কামরান মীর্জা সম্রাটের দিকে এগিয়ে গেলেন। নিচুগলায় বললেন, আমি কি ভারতবর্ষের সম্রাটের সঙ্গে কিছু কথা বলতে পারি?
হুমায়ূন বললেন, অবশ্যই পার। তবে ভারতবর্ষের সম্রাট এখন আমি না। সম্রাট হলেন ভিসতিওয়ালা নিজাম।
আমি আপনার সঙ্গেই কথা বলতে চাচ্ছি।
বলো।
আমার কথায় কোনো অসৌজন্য প্রকাশ পেলে আগেই মার্জনা চাই। সম্রাট আমার কথায় আহত হলেও কথাগুলি আমাকে বলতে হবে।
বলো। তবে বারবার আমাকে সম্রাট বলে সম্বোধন করবে না। তোমাকে বলা হয়েছে সম্রাট এখন ভিসতি নিজাম।
ভিসতি নিজাম এখনো সিংহাসনে বসে নি। দরবারে দাঁড়িয়ে আছে। সে যখন সিংহাসন বসবে তখন তার প্রতি যোগ্য আচরণই আমি করব।
কী বলতে চাও বলো?
আমার যা বলার তা আমি আলাদা করে শুধু আপনাকেই বলতে চাই। সবার সামনে বলতে চাই না।
হুমায়ূন বললেন, পবিত্র কোরান শরীফে একটি আয়াত আছে, সেখানে আল্লাহপাক বলছেন, তোমরা দুজন যখন কথা বলো তখন তৃতীয়জন হিসেবে আমি সেখানে উপস্থিত থাকি।
কামরান মীর্জা বললেন, অনেক কথা আছে যা আল্লাহপাক শুনলে ক্ষতি নেই, অন্য কেউ শুনলে ক্ষতি আছে।
হুমায়ূন কিছুক্ষণের জন্যে দরবার থেকে বিদায় নিয়ে চিকের পর্দার আড়ালে গেলেন। সেখানে রাজমহিষীদের অনেকেই ছিলেন। তাঁরা কৌতূহলী চোখে ভিসতি নিজামকে দেখছেন এবং তাকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছেন। সম্রাটকে আসতে দেখে সবাই সরে গেলেন, শুধু গুলবদন থেকে গেলেন। তিনি হুমায়ূনের দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বললেন, আপনাদের আলোচনায় আমি কি থাকতে পারি?
সম্রাট কিছু বলার আগেই কামরান মীর্জা বললেন, আমার বোন থাকতে পারে। আমি কী বলছি তার একজন সাক্ষী থাকারও প্রয়োজন। হুমায়ূন হাতের ইশারা করলেন। এই ইশারার অর্থ গুলবদন থাকতে পারে।
কামরান মীর্জা বললেন, এক সামান্য ভিসতিওয়ালাকে দিল্লীর সিংহাসনে বসানোর কিছু নেই। তাকে ধনরত্ব দেওয়া যেতে পারে, জায়গির দেওয়া যেতে পারে। সিংহাসনে কেন বসানো হবে?
হুমায়ূন বললেন, আমি কথা দিয়েছি। এইজন্যে বসানো হবে।
আপনি ভয়ঙ্কর দুঃসময়ে কথা দিয়েছিলেন। তখন আপনার মস্তিষ্ক কাজ করছিল না। আপনি ছিলেন প্রবল ঘোরের মধ্যে। আমরা দুঃসময়ে অনেক কথা বলি, সবই অর্থহীন কথা।
আমার কাছে অর্থহীন কথাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
কামরান মীর্জা বললেন, মোগল সাম্রাজ্য বিরাট বিপদের মুখে। এখন আপনার উচিত শের শাহ নামের দস্যুকে কীভাবে শায়েস্তা করবেন তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। একজন মিসকিনকে সিংহাসনে বসানোর ছেলেখেলার সময় এটা না।
আধাবেলার ব্যাপার।
এক পলকের ব্যাপারও হতে পারে না। দিল্লীর সিংহাসন দড়ির চারপাই না। যাকে তাকে সেখানে বসানো যায় না।
তোমার কথা কি শেষ হয়েছে?
