পরিমল বাবুকে জিজ্ঞেস করতে হবে, যিশুখ্রিস্টের প্রিয় রঙ কী? পরিমল বাবু খ্রিস্টান ধর্ম সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন।
একচল্লিশ দিন পার হয়েছে
একচল্লিশ দিন পার হয়েছে বেলায়েতের কোনো খোঁজ নেই। জিন হাফসা জানিয়েছে বেলায়েত বর্ডার পার হয়ে ইন্ডিয়াতে আছে। তার শরীর সামান্য
হেদায়েতকে ফ্ল্যাটবাড়ি ছেড়ে দিতে হয়েছে। বাড়িওয়ালা পাওনা ভাড়া বাবদ ফ্লাটের সবকিছু রেখে দিয়েছে। শুধু হাওয়াই মিঠাই বানানোর যন্ত্রটা ফেরত দিয়েছে। হেদায়েত এখন পরিমল বাবুর সঙ্গে বেলায়েত টিম্বারের অফিস ঘরে থাকে। দুজনই তিনবেলা দি নিউ বিরানী হাউস এন্ড রেস্টুরেন্টে খায়। এই ফ্রি খাওয়াও বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে। হেনার সেক্রেটারি মিস শারমিন বিষয়টা একেবারেই পছন্দ করছেন না। তিনি হেদায়েতকে সরাসরি বলেছেন, আপনার ভাই বেলায়েত সাহেব যখন নিজের রেস্টুরেন্টে খেতেন তখন পয়সা দিয়ে খেতেন। সেখানে দিনের পর দিন আপনি ফ্রি খেতে পারেন। না। আপনি যে একা খাচ্ছেন তা-না, একজন সঙ্গীও আছে। সে আমাদের কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত না। সে কীভাবে ফ্রি খাচ্ছে?
হেদায়েত বলল, ভাবি কি খেতে নিষেধ করেছেন?
শারমিন বলল, উনি শোকে কাতর একজন মহিলা। সব দিক দেখা তার পক্ষে সম্ভব না। রেস্টুরেন্টটা পুরোপুরি আমি দেখছি। তবে ম্যাডাম বলেছেন, ফ্রি খাওয়া-খাওয়ি বন্ধ।
হেদায়েত বলল, আমরা কোথায় খাব?
সেটা আপনারা জানেন। আমি কী করে বলব? পরিমল বাবু যে বেলায়েত টিম্বারে থাকেন এটা ম্যাডামের খুবই অপছন্দ। অফিস ঘুমানোর জায়গা না।
উনার তো যাওয়ার কোনো জায়গা নাই।
এই বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। আপনার কিছু বলার থাকলে ম্যাডামকে বলুন। আমার কাছে সুপারিশ করে কিছু হবে না। সরি!
হেদায়েত হেনার সঙ্গে দেখা করতে গেল। পরিমল বাবু বাসার সামনে রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করতে লাগলেন। হেদায়েত কী খবর নিয়ে আসে তার জন্যে অপেক্ষা। কোনো সুখবর আসবে সে-রকম মনে হচ্ছে না। আজ সকালের নাশতা খাওয়া হয়েছে। দুপুরের কোনো ব্যবস্থা হয় নি।
হেনা চোখমুখ শক্ত করে সোফায় বসে আছে। অতি কদাকার দেখতে এক মহিলা তার মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছে। মনে হয় আরামদায়ক অবস্থা, কারণ হেনার চোখ বন্ধু।
হেনা বলল, তুমি সমস্যায় আছ সেটা আমি শুনব। কিন্তু পরিমন বাবুটা কে? তার বিষয়ে দরবার করতে এসেছ কেন?
হেদায়েত বলল, বেচারার কেউ নাই। ভাইজান ফিরে না আসা পর্যন্ত থাকুক।
তোমার ধারণা তোমার ভাইজান ফিরে আসবে?
জি।
যে একচল্লিশ দিনে ফেরে না সে একচল্লিশ বছরেও ফেরে না। বুঝেছ?
