তিতলী বলল, চিঠি এনেছ।।
হাসান হ্যাঁ-সুচক মাথা নাড়ল। তিতলী লক্ষ করেছে কলেজের আশপাশে হাসান তার সঙ্গে কথা বলে না। কিছু জিজ্ঞেস করলে ইশরায় জবাব দেবার চেষ্টা করে। তিতলী বলল, কই চিঠি দাও।
দেব।
দেবটেব না, এখনই দাও।
হাসান অস্বস্তির সঙ্গে চারদিকে তাকাচ্ছে। তিতলীর খুব মজা লাগছে। এমন অস্বস্তি বোধ করার কী আছে? সে কি ভয়ঙ্কর কোনো পাপ করছে? এমন পাপ যে এক্ষুনি ফেরেশতারা এসে দোজখে ঢুকিয়ে গেটে তালা লাগিয়ে দেবে।
কই চিঠি দিচ্ছে না কেন?
বললাম তো দেব। দাঁড়াও একটা বেবিট্যাক্সি নিয়ে আসি। বেবিট্যাক্সি না। বেবিট্যাক্সিতে ভটভটি শব্দ হয়, কোনো কথা শোনা যায় না। চল একটা রিকশা নিই। ওই রিকশাওয়ালাটাকে ডাক। ওকে দেখে মনে হচ্ছে ভদ্র। বারবার পেছনে ফিরে আমাদের দেখার চেষ্টা করবে না। আমাদের কথা শোনার চেষ্টাও করবে না।
হাসান একটা বেবিট্যাক্সি নিয়ে এল। তিতলী ভাব করল খুব বিরক্ত হচ্ছে, তবে সে বিরক্ত হয় নি। খুশি হয়েছে। বেবিট্যাক্সিতে চিঠি পড়তে পড়তে যাওয়া যায়। রিকশায় চিঠি পড়া যায় না। সবাই তাকিয়ে থাকে।
হাসান বলল, বুড়িগঙ্গায় নৌকায় করে খানিকক্ষণ ঘুরবে?
তিতলী বলল, ঘুরব। আমি কিন্তু সাঁতার জানি না। নৌকা ডুবলে তুমি টেনে তুলবে।
হাসান বলল, আমিও সাঁতার জানি না।
তিতলী খুশি খুশি গলায় বলল, তাহলে চল। নৌকা ডুবলে দুজন একসঙ্গে তলিয়ে যাব। একজন পানির নিচে আরেকজন বেঁচে আছি–তাহলে খারাপ হতো।
হাসান বলল, বুড়িগঙ্গায় ওইপারে। আমার স্কুলজীবনের এক বন্ধু থাকে। ধূপনগর। সে মাছের খামার করেছে সেখানে যাবে?
তুমি যেখানে নিয়ে যাবে আমি সেখানে যাব। তুমি যদি আমাকে সস্তা কোনো হোটেলে নিয়ে যাও হোটেলের ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দাও তাতেও আমার আপত্তি নেই।
এসব কী ধরনের কথা?
বাজে ধরনের কথা। আচ্ছা যাও আর বলব না। চল ধূপনগরে যাই। মাছের খামার দেখে আসি।
ধূপনগরে গেলে ফিরতে কিন্তু দেরি হবে। পাঁচটার আগে ফিরতে পারবে না। দেরি হলে অসুবিধা হবে না। বাবা দেশের বাড়িতে গেছেন। রাত আটটার ট্রেনে ফিরবেন। বাসায় পৌঁছতে পৌঁছতে নটা। s
তোমার মা চিন্তা করবেন না?
