দিলরুবা ম্যাডামের আজ সারাদিনে দু’টা মাত্র শট। প্রথমটা হয়ে গেছে। দ্বিতীয়টা কিছুক্ষণের মধ্যে হবে। আয়োজন চলছে। দোলনার শট। নায়িকা দোলনায় দুলছে। নায়ক পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে দোলনা দোলাচ্ছে। এক পর্যায়ে ধাক্কা বেশি হয়ে গেল। নায়িকা দোলনা থেকে পড়ে ব্যথা পেল। তার নাক দিয়েও রক্ত পড়তে লাগল। তখন একে অন্যকে দেখে হাসতে শুরু করল। এই হাসি থেকে গানের শট চলে যাওয়া হবে—
সব ফুল যদি ফাল্গুনে ফোটে
শ্রাবণে ফুটবে কী?
ভালোবাসা যদি তোমার আমার
তাহাদের গতি কী?
গানের কয়েকটা শটও আজ হওয়ার কথা ছিল। ড্যান্স ডিরেক্টর আসে নি বলে হবে না। শুটিং প্যাক আপ হয়ে যাবে। রবিন সেতুকে নিয়ে বড় কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যাবেন। আজ রবিনের জন্মদিন।
রবিন চলে এসেছেন। দোলনার শটটা এক্ষুনি শুরু হবে। মেকআপম্যান শেষবারের মতো মেকআপ ঠিকঠাক করছেন। রবিন মেকআপ রুমে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, ‘আজ আসার পথে মজার এক দৃশ্য দেখলাম। দৃশ্যটা তোমার সঙ্গে শেয়ার করব কি-না বুঝতে পারছি না। তোমার তো মেজাজের কোনো ঠিক নেই, কীভাবে নেবে কে জানে!
সেতু বলল, আমাকে কিছু বলার দরকার নেই।
রবিন বললেন, হেদায়েত সাহেবকে দেখলাম ছোটাছুটি করে হাওয়াই মেঠাই বিক্রি করছেন। আমার কাছেও এসেছিলেন। আমাকে চিনতে পারেন নি।
সেতু বলল, ও আচ্ছা।
তার চেহারায় কোনো ভাবান্তর হলো না। আয়নায় নিজের চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল।
ব্যাপারটা মনে হয় তোমার কাছে তেমন ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে না।
সেতু বলল, ওর আবার শুটিং দেখার শখ ছিল। তুমি এক কাজ কর, তাকে নিয়ে এসো শুটিং দেখবে।
এখন যাব?
তোমাকে যেতে হবে না। ড্রাইভারকে পাঠাও।
বাদ দাও তো, পরে দেখা যাবে।
সেতু রবিনের দিকে তাকাল। কঠিন দৃষ্টি। তারপর সেই দৃষ্টি মুহূর্তেই স্বাভাবিক করে বলল, যা করতে বলেছি কর।
রবিন বললেন, এখন গেলে তো পাওয়া যাবে না।
সে বলল, পাওয়া যেতেও তো পারে।
রবিন বলল, শুটিং দেখার ব্যাপারটা অন্য একদিন করলে হয় না? আমরা খেতে যাব।
সেতু বলল, সেও যাবে আমাদের সঙ্গে। জন্মদিনের উৎসবে একজন বাড়তি মানুষ থাকল। There is compary.
তার সঙ্গে আরো একজনকে দেখলাম। বৃদ্ধ।
বৃদ্ধও আমাদের সঙ্গে যাবেন।
হেদায়েতকে যথেষ্টই আনন্দিত মনে হচ্ছে। উনিশটা হাওয়াই মেঠাইয়ের মধ্যে এগারোটা বিক্রি হয়ে গেছে। বারো নম্বরটা মনে হয় এখন বিক্রি হবে। মেয়েটা যেভাবে অবাক হয়ে তাকাচ্ছে— সে না কিনেই পারে না।
হেদায়েত বলল, নতুন ধরনের কিছু হাওয়াই মেঠাই আছে—-ঝাল-মিষ্টি। ট্রাই করে দেখবেন?
মেয়েটা গাড়ি থেকে নেমে এসে বলল, স্যার আপনি আমাকে চিনতে পারেন নি?
