চা খাবে শুভ্ৰ?
না।
তোমার মাথা ধরা কি সেরেছে?
এখন নেই।
একটু বস, আমি আমার নিজের জন্যে চায়ের কথা বলি। এই চা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।
বাবা, আমার বন্ধু বিয়ে করে খুব সমস্যার মধ্যে পড়েছে। আমাকে কিছু বলেনি তবু আমার অনুমান জাহেদ কেয়াকে নিয়ে কোথাও উঠতে পারছে না। জয়দেবপুরের বাড়িতে ওরা যদি থাকতে পারে তাহলে জীবনের শুরুটা ওদের অসম্ভব সুন্দর হবে।
আমার কিন্তু তা মনে হয় না, শুভ্ৰ। আমার মনে হয়, ওরা যদি ঐ বাড়িতে কদিন থাকে তাহলে ওরা হতাশাগ্ৰস্ত হবে। ওদের জীবনের শুরু হবে ভুল দিয়ে। হুট করে বিয়ে করে ঐ ছেলে যে সমস্যা তৈরি করেছে–তোমার জয়দেবপুরের বাগানবাড়ি সেই সমস্যার কোন সমাধান নয়। তোমার বন্ধুর সমস্যা তাকেই সমাধান করতে হবে।
শুভ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, যে কোন সুন্দর জিনিস কিন্তু আমরা অন্যের সঙ্গে শেয়ার করি। একটা ভাল গান শুনলে আমরা সেই গান অন্যদের শোনাতে চাই। একটা ভাল বই পড়লে অন্যদের সেই বই পড়তে বলি। আমাদের এত সুন্দর একটা বাড়ি, সেই বাড়ি অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করলে কি ক্ষতি বাবা?
সব জিনিস শেয়ার করা যায় না। আমি একটা Crude উদারহারণ দিয়ে ব্যাপারটা তোমাকে বোঝাই–মনে কর তুমি বিয়ে করলে। অসাধারণ একটি মেয়েকে বিয়ে করলে–যে মেয়ে তোমার কাছে মধুর সংগীতের মত। তুমি কিন্তু সেই মধুর সংগীত তোমার বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারবে না। বাড়ির বেলাও এই কথাটা সত্যি। বাড়ি হল খুবই ব্যক্তিগত সামগ্ৰীর একটি–নিজের পোশাকের মত। পোশাক যেমন তোমাকে ঢেকে রাখে, বাড়িও তোমাকে ঢেকে রাখে। তুমি কি আমার কথায় মন খারাপ করেছ?
হ্যাঁ, আমি সারা রাস্তা ভাবতে ভাবতে আসছিলাম ওদের দুজনকে কিছু বলব না। গাড়িতে করে জয়দেবপুরের বাড়িতে নামিয়ে রেখে বলব–আগামী এক সপ্তাহের জন্যে এই বাড়ি তোদের।
তুমি কি ওদের তুই করে বল?
জাহেদকে তুই করে বলি।
তোমার মুখে তুই শুনতে ভাল লাগে না, শুভ্ৰ।
বাবা, আমি উঠি?
আচ্ছা যাও। আমার নিজেরও কিছু কাজ আছে। তোমার মাকে বল, আমার ফিরতে রাত হবে। সে যেন কোথায় যেতে চাচ্ছিল–একাই যেতে বলবে।
আচ্ছা।
আর এই নিউজ উইকটা নিয়ে যাও। আর্টফিসিয়েল ইন্টেলিজেন্স-এর উপর অসাধারণ একটা আর্টিকেল আছে। তোমার পড়তে ভাল লাগবে।
শুভ্ৰ হাত বাড়িয়ে নিউজ উইক নিল। ইয়াজউদ্দিন সাহেব বেল বাজিয়ে মনিরুল ইসলামকে আসতে বললেন। মনিরুল ইসলাম ঢুকল। তার চোখে-মুখে ভীত ভাব স্পষ্ট।
বস মনিরুল।
মনিরুল বসল। ইয়াজুদ্দিন ঘড়ি দেখলেন। এখনা হাতে সময় আছে। তাঁকে চা দেয়া হয়েছে। চিনি ছাড়া চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, এই প্রতিষ্ঠানে তোমার চাকরি কতদিন হয়েছে?
