হঠাৎ তার চোখ চলে যায় সামনের দেবদারু গাছটির দিকে। আড়া থেকে একখানি পা বেরিয়ে এসেছে। সৈনিকের জুতা পরিহিত এই পা সে ‘মশরের মাটিতে দেখেছে। শরীরের তুলনায় এই পা সরু হয়, পাতা একটু বেশি লম্বা এবং ভারী, কিন্তু পাতার তুলনায় পায়ের উপর অংশ মিহি, অসুন্দর পা। এই পা মরুভূমিতে দ্রুত ছুটতে পারে। কিন্তু চোখ দুটি হয় ভেতরে ঈষৎ ঢোকানো, দয়ার্দ্র। সেই চোখ সুদূরাভিসারী। মুখ খুব সুন্দর এবং মায়াময়। ঠিক ঠাকুমার বিবরণ অনুযায়ী সারগনের পা। রাজচক্রবর্তী সারগন। বাদশা সারগন। মনে পড়ল, সারগন মরে, তবু সারগন মরে না।
লোকটি সামনে এসে দাঁড়াল। হাতে ওর ক্ষুদ্র বর্শা। পিছনে একটা দীর্ঘদেহী। তুষারধবল অশ্ব। মনে হচ্ছে সাদা আগুন দাউদাউ করছে। লাগাম ধরা রয়েছে বাঁ হাতের আঙুলে। পিঠের দু’পাশে ঝুলন্ত রেকাব, পিঠে গদি আঁটা। অশ্বের মুখ ঈষৎ ফেনশুভ্র। লোকটি শৌখিন।
এ অশ্ব হিত্তীয় অশ্ব। লোকটির পা দুখানি দেখে বোঝা যায় মানুষটি অসুর নয়। কিন্তু মুহূর্তে আসুরিক ঘটনা ঘটে যায়। ক্ষুদ্র বর্শাটা নিক্ষিপ্ত হয় নিরীহ ভেড়াটির গায়ে এবং মায়াভরা শিশুমেষ মাটিতে গেঁথে গিয়ে পিছনের দু পা শূন্যে উঠে যায়, ছটফট করে, এত চকিতে ঘটে যে,ভেড়ার বাচ্চাটি মরবার আগে কাঁদবার সময় পায় না। তার হৃদক্রিয়া রুদ্ধ হয় নিমেষে। সে তাকে লজ্জার হাত থেকে রক্ষা করে গেল, কিন্তু প্রাণ দিতে বাধ্য হল।
লোকটি বলল–আমি বিনিময়ে বিশ্বাসী। কাপড় দিয়েছি, ভেড়ার মাংস আমার। আশা করি দুঃখ পাওনি। অবশ্য এতটুকু মাংস কাকে দেব? আমার শিবিরে এখন আটাশজন সৈন্য কসরত করছে।
একটু থেমে লোকটি বলল–তোমার নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে।
বলেই লোকটি বর্শায় গাঁথা মেষটিকে কাঁধে তুলল। তারপর রিবিকার খুব কাছে এসে দাঁড়াল-তোমাকে তাই বলে হত্যা করব ভেবো না। যারা তোমাকে এবং তোমার ভেড়াটিকে ছেড়ে গেছে, হয়. মরেছে, নতুবা পালিয়েছে, তাদের সরদার হয় সৎ পুরুত,নয় কপট মসীহ (নবী)। কারণ সৎ পুরুত ভীতু হয়, কপট মসীহ হয় কাপুরুষ। মসীহর হাতে লাঠি থাকে বটে, কিন্তু পথের বাঘ বা হায়েনা থোড়াও ডরায় না। যুদ্ধই জীবন-যুদ্ধ আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। শিরোপা, পদাধিকার, সৌধ, একটি ছোট পাহাড়। সোনাদানা তো বটেই, খাদ্য পানীয় সুরা। এমনকী তোমার মত সুন্দরীদের। শৌর্য থাকলে পথের উপরই সব পড়ে থাকে। দেবতাদের ধন্যবাদ, এই জীবন যেন কখনও শেষ না হয়। ভাগ্যিস অসুররা মিশর আক্রমণ করেছিল! এসো!
বলে লোকটি ক্লিবিকার বুকের দিকে হাত বাড়াল। ঈষৎ ক্রুদ্ধ স্বরে বলল–তুমি আমার ভাষা বুঝতে পারছ না?
