জহির বলল, আপনার বাবা আমাকে কমিশন করেছেন আমি যেন আপনার দাদার একটা পোট্রেট করে দেই।
দাদা নো বলে দিয়েছেন। উনার নো মানে কেপিটেল এন কেপিটেল ও।
আমাকে কালাম সাহেব বলেছেন। আমি চলে যেতে চাচ্ছিলাম, উনি খেয়ে যেতে বললেন।
অবশ্যই খেয়ে যাবেন। কাতল মাছের একটা প্রিপারেশন আপনাকে দেয়া হবে। মাছটা আমি ধরেছি।
জহির খুবই অবাক হচ্ছে মেয়েটার সহজ কথা বলার ভঙ্গিতে। প্রথম দিনে তার কথায় ও চেহারায় কাঠিন্য ছিল। আজ একবারেই নেই।
মৃন্ময়ী বলল, আপনি কি ভালো পোট্রেট করেন?
জহির বলল, যখন মন দিয়ে করি তখন ভালো করি। বেশির ভাগ সময় মন লাগে না।
কখন মন লাগে না?
যার ছবি আঁকছি তাকে পছন্দ না হলে দুবিতে মন লাগে না।
একটা পোট্রেট করতে আপনি কত টাকা নেন?
ধরাবাধা কিছু নেই। চেষ্টা থাকে যত বেশি নেয়া যায়। ক্লায়েন্ট বুঝে দাম।
আমার কাছ থেকে আপনি কত নেবেন? আমি যদি আপনাকে কমিশন করি।
আমি আপনার কাছ থেকে কিছুই নেব না।
কেন নেবেন না?
আপনি আমার বড় একটা সমস্যা সমাধান করিয়েছিলেন এই জন্যে নেব। তাছাড়া আপনার ছবি আঁকার জন্যেও আপনার বাবা আমাকে কমিশন করেছেন।
মৃন্ময়ী বলল, আমিও আমার দাদাজানের মতো। কাউকে দিয়ে ছবি আঁকাই। তবে আমি আমার এক বান্ধবীর ছবি আঁকার জন্য আপনাকে কমিশন করব। আমার খুব প্রিয় বান্ধবী। আপনি যত্ন করে তার ছবি এঁকে দেবেন।
অবশ্যই দেব।
সে যতনা সুন্দর, আপনি তাকে আরও সুন্দর করে আঁকবেন।
চেষ্টার কোনো ত্রুটি থাকবে না।
শুধু তার নাকে একটা হীরের নাকফুল দিয়ে দেবেন। আমি নাকফুলটার ডিজাইন আপনাকে দিয়ে দেব।
জি আচ্ছা।
আমার দাদাজানের খামারবাড়ি কি আপনি ঘুরে দেখেছেন?
জি না।
ঘুরে দেখুন। খামারবাড়ির পুরো পরিকল্পনা আমার। আপনি শিল্পীমানুষ। আপনার মাথায় যদি কোনো আইডিয়া আসে আমাকে বলবেন।–জহির মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। আজ মেয়েটিকে প্রথম দিনের চেয়ে সুন্দর লাগছে। ব্যাপারটা হাস্যকর। সৌন্দৰ্য্য সময় নির্ভর না। ভোরবেলার ফুল বিকেলেও সুন্দর। মেয়েটি আজ শাড়ি পড়েছে এটা কি একটা কারণ? প্রথম যখন দেখা সেদিন তার পোষাক কী ছিল? শাড়ি ছিল না? জহির মনে করতে পারল না। যেদিন টাকা ফেরত দিতে গেল সেদিন মৃন্ময়ীর সঙ্গে দেখা হয় নি। ম্যানেজার ফরিদের হাতে টাকা দিয়ে এসেছে। ফরিদ কি টাকা ফেরত দিয়েছে? ব্যাপারটা মৃন্ময়ীকে জিজ্ঞেস করা কি উচিত? ত্রিশ হাজার টাকা এদের কাছে তুচ্ছ ব্যাপার। টাকাপয়সা এদের কাছে তেজপাতা। কিংবা তেজপাতার চেয়েও তুচ্ছ কিছু। কাঁঠালপাতা, আমপাতা। আমপাতার কথায় মনে পড়ল মীনা তাকে আমের মুকুল নিয়ে যেতে বলেছে। আমের মুকুল দিয়ে কি এক টক রান্না না-কি টিয়া পছন্দ করে।
জহিরের মেজাজ খারাপ হয়েছে। ঢাকা শহরে সে আমের মুকুল পাবে। কোথায়? সে তো আমবাগানে বাস করছে না। মীনাকে এই সব বলা অর্থহীন।
ভাইয়া শোন, মুকুল যে আনবে মিষ্টি আমের মুকুল আনবে না, টক আমের মুকুল আনবে।
জহির বলল, মিষ্টি টক বুঝব কীভাবে? মুকুল চিবিয়ে দেখব?
