চিত্ৰলেখা আবেদ আলির চাকরির টাৰ্মিনেশন লেটারে নিজের নাম সই করল। তারিখ বসাল। ইন্টারকমে বলে দিল–সাইকেল পিয়ন রশীদকে যেন পাঠানো হয়।
রশীদ এসে দাঁড়াল মাথা নিচু করে। বেঁটেখাটো মানুষ। মালিক শ্রেণীর কারো দিকে চোখ তুলে তাকানো বোধহয় তার অভ্যাস নেই। সে তাকিয়ে আছে মেঝের দিকে।
কেমন আছ রশীদ?
ভালো।
এই ঠিকানায় একটা চিঠি দিয়ে এসো।
জ্বি আচ্ছা।
তোমার সাইকেলটি ঠিক আছে?
বেল নষ্ট।
বেল ঠিক করার ব্যবস্থা কর।
কোযারটেকার স্যারকে বলেছিলাম।
উনি ব্যবস্থা করেন নি?
রশীদ চুপ করে রইল। সে কখনো তার ওপরওয়ালাদের বিষয়ে কোনো নালিশ করে না।
আচ্ছা আমি বলে দেব।
আমি চলে যাব? চিঠি দিয়ে এসে আপনাকে রিপোর্ট করব?
দরকার নেই। তুমি যাও। চিত্ৰলেখা কেয়ারটেকারকে ডেকে পাঠাল। কেয়ারটেকারের নাম সালাম। সে
ভীতমুখে সামনে এসে দাঁড়াল।
কেমন আছেন সালাম সাহেব?
জ্বি, আপা ভালো। কাজকর্মে মন বসছে না আপা।
মন বসছে না কেন?
স্যার নাই। কী কাজ করব কার জন্য করব?
আমার জন্যে করবেন।
তা তো অবশ্যই। . আমাদের যে সাইকেল পিয়ন রশীদ তার সাইকেলের বেল নষ্ট। বেল ঠিক হচ্ছে না কেন?
আমাকে তো আপা সে কিছু বলে নাই।
সে বলেছে। যেহেতু আপনার কাজকর্মে মন নাই আপনি শুনতে পান নি। বাবার মৃত্যুতে আপনি এতই ব্যথিত যে, কোনো কিছুই আপনি এখন মন দিয়ে শুনছেন না। আচ্ছা। আপনি যান–আমাদের জিএম সাহেবকে একটু আসতে বলে দিন।
জ্বি আচ্ছা। চিত্ৰলেখা ঘড়ি দেখল। তিনটা বাজে। অফিস আরো এক ঘণ্টা চলবে। সে অফিস থেকে ঠিক চারটায় বের হবে। আজ তার পরিকল্পনা হলো রাস্তায় খানিকক্ষণ হাঁটা।
আবেদ আলি বিরক্তমুখে ঢুকলেন।
আমাকে ডেকেছেন?
চিত্ৰলেখা বলল, আবেদ আলি সাহেব বসুন।
মিটিঙের মাঝখান থেকে উঠে এসেছি।
কীসের মিটিং?
এলসি খোলার দেরি এবং ইরেগুলারিটি বিষয়ে একটা তদন্তের ব্যবস্থা করছি।
ও আচ্ছা।
কী জন্যে ডেকেছিলেন?
একটা অপ্রিয় প্রসঙ্গের জন্যে ডেকেছি। দাঁড়িয়ে আছেন কেন বসুন, তারপর বলছি।
আবেদ আলি বসলেন। তার ভুরু কুঞ্চিত। চিত্ৰলেখা খুব সহজ এবং স্বাভাবিক গলায় বলল, কোম্পানির বৃহত্তর স্বার্থে আমাকে একটি অপ্রিয় কাজ করতে হচ্ছে। আপনার সার্ভিস আমাদের আর প্রয়োজন নেই। আমাদের কাছে মনে হচ্ছেকোম্পানির স্বাৰ্থ আপনি এখন আর আগের মতো দেখছেন না। সত্তর হাজার পাউন্ডের যে ক্ষতি আমাদের হয়েছে—তার দায়-দায়িত্বও সম্পূর্ণ আপনার।
কী বলছেন?