হ্যাঁ।
আমার নির্দেশ-তুমি দরবারে যাবে এবং নতুন সম্রাটকে কুর্নিশ করে সম্মান প্ৰদৰ্শন করবে।
আপনার নির্দেশ পালন করা আমার কর্তব্য। কিন্তু আমি অপারগ। কারণ আমি অসুস্থ বোধ করছি। শারীরিক এবং মানসিক দুইভাবেই অসুস্থ।
তুমি দরবারে যাবে না?
না। এবং আমি আশা করব আপনিও যাবেন না। নতুন সম্রাট সিংহাসনে বসবেন আর আপনি অন্যসব দরবারির মতো তাকে সম্মান দেখাবেন তা হতে পারে না। নিজেকে হাসি-তামাশার বিষয়ে পরিণত করবেন না।
গুলবদন বললেন, কামরান মীর্জার কথা যুক্তিপূর্ণ।
হুমায়ূন বললেন, যুক্তিই সবকিছু না। যুক্তির উপরে অবস্থান করে হৃদয়।
কামরান মীর্জা তিক্ত গলায় বললেন, এই বিষয়ে নিশ্চয়ই আপনার শের মুখস্থ আছে। শেরটা বলুন শুনি।
হুমায়ূন শের আবৃত্তি করলেন। শেরটির ভাবাৰ্থ এ রকম—
হে প্রিয়তমা!
যুক্তি বলছে তোমাকে পাওয়া আকাশের চন্দ্রকে হাতে পাওয়ার মতোই দুঃসাধ্য। মন বলছে তোমাকে পেয়েছি। মনের কথাই সত্য। তুমি আমার।
ভিসতি নিজাম গম্ভীর মুখে সিংহাসনে বসে আছেন। তার চেহারা মলিন, পোশাক মলিন। তবে রাজমুকুট এবং পাদুকা ঝকঝকি করছে। পাদুকা সরবরাহ করা হয়েছে। রাজমুকুট স্বয়ং হুমায়ূন নিজামের মাথায় পরিয়েছেন। পাদুকা তিনি পায়ে পরেন নি, কারণ তাঁর পা অনেক বড়। মাপে হয় নি। পাদুকার উপর পা রেখে তিনি বসেছেন।
প্রধান নাকিব ঘোষণা করল, আল সুলতান আল আজম ওয়াল খাকাল আল মুকররাম, জামিই সুলতানই হাকিকি ওয়া মাজাজি ভিসতি নিজাম পাদশাহ্।
আমীররা কুর্নিশ করলেন।
নতুন সম্রাট পাশে দাঁড়ানো আমীরকে হাতের ইশারায় কাছে ডেকে নিচুগলায় জানতে চাইলেন, দুপুরের খাবার কখন দেওয়া হবে? তাকে সময় বলা হলো। তিনি বললেন, দিল্লীতে তাঁর দূরসম্পর্কের এক দেশিয়াল ভাই আছেন। দুপুরের খানায় তাকে কি আমন্ত্রণ জানানো যাবে?
অবশ্যই যাবে। তাকে আনতে এক্ষুনি হাতি পাঠানো হবে।
খাওয়ার পর আমার দেশিয়াল ভাইকে নিয়ে আমি কি মোগল হেরেম পরিদর্শনে যেতে পারি।
আপনি যখন ইচ্ছা তখন যেতে পারবেন, তবে আপনার ভাই যেতে পারবেন না। সম্রাট ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের সেখানে প্রবেশাধিকার নেই।
আমি যদি ফরমান জারি করি?
আপনি ফরমান জারি করলেও হবে না। সম্রাটকেও নিয়মকানুনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়।
আমার ভাইয়ের খুব শখ ছিল হেরেম পরিদর্শন করা। কোনো উপায় কি আছে?
একটা উপায় আছে। আপনার ভাইকে খোজা করানো হলে উনি যেতে পারবেন। সেই ব্যবস্থা কি করব?
নতুন সম্রাট গম্ভীর হয়ে গেলেন।
সন্ধ্যাবেলায় নতুন সম্রাটের সময় শেষ হলো। তিনি প্রচুর ধনরত্ন নিয়ে নিজ গ্রামের দিকে রওনা হলেন। তিনি নিজে ঘোড়ায় করে যাচ্ছেন, তাঁর পেছনে পেছনে দুটা গাধা। গাধার পিঠে স্বর্ণমুদ্রা, রৌপ্যমুদ্রা। তাঁকে নিরাপদে বাড়িতে পৌছে দেওয়ার জন্যে দশজন অশ্বারোহীর একটি দল আগে আগে যাচ্ছে।