ভাইয়া বোকার মতো কথা বলো না তো। তুমি যে গাছের মুকুল আনবে সেই গাছের আম টক কি না জিজ্ঞেস করবে।
ও আচ্ছা।
টুনটুনিকে যে সোনার কিছু দিতে বলেছিলাম তার কী করবে? শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে আমি বেইজ্জত হব তাই চাও?
তোরা যেদিন চলে যাবি সেদিন পাবি।
তোমার বাজেট কত বল? আমি গয়নার দোকানে গিয়ে দেখব এই বাজেটে কি পাওয়া যায়।
বাজেট এখনও ঠিক করি নি। দেখি কি করা যায়।
ভাইয়া তোমার এখানে আসার পর থেকে আমরা ঘরের রান্না খাচ্ছি। ঢাকায় এত বড় বড় রেস্টুরেন্ট হয়েছে–আমাদের বাইরে খাওয়াও। একদিন সীজা হাটে নিয়ে যাও।
হবে ব্যবস্থা হবে।
জহির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মীনার সঙ্গে একদিন বসতে হবে। তার অনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে। যেদিন এই বৈঠক হবে সেদিন সে সরাসরি বলবে, মীনা তোর স্বামীর নামটা যেন কী? আমি নাম ভুলে গেছি। নাম বল। নাম দিয়ে শুরু হোক। এই ঘটনা দ্রুত ঘটিয়ে ফেলতে হবে। শুভস্য শীঘ্রম যেমন সত্যি অশুভস্য শীঘ্রম। অশুভ ঘটনাও দ্রুত ঘটিয়ে ফেলতে হয়। দেরি করা যায় না।
জহির ঘুরে ঘুরে খামারবাড়ি দেখছে। এক জায়গায় নকল পাহাড়ের মতো করা হয়েছে। নকল ঝরনা বসেছে। ঝির ঝির করে পানি পড়ছে। ঝরনার পেছন থেকে পানির পাম্পের শব্দ কানে আসছে। হাস্যকর ব্যাপার।
আরেক জায়গায় গোল করে লাগানো সুপাড়ি গাছের সারি পাওয়া গেল। মাঝখানে বসার ব্যবস্থা। মার্বেল পাথরে বানানো বেঞ্চ। কয়েক লক্ষ টাকা নিশ্চয়ই মার্বেল পাথরের পিছনে খরচ হয়েছে। এই জিনিসটা হয়েছে হাস্যকর। বসার জায়গায় মাথার উপরে ছায়া থাকতে হবে। সুপারি গাছে ছায়া দেয় না।
আরেকটু আগাতেই আম বাগান পাওয়া গেল। প্রচুর আমগাছ। প্রতিটি গাছের গোড়া ক্যান্টনমেন্টের গাছের মতো শাদা রঙ করানো। সবাই যেন শাদা প্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে। ফরোয়ার্ড মার্চ বলার সঙ্গে সঙ্গেই এরা সামনের দিকে মার্চ শুরু করবে। বেশ কিছু আমগাছে মুকুল ফুটেছে। আশেপাশে কেউ নেই। দূর থেকে কেউ নিশ্চয়ই দুরবিন দিয়ে তাকে দেখছে না। পকেট ভর্তি করে আমের মুকুল নিয়ে যাওয়া যায়। টিয়াবাবু আমের মুকুলের টক খাবে। খা টক রাতে আলিমুর রহমানের শরীর খারাপ হলো। শ্বাস কষ্ট। বুকে ব্যথা। তিনি মুখ বড় করে নিঃশ্বাস নিতে লাগলেন। মৃন্ময়ী চিন্তিত গলায় বলল, চল ঢাকা চলে যাই।
