রিকশায় উঠেই ঠিক করে ফেললাম, কোথায় কোথায় যাব। প্রথমে যাব আমার অফিসে। যাওয়ার দরকার নেই, আগেই ছুটি নিয়ে এসেছি–তবু একবার যাব। বড়ো ভাইয়ের বাসায় যাব। আমার এক ছোট মামা থাকেন ইন্দিরা রোডে, তাঁর কাছে যাব। তিনি বলে রেখেছেন আমাকে কিছু টাকা দেবেন। অনুর ওখানে গেলে ভালো হত, কিন্তু এখন আর নারায়ণগঞ্জ যাবার সময় নেই। অনুর বরকে টেলিফোনে বলা হয়েছে। সে জানিয়েছে আসবে। পাঁচটার সময় সরাসরি হাসপাতালে আসবে।
প্রথমে যাওয়া যায় কোথায়? বড়ো ভাইয়ের বাসায়। তার ছোট মেয়েটির জন্যে কিছু একটা নেওয়া দরকার। এই মেয়েটি আমার খুব ভক্ত। আমাকে চাচা ডাকে না, ডাকে ফরিদ মামা। মামাদের সঙ্গেই ওর যোগাযোগ বেশি, কাজেই সবাইকেই ভাবে মামা। মেয়েটির বয়স মাত্র চার বৎসর। কিন্তু অসম্ভব স্মৃতিশক্তি। তাকে যত উপদেশ দেওয়া হয়, সব সে গম্ভীর হয়ে আমাকে শোনায়। মাথা দুলিয়ে-দুলিয়ে এমনভাবে কথা বলে যে বড়ো মায়া লাগে। যেমন সে গম্ভীর হয়ে বলবে, ফরিদ মামা, টিভি বেশি দেখলে মাথা ধরে, চোখ খারাপ হয়। বেশি দেখা ভালো না। শুধু কার্টুন দেখতে হয়। কার্টুন দেখলে চোখ খারাপ হয় না। আর শোন মামা, বাইরের মানুষের সামনে নেংটো হয়ে আসা খুব খারাপ। সবাই তখন মন্দ বলবে। আর বিচানায় পেশাব করাও খারাপ। আর পেশাব বলাও খারাপ। বলতে হয় বাথরুম। তোমার যদি পেশাব পায়, তাহলে তুমি বলবে বাথরুম পেয়েছে। তাই না মামা?
বড়ো ভাইকে বাসায় পাওয়া গেল না। তাঁর এক শালীর গায়ে-হলুদ। দল বেঁধে সবাই গেছে নারিন্দা। আজ আর ফিরবে না। বিয়ের ঝামেলা চুকিয়ে ফিরবে। দু- তিন দিনের মামলা। মজিদের মা বলল, নারিন্দা যাইবেন ভাইজান?
না।
তয় বসেন। চা দেই, চা খান।
মজিদের মা কোনো এক বিচিত্র কারণে আমাকে খুব পছন্দ করে। যখনই। আসি, আমার সেবাযত্নের জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। হয়তো আমার মতো দেখতে তাঁর কোনো ছেলে ছিল। কোনো দিন জিজ্ঞেস করা হয় নি।
কোন শালীর বিয়ে, জান মজিদের মা? মধ্যমটার, বেণু আফার।
বেণুকে ঠিক চিনতে পারলাম না। বড় ভাইয়ের অনেকগুলি শালী–এবং সবাই বেশ রূপসী। প্রতি বছরই এদের কারো-না-কারো বিয়ে হচ্ছে। তবু সংখ্যায় কমছে না। এদের মধ্যে এক জন ছিল দেবীপ্রতিমার মতো।
মুখের দিকে তাকালেই মন খারাপ হয়ে যেত। লুরু, চোখ সব যেন তুলি দিয়ে আকা। আমি এক দিন ভাবীকে ঠাট্টা করে বলেছিলাম, এই মেয়েটির সঙ্গে আমার বিয়ের ব্যবস্থা করে দিন না ভাবী।
ভাবী রসিকতা বুঝতে পারলেন না। রেগেমেগে অস্থির হয়ে গেলেন, কী দেখে তোমার কাছে বোন বিয়ে দেব? কী আছে তোমার? টাকাপয়সা না থাকলে লোকজনের বিদ্যাবুদ্ধি থাকে, চেহারা থাকে। তোমার কোনটা আছে?
