার বাচ্চাটি ঘুমন্ত রিবিকার কাছে এসে দাঁড়ায়। তার হাঁটুর উপর মুখ বাড়িয়ে শোঁকে। ভেড়ার গরম নিঃশ্বাসে ঘুমন্ত রিবিকা চোখ মেলে। প্রথমে সে ভয় পায়, আর্তনাদ করতে গিয়ে ভেড়াটিকে দেখে থেমে যায়, পুলকিত হয়।
বলে—’আ মসীহ, তুমি এসেছো!’ মুখ দিয়ে কথা বার হতে না হতে সে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়ে। ভেড়াটির পিঠে যত্ন করে ভাঁজ করা খুব মসৃণ কাপড়–সৈনিকের শরীরের বস্ত্রখণ্ড। শরীরে পেচিয়ে মসীহদের মত করে পরা যায়। ডান হাত উন্মুক্ত থাকবে, বাঁ কাঁধের উপর ফেলে দিলে পিঠে কোমর ছাড়িয়ে জানু অবধি ঝুলবে। সৈনিকরা কেউ কেউ বিশ্রামের সময় এই পোশাক পরে।
প্রথমে আহ্লাদিত হয়ে উঠলেও, রিবিকা ক্রমশ ভীত হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে তার মুখ শুকিয়ে ওঠে। সে ভেড়াটির দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে সাহস পায় না। তার মনে হয় সে ফাঁদে পড়ে গিয়েছে। মেয়েরা আদিকাল থেকেই ভয় বা সংকোচ পাওয়ামাত্র চকিতে আপন বুকের দিকে তাকায়। যেদিন সে শরীরের উর্বভাগে কাপড় পরত না, সেদিনও সে চোখ আপন বুকের দিকে মেলেছে। মেয়েরা কখনওবা নরম পতঙ্গকেও ভয় পায়। হোক সে প্রজাপতি। যেন তার বুকে প্রাচীন আকাশের ইন্দ্রধুন ডানা মেলেছে। সূর্যদেবতা সামাশ আকাশে এই রঙ ছড়িয়ে দিতে পারেন। বৃষ্টির পর আকাশে তিনি ধনুকের সংকেত মেলে মানুষের জীবন-সংগ্রামের ছবি আঁকেন।
রিবিকা আপন স্তনযুগলের বর্ণপ্রলেপে ভয় পায়। আর্তস্বরে বলে ওঠে-মা গো!
মা আর দেবী ইস্তার এক্ষেত্রে একাকার। কোমল প্রজাপতি কিন্তু উড়ে পালাতে পারে না। মধুতে পাখা প্রলিপ্ত হয়েছে। দূর থেকে দেখলে সুশোভিত কাঁচুলির মত দৃশ্য হয়। এই প্রকৃতি শীতল, সালংকারা, বর্ণবিভাসিত। এই কি তবে মধুদুগ্ধের দেশসীমা! দৈবনির্দেশিত এই দৃশ্যে ভয় এবং আহাদ মিশে রিবিকাকে ক্রমে আশ্বস্ত করে! আবীরুদের হাতের আঙুলের চেয়ে কোমল এই ডানা আবীরুদের অঙ্গুরীয় বিভার মত রঞ্জিত। কী বিস্ময়! কী বিস্ময়!
রিবিকার কণ্ঠে আদরের ভেজা নরম স্বর নিরর্থক বেজে ওঠে। সে জানে না। এই দৃশ্যের কোন দর্শক আছে কিনা।
রিবিকার চোখে কৃতজ্ঞতার অরুণালোক খেলা করতে থাকে। তার গ্রীবায় প্রজাপতির রঙ লেগেছে; অস্তগামী সূর্যালোক যেমন নীল নদীতে ছায়া ফেলে মন্দিরগাত্রে ভেসে ওঠে, তেমনি এক ছবি। রিবিকা মনে করে জীবন অলীক নয়, রহস্যময় ঈশ্বরের দান–দেবী ইস্তার কাপড় না পেলেও মানুষ পায়। মসীহর সংকেতে ঘাসফড়িঙের বাঁচা, প্রজাপতির উড়ে আসা।
–এমন কেন হল? নিজের কাছেই এই প্রশ্নের বিস্ময় শেষ হয় না। সে বেশ! ছোঁব না। তুমি নিজে থেকেই ঘোড়ায় উঠে বসো। তুমি সুন্দরী না হলে, আমি সৈন্যশিবিরে ছেড়ে দিতাম। তাছাড়া সামান্য প্রজাপতি তোমার ইজ্জৎ রেখেছে, ক্ষুদ্র জীবেরা আমার শিক্ষক। আমি নরম প্রাণীদের ভালবাসি। আমার কথা তুমি বুঝবে না! আমি মসীহ (নবী) হলে এই কথাই তোমার আশ্চর্য লাগত। তোমার সরদারের নাম কী?