রিবিকা বলল–সব কথা পারিনি। তবে আমি অনেক ভাষা জানি। ভাষা বুঝে আমার লাভ নেই। আমাকে ছেড়ে দাও। আমার বাঁচার ইচ্ছে নেই। আমাকে ছোঁবে না। হাত সরাও।
সাদইদ বলল–খাওয়া-দাওয়ার পর তোমার ফের বাঁচতে ইচ্ছে করবে। একদণ্ড দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখেই তার বিশ্বাস স্থির হল যে ওরা দস্যুও হতে পারে, ফের দুর্ধর্ষ সৈনিকও বটে। এটা তাদের গোপন শিবির। অশ্ব এবং অস্ত্রচালনা, শিক্ষা করছে। এদের হাতে পড়লে তার আর নিস্তার নেই।
রিবিকা দিগভ্রান্তের মত ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল। তারপর এমন এক স্থানে এসে পড়ল যে,মনে হল এদিকে ওরা আর আসবে না। ওদের অশ্বধ্বনি আর শোনা যাচ্ছে না। ওদের দৃপ্ত গলার স্বরও অরণ্যের আড়ালে ঢাকা পড়েছে।
এবার রিবিকা আছাড় খেয়ে দেবদারুর তলায় পড়ে গেল দু চোখ শীতল ক্লাসের ছোঁয়ায় ক্লান্তিতে ক্ষুধায় বুজে এল। গাছে সুরেলা পাখি ডাকছিল। বাতাসে বিচিত্র বর্ণের প্রজাপতি উড়ছিল। কিছুই আর চেয়ে দেখতে পারছিল না রিবিকা। গাছের ডালে প্রকাণ্ড মধুচক্র ছিল–চক্রটি এত বড় যে, রিবিকা যদি দেখত হলে পুলকিত এবং ভীতও বোধকরি হতৃত্ব। তার নগ্ন বুকের উপত্যকায় মধুচক্র থেকে মধু টুপিয়ে পড়ল। স্তন ফোঁটায় ফোঁটায় ভিজে যেতে লাগল। সেই মধুর পতনে তার শরীর মৃদু মৃদু কেঁপে উঠছিল।
ঠিক এই সময় দুটি উজ্জ্বল রঙের, সেই রঙও অসাধারণ, প্রজাপতির জগতে এমন রঙদার ছবি খুব বিরল, সেরকম দুটি প্রজাপতি এল। এতবড় প্রজাপতিও সাধারণ নয়। মসীহ যদি এ প্রজাপতি পাঠিয়ে থাকেন, তবে এই নির্জন অরণ্যই সেকথা টের পেল। বুকের উপর, যেন দুটি রাঙা কুসুমের উপর বসছে এভাবে, সন্তর্পণে মধুলোভী প্রজাপতি, দুই সম তরঙ্গের প্রাণ চুপচাপ বসে পড়ল। প্রাচীন এ অরণ্য, বৃক্ষও নবীন নয়, বাতাস যে কবেকার সমুদ্রবিধৌত হয়ে আসছে কে জানে–এ নারী দেবী ইস্তারের মত দুঃখী আর বিষাদমথিত–এর মাথায় নীল ফিতে বাঁধা, যা নীল নদীর স্মৃতিবাসিত চিহ্নস্বরূপ, চোখ দুটি গভীর কালো পিরামিডের ছায়া ফেলেছে, যে সমস্ত রাত্রি মৃত্যুর সঙ্গে জলের হিংসা জাগিয়ে যুঝেছে, যে একদা উটের পিঠে কবরে মাথা রেখে পুরুষের দ্বারা যৌন-প্রহৃত হয়েছিল, যার আসক্তি নীল নদীর কিনারা ধরে ছুটে গিয়েছিল একদা নির্জন জ্যোৎস্নাস্নাত রাত্রিতে, যার বিবাহ হয়েছিল সূর্যদেব আমনের সঙ্গে, যার ঘর জ্বলে গিয়েছে ভস্মরূপে, মিশরীয়দের পুঞ্জীভূত ঘৃণা, পূর্বদেশের অবহেলা, কনানের ভাগ্যহত স্মৃতিই যার সম্বল, তাকে ফুলের মত সুন্দর দেখে দুটি কোমল বহুলরঙরঞ্জিত প্রজাপতি অধিকার করল–চন্দ্রকলাকৃতি ভূখণ্ডের ইতিহাসে এই তুচ্ছ দৃশ্যটি অবলোকন করেছিল যে, তার নাম সাদইদ। সে দেখেছিল নারীর নগ্নতাকে অলংকৃত করেছে দুটি ডানা-ছড়ানো রঙিন প্রজাপতি।
