রিকশা থেকে নামবার সময় পেরেকে লেগে মেয়েটির শাড়ি অনেকখানি ছিঁড়ে গেল। তার মুখ মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকার হয়ে গেল। কাদো-কাদো গলায় বলল, এখন বাসায় গিয়ে আমি বলব কী?
বাসায় কিছু বলতে হবে নাকি?
বলতে হবে না? শাড়িটা আমার নাকি? কার শাড়ি?
ছোটআপার শাড়ি। রাজশাহী সিক। এক দিনও পরে নি। সে আজ আমাকে মেরেই ফেলবে।
ছিঁড়েছে যে, এটা না বললেই হয়। ভাঁজ করে রেখে দেবেন।
ঠাট্টা করছেন? এরকম অবস্থায় কেউ ঠাট্টা করে?
মেয়েদের ব্যাপার আমি ভালো জানি না। হয়তো নতুন শাড়ি ছিঁড়ে ফেলা একটা ভয়াবহ ব্যাপার। মেয়েটির চোখে জল ছলছল করছে। কেঁদেই ফেলবে কিনা কে জানে। বিচিত্র কিছু নয়।
বোটানিক্যাল গার্ডেনে জেসমিনের সঙ্গে আমার আর কোন কথা হয় নি। সবার হাসিঠাট্টা হজম করে দূরে দূরেই থেকেছি। কিন্তু আধ-ঘন্টা রিকশায় পাশাপাশি বসার মধ্যে অদ্ভুত কোনো ম্যাজিক আছে। আমি সত্যি সত্যি ওর প্রেমে পড়ে গেলাম।
এর পর ছুটিছাটা হলেই মগবাজার ওয়ারলেস অফিসের সামনে ঘঘারাঘুরি করতাম, যদি কখনো দেখা হয়। আশেপাশের যে-কয়টি হলুদ রঙের বাড়ি আছে। সব কটির সামনে দিয়ে কত বার যে গিয়েছি! দেখা হয় নি কখনো। শুধু রহমানের সঙ্গে দেখা হল। সে অবাক হয়ে বলল, এই দিকে কোথায়?
এক জনকে খুঁজছি।
বলে পাশ কাটিয়ে চলে এসেছি, অথচ খুব সহজেই জেসমিনের ঠিকানা জিজ্ঞেস করা যেত। ইচ্ছা করে নি।
আমি চাচ্ছিলাম কারো সাহায্য নিয়ে নয়, নিজেই তাকে খুঁজে বার করি।
তারপর সত্যি সত্যি এক দিন দেখা হয়ে গেল। মেয়েদের সঙ্গে আমি কখনো সহজভাবে কথা বলতে পারি না, কথা জড়িয়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্য, সে দিন নিউমার্কেটের সমস্ত ভিড় উপেক্ষা করে হাসিমুখে এগিয়ে বললাম, চিনতে পারছেন?
জেসমিন তাকিয়ে রইল অবাক হয়ে। মনে হল চিনতে পারছে না।
ঐ যে বটানিক্যাল গার্ডেনে গেলাম রহমানের সঙ্গে?
মনে আছে, মনে থাকবে না কেন?
জেসমিনকে আজ আর সেদিনের মতত রূপসী লাগছিল না। সাধারণ বাঙালী মেয়েদের মত দেখাচ্ছিল। সাজগোজ মেয়েদের সম্ভবত অনেকটা বদলে দেয়।
আমি অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বললাম, অনেক দিন থেকেই আপনাকে মনে মনে খুঁজছিলাম।
কেন? আপনার ছোটআপা কী বলল, সেটা জানতে চাচ্ছিলাম। ছোটআপ আবার কী বলবে? কিসের কথা বলছেন?
ঐ যে শাড়ি ছিঁড়ে গেল। আপনি সত্যি সত্যি জানতে চান?
হ্যাঁ চাই।
আপা কিছু বলে নি। ওর অনেক শাড়ি। ছিঁড়ে গেলে কী আর হবে। ইচ্ছা করে তো ছিড়ি নি।
জেসমিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, শুধু এই কথা জিজ্ঞেস করবার জন্যে আপনি আমাকে খুঁজছিলেন?