হেদায়েত বলল, বুঝতে পারছি না। একচল্লিশ দিনের সঙ্গে একচল্লিশ বৎসরের সম্পর্ক বুঝতে পারছি না। অবশ্য ৪১ একটা প্রাইম নাম্বার। ৪১ বৎসর হচ্ছে ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা। ৬ ঘণ্টা হিসাবে ধরা হয় না। প্রতি চার বছরে একবার হিসাবে আসে। তখন হয় ৩৬৬ দিনে বৎসর।
হেনা বলল, বকবকানি বন্ধ কর। হাজার যন্ত্রণায় অস্থির, তুমি শুরু করেছ বৎসরের হিসাব। মাথা কি পুরোপুরি গেছে?
হেদায়েত চুপ করে রইল। ভাবিকে তার খুব অচেনা লাগছে। মনে হচ্ছে অচেনা একজন মহিলা।
হেনা বলল, তোমার বিষয়ে এই মুহূর্তে কিছু করতে পারছি না। কোর্ট থেকে পাওয়ার অব এটর্নি বের করার চেষ্টা করছি। বের করতে পারলে তোমার ভাইয়ের একাউন্ট থেকে টাকা তুলতে পারব। তখন তোমার বিষয়ে কিছু করার চেষ্টা করব। বুঝেছ? এখন যাও। সকাল থেকে আমার মাথায় যন্ত্রণা। প্রেসারের ওষুধও এখন দুইবেলা খেতে হয়, বুঝেছ? এখন যাও।
হেদায়েত বলল, ভাইজানের রেস্টুরেন্টে কি খেতে পারব ভাবি?
হেনা জবাব দিল না। সামনে থেকে উঠে গেল। তার মানে হ্যাঁ না-কি না এটা পরিষ্কার হচ্ছে না। না হলে মুখে সরাসরি না বলত।
হেদায়েত পরিমল বাবুর সঙ্গে র্যাংগস ভবনের সামনের ঝরনার পাশে বসে আছে। এখান থেকে রাংগস ভবন ভাঙার দৃশ্য দেখা যায়। হেদায়েততের সিগারেট খেতে ইচ্ছা হচ্ছে। সঙ্গে সিগারেট নেই।
পরিমল বাবু বললেন, দুশ্চিন্তা করবেন না।
হেদায়েত বলল, দুশ্চিন্তা করছি না। সিগারেট খেতে ইচ্ছা করছে।
পরিমল বাবু বললেন, সিগারেটের ব্যবস্থা করছি।
কীভাবে করবেন?
সিগারেট ভিক্ষা চাইব। টাকা ভিক্ষার মধ্যে লজ্জা আছে। সিগারেট ভিক্ষায় লজ্জা নেই। কারণ সিগারেট ক্ষতিকর জিনিস।
পরিমল বাবু উঠে গেলেন এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এলেন। তাঁর হাতে দু’টা সিগারেট। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, একটা এখন খান আরেকটা খাবেন লাঞ্চের পরে।
লাঞ্চ কোথায় করব?
স্যারের রেস্টুরেন্টেই করব। গলা ধাক্কা দিয়ে বের না করে দেয়া পর্যন্ত সেখানেই যাব। দুঃসময়টা আপনার জন্যে কী রকম ভালো হয়েছে লক্ষ করেছেন?
কী ভালো হয়েছে?
আপনার ভাই কোথায় আছে, তার কী হয়েছে এটা নিয়ে এখন আর চিন্তা করছেন না। এখনকার একমাত্র চিন্তা খাব কী? কোথায় খাব?
হেদায়েত বলল, ভাইজানকে নিয়ে আমি রাতে চিন্তা করি। দিনে করি না।
সেটা ভালো। চিন্তার জন্যে রাত্রি উত্তম। আচ্ছা আপনার কাছে তো হাওয়াই মেঠাই বানানোর যন্ত্রটা আছে।
জি আছে।
বিশটা হাওয়াই মেঠাই আমাকে বানিয়ে দিন। আমি বিক্রি করব। বানাতে পারবেন না?
পারব। বিশটা না বানিয়ে উনিশটা বানাই?
উনিশটা কেন?
উনিশ একটা প্রাইম নাম্বার।
ও আচ্ছা। আপনার তো আবার প্রাইমের ঝামেলা আছে। বানান উনিশটাই বানান।