মা তো সবসময়ই চিন্তা করছেন। একদিন না হয় একটু বেশি করলেন। কই চিঠি দাও।
হাসান চিঠি বের করল। বেবিট্যাক্সি চলছে। তিতলী হাসনের গা ঘেঁষে বসেছে। তার সমস্ত মনোযোগ চিঠিতে। চিঠির লেখক পাশে বসে আছে সেটা কোনো ব্যাপার না। হাসানের চিঠি তিতলী যেভাবে পড়ে আজ সেভাবে পড়তে পারল না। হাসানের সামনে তা সম্ভবও নয়। তিতলীর চিঠি পড়ার নিয়ম হচ্ছে–পড়ার আগে খানিকক্ষণ চিঠিটা সে গালে ছুঁইয়ে রাখবে। তারপর চিঠি পড়বে। চিঠি পড়তে পড়তে অবশ্যই তার চোখে পানি আসবে। চিঠি দিয়েই সে চোখের পানি মুছবে। চিঠি পড়তে গিয়ে চোখে যে জল এসেছে সেই জল চিঠিতেই জমা থাকুক।
তিতলী চিঠি শেষ করে নিচু গলায় বলল–তুমি লম্বা চিঠি লিখতে পার না? অনেকক্ষণ ধরে পড়া যায় এমন চিঠি? ক্লিপের মতো ছোট্ট কাগজ–কয়েকটা মাত্র লাইন–পড়ার আগেই চিঠি শেষ।
হাসান কিছু বলল না। তিতলী বলল, এ পর্যন্ত তুমি আমাকে কটা চিঠি লিখেছি বলতে পারবে?
না।
তবুও একটা অনুমান করা দেখি কাছাকাছি হয় কি না?
এক শ?
চুয়াত্তরটা। আজকেরটা নিয়ে চুয়াত্তর।
তুমি সব চিঠি জমা করে রাখ?
জমা করে রাখব না তো কী করব, পড়া শেষ হলেই কুঁচিকুঁচি করে ফেলে দেব?
ফেলে দেয়াই তো ভালো–কখন কার হাতে পড়ে!
হাতে পড়লে পড়বে। আমার এত ভয়ডর নেই।
তোমাকে দেখে কিন্তু খুব সাহসী মনে হয় না। ভীরু টাইপের। লাজুক লাজুক একটা মেয়ে মনে হয়।
আমি আসলেই ভীরু এবং লাজুক লাজুক টাইপের মেয়ে। তারপরেও প্রয়োজনের সময় আমি খুব সাহসী।
এটা ভালো।
আমিও জানি এটা ভালো। আমাদের ক্লাসের একটা মেয়ে আছে। শবনম। খুব সাহসী। টিচারদের সঙ্গে টক টক করে তর্ক করে। রাজনীতি করে। পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের একবার একটা খণ্ডযুদ্ধ হয়েছিল তখন শবনম সমানে পুলিশের দিকে ঢিল জুড়েছে। কিন্তু যখন সত্যিকার সাহস দেখানোর প্রয়োজন পড়ল তখন সে মিইয়ে গেল। কোনো সাহস দেখাতে পারল না।
প্ৰয়োজনটা কী?
সেটা তোমাকে বলব না। মেয়েদের অনেক ব্যাপার আছে—যা ছেলেদের জানা ঠিক না।
তাই নাকি?
হ্যাঁ তাই। যদিও আমরা সবসময় বলি–একটা ছেলেও মানুষ, একটা মেয়েও মানুষ। তারা আলাদা কিছু না–আসলে কিন্তু অনেকখানিই আলাদা।
হাসান হাসল। তিতলীকে নিয়ে বাইরে বের হলেই সে হড়বড় করে ক্রমাগত কথা বলতে থাকে। সেসব কথা হাসান যে খুব মন দিয়ে শোনে—তা না। তবে একটা মেয়ে মনের আনন্দে কথা বলে যাচ্ছে—ব্যাপারটাই মজার।
তিতলীর কথা বলার মধ্যে আবার হাত নাড়ােনাড়িও আছে। মনে হবে তার শ্রোতা একজন না। সে আসলে একদল ছাত্রছাত্রীকে বোঝাচ্ছে।
একটা ছেলে এবং একটা মেয়ের মধ্যে আসলে কোনো মিলই নেই। শরীরের অমিল খুব ক্ষুদ্র অমিল–আসল অমিল হলো মনে, মানসিকতায়। একটা ছেলের মানসিকতা এবং একটা মেয়ের মানসিকতা–আকাশ এবং পাতাল পার্থক্য। কোনো ছেলে যদি কোনো মেয়ের মনের ভেতরটা একবার দেখতে পারত। তাহলে সে বড় ধরনের চমক খেত।
এত কিছু বুঝলে কী করে?
বোঝা যায়। চোখ কান খোলা রাখলেই বোঝা যায়। বাবাকে দেখে বুঝি, মাকে দেখে বুঝি, তোমাকে দেখে বুঝি, নিজেকে দেখে বুঝি।
