দিল্লীর উপকণ্ঠে ভিসতি নিজামের উপর ডাকাত দল ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা অনেকক্ষণ ধরেই নিজামকে অনুসরণ করছিল। ডাকাতের ছদ্মবেশে এরা সবাই কামরান মীর্জার দেহরক্ষী বাহিনী। নিজামকে রক্ষাকারী দলের সবাই ঘটনা বুঝতে পেরে দ্রুত পালিয়ে গেল। ডাকাত দল ধনরত্ন এবং ঘোড়া নিয়ে চলে গেল। আধাবেলার দিল্লীশ্বরের মৃতদেহ নর্দমায় পড়ে রইল। তার উপর নীল রঙের স্বাস্থ্যবান মাছি ভনভন্ন করতে লাগল। দুটি গাধার একটি প্রভুর মৃতদেহের দিকে বিষণ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল। (*’গুলবদনের লেখা হুমায়ূননামায় বলা হয়েছে, নিজাম ভিসতি দুই দিনের জন্যে দিল্লীর সিংহাসনে ছিলেন। অন্য কোনো সূত্র তা সমর্থন করে না। নিজাম ভিসতি অর্ধদিবসের সম্রাট—এই তথ্যই প্রতিষ্ঠিত।)
জনৈক নগ্নপদ বৃদ্ধ
দিল্লীর পথেঘাটে জনৈক নগ্নপদ বৃদ্ধকে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে। তার চক্ষু কোটরাগত। অনাহারে-অর্ধহারে শরীর ভেঙে গেছে। সে কপর্দকহীন। তার বেশির ভাগ সময় কাটে হালুইকারির দোকানের আশপাশে। দোকানিদের কেউ কেউ একটা লাড়ড়ু, একটা লুচি ছুড়ে দেয়। বৃদ্ধ তা লুফে নেয়। খাবারের সন্ধানে সে শ্মশানঘাটেও বসে থাকে। সেখানে গুড় মাখানো চিড়া বিতরণ করা হয়। বৃদ্ধ উড়ুনি পেতে চিড়া গ্ৰহণ করে। বৃদ্ধ উচ্চবর্ণের ব্ৰাহ্মণ। কিন্তু সে পৈতা লুকিয়ে ফেলেছে। ব্ৰাহ্মণরা উচ্ছিষ্ট খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না। বৃদ্ধ নিরুপায়। উচ্ছিষ্ট খাদ্যগ্রহণে তার কোনো আপত্তি নাই। দিল্লী শহরের অন্য ভিক্ষুকদের সঙ্গে তার এখন কোনো তফাত নেই। খাদ্য নিয়ে ভিক্ষুকদের সঙ্গে সে কাড়াকড়িও করে।
ভিক্ষুকো ভিক্ষুকং দৃষ্টা
শ্বতুল্যং গুরগুরায়তে
(কুকুর। যেমন অন্য কুকুরকে দেখলে গর্জন করে, ভিক্ষুকও সেরকম অন্য ভিক্ষুককে দেখলে গর্জন করতে থাকে।)
এই বৃদ্ধ আমাদের পরিচিত। তাঁর নাম হরিশংকর। আচার্য হরিশংকর। তিনি শত মাইল হেঁটে দিল্লী এসেছেন সম্রাট হুমায়ূনের সাক্ষাৎপ্রত্যাশী হয়ে।
সম্রাট তাঁর অতীত জানেন না। কাজেই সম্রাটের কৃপা প্রার্থনা তিনি করতে পারেন। সম্রাট সন্দেহ করবেন না। সম্রাটের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টার তিনি ত্রুটি করেন নি। সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ভিক্ষুককে রাজদরবারে ঢোকানো যায় না। সম্রাটের দর্শনপ্রার্থীদের উপহার নিয়ে যেতে হয়। আচার্য হরিশংকরের কাছে তার নোংরা উড়ুনি ছাড়া কিছু নেই।
প্রতি শুক্রবার হাতির পিঠে চড়ে সম্রাট জুমার নামাজ পড়তে যান। এই সময় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হরিশংকর সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে নানান অঙ্গভঙ্গি করেন, উচ্চস্বরে কাদেন। তাতে লাভ হয় না। সম্রাট তাকান না।
এখন হরিশংকর লাফ দিয়ে হাতির সামনে পড়ার চিন্তাভাবনা করছেন। সাহস সঞ্চয় করতে পারছেন না।
এক জুমাবারে হরিশংকর রাস্তার পাশ থেকে দৌড়ে এসে সম্রাটের হাতির সামনে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হওয়ার দৃশ্য না দেখাই ভালো।
চারদিক থেকেই হৈচৈ হচ্ছে। ঘণ্টা বাজছে। ভীত হরিশংকর চোখ খুললেন।
আশ্চর্য! হাতির পিঠের হাওদায় বসা সম্রাট তার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি কি তাকে চিনতে পারছেন? উত্তেজনায় হরিশংকর কুর্নিশ করতে ভুলে গেল।
সম্রাট বললেন, আপনি কি আচার্য হরিশংকর?