যা সত্যি তা বলছি।
আমাকে ছাড়া আপনি তো সাত দিনও চলতে পারবেন না। আপনি তো সামান্য মানুষ আপনার বাবারও আমি ডানহাত ছিলাম।
আমার বাবা যেহেতু নেই; আমার বাবার ডানহাতেরও প্রয়োজন নেই তাই না? নিন এটা হচ্ছে আপনার জব টামিনেশন লেটার। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার কী জানেন, এই চিঠি বাবাই লিখে টাইপ করে রেখে গেছেন। আমি শুধু নাম সই করেছি। কিছু কিছু মানুষ মৃত্যুর পরেও তাদের উপস্থিতির ব্যবস্থা রেখে যায়।
আবেদ আলি চিঠি পড়ছেন। তার হাত কাঁপছে। ব্যাপারটা তার কাছে খুবই অপ্ৰত্যাশিত।
আবেদ আলি সাহেব!
জ্বি।
আপনার দায়িত্ব আপনি এজিএম সাহেবকে বুঝিয়ে দেবেন।
ম্যাডাম ব্যাপারটা কি আরেকবার কনসিন্ডার করা যায় না?
জ্বি না, যায় না। পাশার দান ফেলা হয়ে গেছে। আপনি এখন আসুন।
আপনি বিরাট সমস্যায় পড়বেন। হাতেপায়ে ধরে আবার আমাকেই আপনার আনতে হবে।
আনতে হলে আনব। এই মুহুর্তে আপনাকে আমাদের দরকার নেই।
চিত্ৰলেখা আরেক কাপ চায়ের কথা বলল। অফিসে বসার পর থেকে তার খুব ঘনঘন চা খাওয়া হচ্ছে। অভ্যাসটা কমাতে হবে। মাথা ধরেছে। মাথাধরা কমানোর একটা ব্যবস্থা করা দরকার। ওষুধ খেতে ইচ্ছা করছে না। খোলা বাতাসে বসা দরকার। এসি দেয়া বদ্ধঘরে এক সময় দম আটকে আসে। চিত্ৰলেখা এসি বন্ধ করল। জানালার পরদা সরাল। জানালা খুলল। দিনের আলো নিভে আসছে। আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। মেঘ বলেছে যাব যাব? মেঘেরা কোথায় যেতে চায়? হিমালয়ের দিকে না। অন্য কোথাও? মানুষের পাখা থাকলে ভালো হতো। মেঘদের সঙ্গে উড়ে বেড়াত। মেঘদের সঙ্গে বাস করলেই জানা যাবে মেঘেরা কোথায় যেতে চায়।
আসব?
চিত্ৰলেখা জানালা থেকে মুখ না ফিরিয়েই বলল, আসুন। রশীদ তাহলে আপনাকে খুঁজে পেয়েছে। বসুন।
হাসান বসল। সে হিশামুদ্দিন সাহেবের এই বিশাল অফিসে এই প্রথম এসেছে। তার চোখে বিস্ময়।
চা খাবেন?
জ্বি না।
খেয়ে দেখতে পারেন। এরা চা খুব ভালো বানায়। দার্জিলিঙের চা পাতা এবং বাংলাদেশের চা পাতা সমান সমান নিয়ে একটা মিকচার তৈরি হয়। সেই মিকচার দিয়ে চা বানানো হয়।
তাহলে দিতে বলুন।
আপনাকে ডেকেছি। কী জন্যে জানেন?
জ্বি না।
আপনাকে ডেকেছি। কারণ আজ বিকেলে আপনাকে নিয়ে ঘুরব। গাড়িতে করে না।—হণ্টন।
বৃষ্টি আসছে তো!
আসুক। আমার একটা রেইনকোট আছে–আপনার জন্যে ছাতা আনিয়ে দিচ্ছি। বৃষ্টির সময় রেইনকোট পরে হাঁটা আমার খুব পুরনো অভ্যাস। নোট করছেন তো?
হাসান বিস্মিত হয়ে বলল, কী নোট করব?
কথাবার্তা যা বলছি। এইসব–এই যে একটু আগে বললাম, আমার পুরনো অভ্যাস হচ্ছে বৃষ্টিতে রেইনকোট পরে হাঁটা। আমি তো আগে একবার আপনাকে বলেছিবাবার মতো আমিও আপনাকে ঘণ্টা হিসেবে পে করব। কাজেই আপনি যত বেশি সময় আমার সঙ্গে কাটাবেন ততই আপনার লাভ।