না।
স্যার আমি আপনার ছাত্রী। আমার নাম মাহজাবিন। রোল উনিশ।
হেদায়েত অবাক হয়ে বলল, খুবই আশ্চর্য ব্যাপার! আমি হাওয়াই মেঠাই বানিয়েছিলাম উনিশটা। এর মধ্যে এগারোটা বিক্রি হয়ে গেছে। তুমি যদি একটা কেন তাহলে বারোটা বিক্রি হয়ে যাবে। থাকবে সাত। সাত একটা প্রাইম নাম্বার। ‘মায়াদের কাছে সাত ছিল অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ণ সংখ্যা। ওরা সবসময় সাতজন করে মানুষ বলি দিত।
স্যার, আপনি হাওয়াই মেঠাই বিক্রি করছেন কেন?
হেদায়েত বলল, বিপদে পড়েছি। মহা বিপদে বলতে পার। চাকরি নেই, ওইদিকে ভাইজান নিখোঁজ। ভাইজানের রেস্টুরেন্টে খেতাম। সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। হাওয়াই মেঠাই বিক্রি করে যে টাকাটা পাব সেটা দিয়ে লাঞ্চ খাব। ভাইজানের রেস্টুরেন্টেই খাব তবে পয়সা দিয়ে খাব। ভালো কথা তুমি কাঁদছ কেন?
মাহজাবিন চোখ মুছতে মুছতে বলল, আমি কেন কাঁদছি জানি না স্যার।
হাওয়াই মেঠাই কিনবে?
জি না স্যার।
আচ্ছা ঠিক আছে। রোল নাম্বার নাইনটিন, ভালো থেকো। আসল কথা তোমাকে বলতে ভুলে গেছি। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি তো— এই জন্যে মাঝে মাবো হ্যালোসিনেশনের মতো হয়। একটা মেয়েকে মাঝে মাঝে দেখি। মেয়েটার চেহারার সঙ্গে তোমার অদ্ভুত মিল।
স্যার, আপনি কোথায় থাকেন, ঠিকানাটা একটু বলবেন?
হেদায়েত বলল, এত দিন থাকতাম বেলায়েত টিম্বার নামের একটা দোকানে। আজ থেকে অন্য কোথাও থাকব। পরিমল বাবু ব্যবস্থা করবেন। তুমি চলে যাও, তোমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমার বিক্রি বন্ধ।
সেতুরা খেতে গেছে শেরাটন হোটেলে। সুইমিং পুলের পাশেই রেস্টুরেন্ট। লাঞ্চ শুরুর আগে রবিন ব্লাডি মেরি নিয়েছেন। গরমে ব্লাডি মেরি খেতে ভালো লাগছে। রবিন বললেন, তুমি একটা ব্লাডি মেরি ট্রাই করবে?
সেতু বলল, না।
রবিন বললেন, তোমার আজকের অভিনয় দেখে খুব ভালো লাগল। এরকম একটা ডিফিকাল্ট সিকোয়েন্স এক টেকে মেরে দেবে চিন্তাই করি নি।
সেতু বলল, থ্যাংক য়্যু।
রবিন বললেন, হেদায়েত সাহেবকে খুঁজে পেলে ভালোই হতো। দুজন আসলেই খালি খালি লাগছে। ঐ রাস্তায় দু’বার আসা-যাওয়া করেছি। নো ট্রেস।
সেতু বলল, তুমি ওখানে যাও নি। মিথ্যা করে বললে গিয়েছিলে।
কে তোমাকে বলল, যাই নি?
আমি প্রডাকশনের একটি ছেলেকে গাড়ি দিয়ে তোমার পেছনে পেছনে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছে তুমি গাড়ি নিয়ে বের হয়ে রমনা গ্রিনের দিকে কিছুদূর গিয়েছ। গাড়ি থেকে নেমে একটা সিগারেট খেয়েছ, তারপর ফিরে এসেছ।
রবিন চুপ করে রইলেন। সেতু বলল, আমাকে একটা ব্লাডি মেরি দিতে বলো।
রাত এগারোটা।
হেনা হতভম্ব হয়ে বসে আছে। তার শরীরে জ্বলা রোগ শুরু হয়েছে। এর সঙ্গে শুরু হয়েছে মাথাঘোরা। নিঃশ্বাসের কষ্ট হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে তার সেক্রেটারি মিস শারমিন দু’টা খবর দিয়েছে। প্রথম খবর সে ব্যাংকে ছোটাছুটি করে বের করেছে ব্যাংকে বেলায়েতের চার কোটি সাতান্ন লক্ষ টাকা আছে।