ঈষৎ বিস্ময়াপন্ন গলায় রিবিকা প্রায় অস্ফুটে বলল–ইহুদ। মহাত্মা ইহুদ।
সাদইদ ঘোড়র কাছে ফিরে এসে গদিতে হাত বুলাতে বুলাতে বলল–ও! সেটা একটা লাঠিধারী বটে! যাক গে! এখন যা বলছি শোন, আমার নষ্ট করার। মত সময় নেই। অসুররা যে-কোন সময় হামলা করতে পারে।
সহসা সাদইদের কাঁধে ধরা বর্শার বাঁটের দিকে চোখ পড়ে রিবিকার। বাঁটের কারুকৃতি অদ্ভুত। ডানামেলা প্রজাপতি কাঠে কোঁদা হয়েছে। শত দুঃখের মধ্যেও রিবিকার চোখে বিস্ময় ঝলসে ওঠে। লোকটি শৌখিন মাত্র নয়, কেমন যেন অন্যরকম। চোখ দুটি দয়াপূর্ণ এবং উদাসীন। গভীরও বটে। রিবিকা তথাপি রাগতস্বরে বলল–একজন সামান্য সৈনিকের কাছে দয়াই যথেষ্ট। মসীহর নামে ঠাট্টা করার স্পর্ধা তোমার মত নিষ্ঠুরের শোভা পায় বইকি। তুমি নিশ্চয়ই জানো লাঠি ঘোরালেই কেউ মোড়ল হয় না। তবে বর্শা ছুঁড়তে পারলেই ডাকাত হওয়া যায়।
তাই নাকি! সাদইদ তরুণীর মুখের দিকে সকৌতুকে চাইল। ক্ষণকাল চুপ। করে থেকে বলল–তুমি যে আমারনার দেবদাসীদের মত কথা বলছ দেখছি। তোমার পরিচয় জানতে পারি?
–তুমি দেবদাসীর ঘরে গেছ কখনও? পাল্টা প্রশ্ন করে রিবিকা।
–সে অভিজ্ঞতা কখনও হয়নি। দেবদাসীর চেয়ে সুন্দর মেয়ের আমার অভাব নেই।
–তবে আমায় ছেড়ে দাও। তোমার তো অনেক আছে।
–অনেক আছে বলেই তোমাকে আমার দরকার। যার আছে সেই তো রাখতে পারে!
–কিছুই থাকে না সেপাই। নানভী (নিনিভে) নগরীও ধ্বংস হবে! আর তোমার নরম ক্ষুদ্র প্রাণী শখের প্রজাপতিও বেঁচে নেই। আমার মত মেয়ের স্তনে মধু পড়লে তা বিষ হয়ে যায়, অত নরম প্রাণ কি বাঁচতে পারে! এই দ্যাখো … কিছুই থাকে না! যা দেখছ সব!
বলে অশ্বের কাছে এগিয়ে এসে রিবিকা গায়ের কাপড় দু হাতে সরিয়ে পিঠে মেলে দু হাত দু পাশে প্রসারিত করে দিলনাও দেখে নাও। আমি আমনের (সূর্যদেব) বউ, আমার তো কোন লজ্জা নেই! হায়েনাও আমাকে খেতে পারে না। সাত বছরের দুর্ভিক্ষেও আমি মরিনি। নাঙা মেয়ের চুলে নীল ফিতে বাঁধা–তাই দেখে কবিতা লিখবে এমন মানুষ নোহের সন্তানরা জন্ম দিতে পারে না। আর তোমার মত সৈনিক জীবনেও কাঁদতে জানে না। নাও, দ্যাখো, দ্যাখো!
সাদইদ যা গাছের আড়াল থেকে চুরি করে দেখছিল কিছুক্ষণ আগে, তা অতি নিকটে উদ্ভাসিত হতে দেখল। এমন রূপ সে কখনই দেখেনি। সে কোন প্রকার জাদু বিশ্বাস করে না। স্বপ্নদর্শীরা জলের উপর তেল ফেলে মানুষের ভাগ্য গণনা করে, পশুর মেটের আকৃতি, তেলের আকার দেখে ভাগ্য বলা তার কাছে হেঁয়ালি এবং অসত্য। কোন প্রকার নবীগিরি বা নবুয়তী সে পছন্দ করে না। কারুকে মাথার উপর লাঠি ঘোরাতে দেখলে পাগলা কুকুর লেলিয়ে দিয়ে আনন্দ পায়। সে যে-কোন প্রকারের গ্রাম্যতাকে ঘৃণা করে। দেবদাসীর প্রতি তার কণামাত্র আগ্রহ নেই। সে যুদ্ধের অর্জনকে সম্মানজনক ভাবে, নিনিভের ঐশ্বর্য আলো উদ্ভাসন তাকে লুব্ধ এবং ঈর্ষাতুর করে। তথাপি তার আজ মনে হল, এই। মেয়েটিকে সে পথে পেয়েছে, যুদ্ধ করতে হয়নি এ তার ভাগ্য।