স্যার, প্রায় ছবছর।
ছবছরে কি দেখলে?
মনিরুল ঢোঁক গিলল। সে স্পষ্টতই ভয় পেয়েছে। ইয়াজুদ্দিন সাহেব বললেন, শোন মনিরুল, আমি যখন যাত্রা শুরু করেছিলাম তখন আমার সঙ্গে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানীর একটি এম.এসসি. ডিগ্ৰী এবং তিনশ টাকা। আজ আমার সম্পদের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা। আমার লেগেছে ত্রিশ বছর। ত্ৰিশ বছরে এই অবস্থায় আসতে যে জিনিস লাগে তার নাম মস্তিত্বক। শাদা রঙের থিকথিকে একটা বস্তু। ঠিক শাদাও না, অফ হায়াইট। আমার মাথায় যে এই বস্তু প্রচুর পরিমাণে আছে তা কি তুমি জান, মনিরুল ইসলাম?
জানি স্যার।
আজ তোমাদের কি পরিকল্পনা, কখন কি করবে। আমি যে তার সবই জানি তা কি তুমি জান?
মনিরুল চোখ নামিয়ে নিল। ঢোঁক গিলল।
আন্দোলন করার অধিকার অবশ্যই তোমাদের আছে। ঘেরাও করার অধিকারও হয়ত আছে। কিন্তু আগুন লাগিয়ে দেবার ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না।
আমি কিছু জানি না, স্যার।
তুমি হয়ত জান না। কিন্তু আমি জানি। আমি খুব ভাল করে জানি। এ জাতীয় পরিস্থিতি কি করে সামাল দিতে হয় তাও জানি। আমাকে এইসব ঠেকে শিখতে হয়েছে। তুমি বাসাবোতে থাক না?
জ্বি স্যার।
৩১ বাই এক, দক্ষিণ বাসাবো, দোতলা।
জ্বি স্যার।
দেখলে তোমাদের খোঁজ-খবর কত ভাল রাখি।
আপনি আমাকে কেন এইসব বলছেন, আমি স্যার কিছুই জানি না।
আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি যাও।
স্যার, আমি সাতে-পাঁচে থাকি না। ওরা মিটিং করল–আমি বললাম …
মনিরুল ইসলাম, তুমি এখন যাও।
ইয়াজউদ্দিন ঘড়ি দেখলেন। তিনটা কুড়ি বাজে। অপেক্ষা করতে হবে। ঠিক চারটায় ঘেরাও হবার আগে আগে পুলিশের সাহায্য চাইতে হবে। কোন করাণে তিনি যদি টেলিফোন করতে না পারেন তাহলে অন্য কেউ যেন কাজটা করে দেয় সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
এরা কি এখানে বোমা-টোমা ফাটাবে? বোমা ব্যাপারটা সহজলভ্য হয়ে গেছে। নির্দোষ জর্দার কীটায় ভরে ঘুরে বেড়ানো যায়। চারদিকে আতংক ছড়িয়ে দেবার জন্যে জর্দার কোঁটাগুলির তুলনা হয় না। সময় কাটানোর জন্যে ইয়াজউদ্দিন সাহেব শুভ্রের ফাইল ড্রয়ার থেকে বের করলেন। কাজটা তিনি নজুবুল্লাহকে দিয়েছিলেন। সাতদিনের রিপোর্ট দেবার কথা ছিল।
প্রতিদিন একহাজার টাকা হিসেবে সাতদিনের জন্যে সাতহাজার। লোকটা আনাড়ি ধরনের কাজ করেছে। মাঝে মাঝে অতি চালাকি করতে গিয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে চলে গেছে। এটা করেছে ফাইল মোটা করার জন্যে। ইয়াজউদ্দিন চোখ বুলাতে লাগলেন।
সোমবার।
১৩ই নভেম্বর ১৯৯২।
শুভ্র সাহেব বাড়ি থেকে বের হলেন দশটা একুশ মিনিটে। গেটের কাছে এসে দারোয়ানের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেন। আবার বাড়ির ভেতর ঢুকে গেলেন। তিনি বাড়ির বাইরের বারান্দায় কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন। আবার বের হলেন এগারোটা বাজার দুমিনিট আগে। তার পরনে ছিল কালো প্যান্ট, শাদা শট। পায়ে স্যান্ডেল।