ঠাট্টা করছিলাম ভাবী।
না, ঠাট্টা তুমি করছ না। ঠাট্টা বোঝার বয়স আমার আছে। তুমি ওর কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাক, সেটা আমি জানি না ভাবছ? ঠিকই জানি।
দারুণ অস্বস্তিকর অবস্থা। কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার কথাটা ঠিক নয়। এক দিন নিউ মার্কেটের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন ভাবীর ঐ বোনটির সঙ্গে দেখা। দু-একটা কথাবার্তা বললাম এবং পৃথিবীর সমস্ত সুন্দরী মহিলার মতো তার ধারণা হল, আমি তার জন্যে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এই গল্পই সে করেছে ভাবীর সঙ্গে।
ঘটনার এইখানেই শেষ নয়, বড়ো ভাই এক দিন হোস্টেলে এসে নানান রকম ভণিতা করে বললেন, এখন পড়াশোনার সময়, বিয়েটিয়ের কথা চিন্তা করা ঠিক না। পড়াশোনা আগে শেষ হোক। তাছাড়া দুই ভাইয়ের এক বাড়িতে বিয়ে করা ঠিক না। নতুন আত্মীয় করা দরকার। মহা ঝামেলা।
এক বার গিয়ে দেখলে হয় না কোন মেয়েটির বিয়ে হচ্ছে? নারিন্দা খুব একটা দুর কি? রিকশা তো আছেই।
রোদে কোনো তেজ নেই। আকাশে মেঘজমতে শুরু করেছে। আজও বোধ হয় ঝড়-বৃষ্টি হবে। এ বৎসর খুব ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। রিকশাওয়ালা বলল, এখন কুন দিকে যাইবেন?
মগবাজার চল। ওয়ারলেস অফিস।
এই রিকশাওয়ালা প্রফেশনাল নয়, চালাতে পারছে না। যেমে নেয়ে উঠেছে। উৎসাহেরও বেশ অভাব। চলছে টিমে তেতালা ছাদে। তাকে দেখে মনে হয় না, সে কোনোদিন মগবাজার পৌঁছবে।
জেসমিন তো বাসায় নেই। আপনি কে?
সত্যি তো, আমি কে? বুড়ো ভদ্রলোক তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। উনি নিশ্চয় জেসমিনের বাবা। এই দুপুরবেলা ঘামতে ঘামতে আমি উপস্থিত হয়েছি। সঙ্গত কারণেই ভদ্ৰলোক শঙ্কিত বোধ করছেন।
আপনি কে? জেসমিনকে কী জন্য দরকার?
সত্যি তো, ওকে আমার কী জন্যে দরকার? আমি থেমে থেমে বললাম, আমি খুব অসুস্থ। আজ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছি। আমার তলপেটে একটা অপারেশন হবে।
ভদ্রলোক অবাক হয়ে আমাকে দেখছেন।
জেসমিনকে খবরটা দেবেন দয়া করে।
তা দেব, কিন্তু আপনার নাম কী? পরিচয় কী? জেসমিনকে কী ভাবে চেনেন?
দেবার মতো কোনো পরিচয় আমার নেই। আমার নাম ফরিদ।
এই নাম বললে জেসমিন আপনাকে চিনবে?
জানি না। চিনতেও পারে।
আপনার অসুখটা কী?
ক্যানসার। ড়ুওডেনালে ক্যানসার।
ভদ্রলোক তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। আমি হাসতে চেষ্টা করলাম।
বাসায় ফিরলাম একটার দিকে
বাসায় ফিরলাম একটার দিকে। বন্ধুরা কেউ আসে নি তখনো। গণি সাহেব এসে একটি রেজিস্ট্রি চিঠি দিয়ে গেলেন। বাবুল ভাইয়ের চিঠি। ইংরেজিতে লেখা। যার অর্থ অনেকটা এরকম–বাবার অনেকগুলি চিঠি পেয়েছি। বুঝতে পারছি তোমাদের অবস্থা শোচনীয়। কিছু করতে পারছিলাম না। আমার নিজের অবস্থাও তাই। এখন অবস্থার সামান্য পরিবর্তন হয়েছে। ড্রাফট একটা পাঠালাম। বেশ কিছু টাকা এতে হবার কথা। পরবর্তী সময়ে আরো পাঠাব। ধীরে ধীরে দোতলা একটা বাড়ি বানিও। যার একতলাটি ভাড়া দিয়ে বাবা যেন নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। আমার নিজের আর দেশে ফেরা হবে না। তবে বাচ্চাদের এক বার বাংলাদেশ দেখাতে নিয়ে আসব। ড্রাফটটি তাড়াতাড়ি ভাঙাবার চেষ্টা করবে। ডলারের দাম পড়ে যাবে, এ রকম একটি গুজব এখানে আছে।
