হাসপাতালে ভর্তি হবার দিন। আজকের দিনটি অন্য আর দশটি দিনের মতো নয়। একটু যেন অন্য রকম। আলো যেন অন্য দিনের চেয়ে স্নান। বাতাস ভেজাভেজা। মানুষের চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে দিন বদলে যায় নাকি?
ঘুম ভাঙল খুব ভোরে। শেভ করলাম। নতুন ব্লেড, খুব আরামের শেভ হল। দাঁত ব্রাশ করতে করতে করিম সাহেবকে বললাম, বেড টি খেতে ইচ্ছে হচ্ছে, দিতে পারেন এক কাপ?
দুধ নেই। দুধ ছাড়া যদি চলে, দিতে পারি।
দুধ ছাড়াই দিন।
আজ হাসপাতালে যাওয়ার কথা না?
জ্বি।
কখন যাবেন?
তিনটার দিকে। রহমান গাড়ি নিয়ে আসবে।
বলতে বলতে আমার হাসি পেয়ে গেল। আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্যে রহমান বেশ ছোটাছুটি করে গাড়ি যোগাড় করেছে, যেন হাসপাতালে যাওয়ার ব্যাপারটা গাড়ি ছাড়া হবার নয়। গাড়ি করেই যেতে হবে।
গাড়ির ব্যাপারে তার খুবই উৎসাহ। কিছু একটা হলেই সে ছোটাছুটি করে গাড়ি যোগাড় করে ফেলবে। এক বার মীরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনে কয়েক জন মিলে যাওয়ার কথা। লাঞ্চ নিয়ে যাব। সারা দিন থাকব। সন্ধ্যাবেলা ফিরব। যাব পাঁচ নম্বর বাসে, ফিরবও বাসে। রওনা হবার কথা ভোর নটায়। দেখা গেল সাড়ে আটটায় রহমান ব্রিটিশ আমলের এক জীপ গাড়ি নিয়ে উপস্থিত। সে গাড়িতে দুটি সুন্দরী মেয়ে বসে আছে। মেয়েদের ছাড়া পিকনিক জমে না, এই জন্যে সে নাকি বহু ঝামেলা করে এদের যোগাড় করেছে। এরা দুজনেই রহমানের দূর সম্পর্কের আত্মীয়।
আমাদের জীপ গাড়ি টেকনিক্যালের সামনে এসে চার পায়ে দাঁড়িয়ে গেল। আর নড়ে না। হুড খুলে বহু খোঁচাখুঁচি, বহু ঠেলাঠেলি।
কিছুতেই কিছু হয় না। শেষ পর্যন্ত ঠিক করা হল, গাড়ি ফেলে রেখে গল্প করতে করতে হেঁটেই যাব। জেসমিন নামের মেয়েটি ঘাড় বাকিয়ে বলল, হিল পরে আমি হাঁটতে পারব না। আমি রিকশায় যাব।
রিকশা ঠিক করা হল। সে একা একা এরকম অচেনা জায়গায় যাবে না। অন্য মেয়েটি কোন এক বিচিত্র কারণে তার সঙ্গে যেতে রাজি নয়। ছেলেদের এক জনকে যেতে হয়। কে যাবে? মনসুর বলল, ফরিদ অসুস্থ মানুষ, ওকে রিকশায় তুলে দিলেই হয়।
জেসমিনের মুখ দেখে মনে হল ব্যাপারটা সে ঠিক পছন্দ করছে না। সে সম্ভবত যেতে চাচ্ছিল রহমানের সঙ্গে। কিন্তু ঐ মেয়েটি রহমানকে চোখে চোখে রাখছে।
রহমান আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সুপুরুষ। কী ভাবে কী ভাবে যেন বিদেশী ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি যোগাড় করে ফেলেছে। চেহারার জোর, বলাই বাহুল্য। বৎসরখানেক না ঘুরতেই শুনলাম তার নাকি একটা প্রমোশনও হয়েছে। এখন তার টেবিলে একটা পি বি এক্স না ডিরেক্ট লাইন। কারো টেলিফোনের দরকার হলে তার কাছে গেলেই হয়। শুধু সোমবার বাদ দিয়ে। কি জন্যে সোমবারটা বাদ কে জানে?