হ্যাঁ।
বাসায় গেলেন না কেন? ১২১ নং মালিবাগ। বাসার সামনে একটা নারকেল গাছ আছে। রহমান ভাইকে জিজ্ঞেস করলেই ঠিকানা জানতে পারতেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন না কেন?
আমি কিছু বললাম না। জেসমিন কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। আমার কিছু বলার ছিল না। কিংবা ছিল, বলতে পারলাম না। ঠিক সময়ে আমরা ঠিক কথাটা বলতে
পারি না। ভুল কথাটা শুধু মনে আসে।
চমৎকার লাগল লেবু চা। আরেক কাপ খেতে ইচ্ছে হচ্ছে। করিম সাহেবকে দ্বিতীয় কাপের কথাটা বলা ঠিক হবে কিনা, বুঝতে পারছি না। তিনি হয়তো বিরক্ত হবেন।
জানালার পর্দা সরাতেই দেখলাম আচার-খাওয়া মেয়েটি স্কুলের জামাকাপড় পরে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এদের বাড়ির সামনে দিয়ে এত বার আসা-যাওয়া করি, কখনো তার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হয় না। একবার দেখা হলে বুঝতাম, সত্যি সত্যি নীলিমার সঙ্গে এই মেয়েটির চেহারার মিল আছে। কিনা। ওদের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব নাকি? বত্রিশ বৎসরের এক জন প্রৌঢ় তের-চৌদ্দ বছরের একটি বালিকার মুখ দেখবার জন্য দাঁড়িয়ে আছে, ব্যাপারটা খুব হাস্যকর। মাঝে মাঝে আমরা সবাই বোধ হয় এরকম উদ্ভট কিছু করি। আমি রাস্তায় নেমে এলাম। এত ভোরে মেয়েটি কোথায় যাচ্ছে? মর্নিং শিফট স্কুল নাকি?
আনন্দ বোর্ডং হাউসের মালিক আমাকে দেখে বললেন, মালিকুম ফরিদ সাহেব, কোথায় যান?
নাশতা খাব। দেখি রেস্টুরেন্ট খুলেছে কিনা।
আজ মনে হয় সকালে উঠেছেন?
জ্বি। আজ হাসপাতালে যাচ্ছি। গণি সাহেব, আপনার রেন্ট কত হয়েছে হিসাব করেন। দিয়ে যাব।
এখনই কেন? মাস শেষ হোক, তারপর দেবেন।
অসুখটা ভালো না। হাসপাতাল থেকে নাও ফিরতে পারি।
গণি সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। বিড়বিড় করে কী যেন বললেন। এই লোকটিকে আমি বেশ পছন্দ করি। নির্বোধ ভালো মানুষ টাইপের লোক। এ রকম মানুষ বোর্ডংয়ের ব্যবসা করে টিকে আছে কী ভাবে কে জানে।
ফরিদ সাহেব।
জি।
এই রকম কথা বলা ঠিক না। আল্লাহ্ নারাজ হন। হায়াত মউত মানুষের হাতে না। আল্লাহ্ পাকের হাতে।
তা ঠিক। গণি সাহেব, আমার চিঠিপত্র রেখে দেবেন। যদি আসে–আসবে না হয়তো।
জি আচ্ছা।
আর শোনেন ভাই, আমি এখন যাচ্ছি, বারটার দিকে ফিরব। আমার বন্ধুবান্ধবদের আসার কথা, ওদের বসতে বলবেন। চাবিটা রাখেন।
গণি সাহেব বললেন, এক কাজ করেন, আমার রিকশা নিয়ে যান। নানান জায়গায় যাবেন, সুবিধা হবে। এখন রিকশা পাওয়া ঝামেলা। অফিস টাইম।
গণি সাহেবের রিকশাটির পেছনে বড়ো বড়ো করে লেখা প্ৰাইভেট–এটা যে সাধারণ ভাড়া-খাটা রিকশা নয়, সেটা বোঝার জন্য। এটা বানানও হয়েছে। অন্য রকম ভাবে। দেখতে অনেকটা যাত্ৰাদলের সিংহাসনের মত। চড়তে বড়োই অস্বস্তি লাগে। সবাই দেখে তাকিয়ে তাকিয়ে।