হরিশংকর সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। সেখান থেকে উঠে হাতজোড় করে বললেন, সম্রাট আমাকে চিনতে পেরেছেন। আমার জীবন ধন্য। আমি শের শাহ’র হাতে বন্দি ছিলাম। কোনোক্রমে পালিয়ে এসেছি। আমি সম্রাটের দেখা পেয়েছি, আমার জীবন ধন্য।
আমার দেখা পাওয়ার জন্যেই কি আপনি এসেছেন?
হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে হরিশংকর আবার মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
সম্রাট বললেন, আপনার অতি মলিন বেশ, ভগ্ন শরীর দেখে আমি ব্যথিত। কাল রাজদরবারে আমার সঙ্গে দেখা করবেন।
সম্রাট হুমায়ূন হরিশংকরকে সভাসদের পদ দিলেন। তিনি সম্রাটের উপদেষ্টাদের একজন হলেন। সম্রাট হুমায়ূনের অনেক বড় বড় ভুলের মধ্যে এটিও একটি।
সাত দিনের মধ্যে আচার্যের চেহারায় জেল্লা ফিরে এল। নতুন পোশাকে তাকে দরবারে মোটেই বেমানান মনে হলো না। তিনি অবশ্যি নিজেকে সবকিছু থেকে আলাদা করে মৌনী ভাব ধরলেন। যদিও তিনি জানেন—
বিদ্যা স্তব্ধস্য নিষ্ফলা
(যে কথা কইতে ভয় পায়, তার বিদ্যা নিষ্ফল হয়।)
আচার্য হরিশংকর অপেক্ষায় আছেন। কথা বলার সময় অনেক পাওয়া যাবে। কিছু কথা সম্রাটকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বলতে চান। কী বলবেন তা ভেবে রেখেছেন। সম্রাটের সঙ্গে একান্তে কথা বলার সুযোগ হচ্ছে না।
যুদ্ধপ্রস্তুতি নিয়ে সম্রাট ব্যস্ত। মিত্র রাজাদের কাছে সাহায্য চেয়ে সম্রাটের চিঠি নিয়ে রাজদূতরা যাচ্ছেন। তিনি নিজের ভাইদের সঙ্গে ঘনঘন বৈঠক করছেন। মীর্জা কামরান পবিত্র কোরান শরীফে হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করেছেন, তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে সম্রাটের ডানহাত হয়ে কাজ করবেন।
মীর্জা কামরানকে নিয়ে সম্রাটের সামান্য আশঙ্কা ছিল। সেই আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত হয়েছে।
রাজজ্যোতিষীদের শুভক্ষণ বের করতে বলা হয়েছে। সম্রাট নিজে ইস্তেখারা নামাজ পড়েছেন। ইস্তেখারার নামাজের পর অজু করে ঘুমিয়ে পড়লে স্বপ্নে নির্দেশ আসে। স্বপ্নে যা দেখা যায়। তার সবটাই প্রতীকী। এই প্রতীকের অর্থ-উদ্ধার বেশিরভাগ সময় কঠিন হয়।
সম্রাট স্বপ্নে দেখেছেন। ধবধবে সাদা একটা বিক গাছে বসেছে। গাছের পাতা খাচ্ছে।