আমরা রিক্সায় উঠতেই রহমান বলল, ছাড়লাম তো দু জনকে, কি হয় কে জানে। সবাই হাসাহাসি করতে লাগল। জেসমিন দাতে দাত চেপে বলল, কি অসভ্যতা করছেন রহমান ভাই?
অসভ্যতা আমরা করলাম কোথায়? অসভ্যতা তো করছ তোমরা
আবার একটা হাসির দমকা উঠল। জেসমিন মুখ অন্ধকার করে বলল, এই রিক্সা চালাও, দাঁড়িয়ে আছ কেন?
পেছন থেকে ফজলু কী যেন বলল। অশ্লীল কিছু নিশ্চয়ই। কারণ ফজলু অশ্লীলতা ছাড়া কোনো রসিকতা করতে পারে না। তার প্রতিটি রসিকতাতেই মেয়েদের শারীরিক কিছু বর্ণনা থাকবেই।
কোনো অপরিচিত মেয়ের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে যাওয়া এই আমার প্রথম। হাতপা শিরশির করতে লাগল। আমি নিচু স্বরে বললাম, হুড তুলে দেব?
না, আমার দমবন্ধ লাগে।
মেয়েটি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, হেঁটে গেলেই ভালো হত। আমার প্রতি ইঙ্গিত করে বলল কিনা বুঝতে পারলাম না। চুপ করে গেলাম। জেসমিন বলল, আপনার রোদ লাগলে হুড তুলে দেন।
না, আমার রোদ লাগছে না।
জেসমিন খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, হেঁটে গেলে ভালো হত কেন বললাম, জানেন?
না।
বললাম, কারণ ওরা আজ সারা দিন আমাদের দু জনকে নিয়ে ঠাট্টা করবে। খুব ক্ষেপাবে।
তাই বুঝি?
হ্যাঁ, নিজেই দেখবেন। আমি আসলে আসতে চাই নি। রহমান ভাই এত করে বললেন, তাই আসলাম–নয়তো আসতাম না।
আমি হালকা স্বরে বললাম, এসে ভালোই করেছেন, পিকনিকে দু-এক জন। মেয়ে না থাকলে খুব খারাপ লাগে।
জেসমিন ঘুরেফিরে রহমানের কথা বলতে লাগল। এক জন সুন্দরী মেয়ের মুখে অন্য এক জন পুরুষের কথা শুনতে ভালো লাগে না। আমি হ্যাঁ-হুঁ দিয়ে যেতে লাগলাম।
রহমান ভাই আমাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয়।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। আমার খালাতো ভাইয়ের দিক থেকে।
ও আচ্ছা।
আমাদের বাসায় অবশ্যি রহমান ভাইয়ের যাতায়াত তারও আগে থেকে। আমরা একপাড়ায় থাকি।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। মালিবাগে, ওয়ারলেস অফিসের কাছে, ওয়ারলেস অফিস দেখেছেন আপনি?
হ্যাঁ।
ওর উত্তর দিকে। আমাদের অবশ্যি ভাড়াবাড়ি, রহমান ভাইয়ের মতো নিজের বাড়ি নয়।
ঐ বাড়ি রহমানদের নিজের নাকি?
হ্যাঁ, আপনি কি ভেবেছিলেন ভাড়াবাড়ি?
হ্যাঁ।
না, ভাড়া না, রহমান ভাইয়ের দাদা বানিয়েছিলেন।
মেয়েটি আমাকে মোটই পছন্দ করছিল না, কিন্তু তবুও অনর্গল তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কথা বলে যেতে লাগল। এই অল্প সময়ের মধ্যে আমি জেনে ফেললাম ওর এক মামাতো বোনের ইউট্যারাস অপারেশন হয়েছে। এখন আর তাদের বাচ্চা কাচ্চা হবে না। অথচ ভদ্রমহিলার খুব বাচ্চার শখ। ঘরভর্তি শুধু বাচ্চাদের ছবি। আর ওর বরটি এতই অমানুষ যে দ্বিতীয় বার বিয়ের কথা ভাবছে। ছেলেরা খুব হৃদয়হীন হয়। নিজেদের ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারে না।
