না, শুধু মেমসাহেবের ছবি নয়–পুরো ফ্যামিলির ছবি। বিদেশিনী একটি বাচ্চাকে নিয়েছে ঘাড়ে, অন্যটি এক হাতে জড়িয়ে ধরে আছে। বাবুল তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে গম্ভীর মুখে। বাবুলের চেহারা বিশেষ বদলায় নি। শুধু মোটা হয়েছে, একটু গম্ভীর হয়েছে। কিন্তু মেমসাহেব ছবিতে খুব হাসিখুশি। মনে হচ্ছে এই মেয়েটি কথায় কথায় হাসে। ছবি অবশ্য কখনো সত্যি কথা বলে না। আমার নিজের ছবিতে আমাকে খুব হাসিখুশি দেখায়, বাস্তব জীবনে আমি বিশেষ হাসি না। হাসি আসে না।
বাবা, ছেলে দটি কি ওদের?
ওদের না তো কার? রাস্তার বাচ্চা ধরে এনেছে নাকি? কী যে বেকুবের কথাবার্তা! চেহারাও তো বাবুলের মতো।
মেয়েটার চেহারা তো ভালোই।
মেয়েটা বলছিস কেন? সম্পর্ক দেখবি না? সম্পর্ক যা হয়, তাই ডাকবি। ভাবী ডাকবি।
আসলে ডাকব। আসবে-টাসবে না।
আমি উঠে পড়লাম। বাবা বললেন, খেয়ে যা। আজ চিতল মাছ এনেছে, বড়ো চিতল। পিঠের মাছটা কোপ্তা করছে আর বড়ো বড়ো পেটি।
তুমি জানলে কীভাবে?
রান্নাঘরে গিয়ে দেখে আসলাম। অসুবিধা কী? আমার সাথে কেউ পর্দা করে না। বুড়ো মানুষের সাথে আবার পর্দা কী?
বাবা আমাকে বাসে উঠিয়ে দিতে বাস-স্ট্যাণ্ড পর্যন্ত এলেন। অনুর বাড়িতে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে আর কথা হল না। এখানকার খাওয়াদাওয়া ছেড়ে যেতে তার বোধ হয় খানিকটা দ্বিধা আছে। বেশ কয়েক বার খাওয়াদাওয়ার প্রসঙ্গ এল।
বুঝলি, এদের খাওয়াটা ভালো। মাসে দু বার পোলা হয়।
তাই নাকি?
নাজির পোলাও খায় না, তার পেটের ট্রাবল। তার জন্যে পোলাওয়ের চালের ভাত। মোহনভোগ চাল। দিনাজপুর থেকে আসে।
ভালোই তো।
নাজিরের বৌ রাঁধেও ভালো। রান্নাটা নিজেই করে, চাকরের হাতে দেয় না।
তাই বুঝি?
হুঁ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নও খুব। সব জিনিস নিজের হাতে ধোয়।
আপিনি সারা দিন রান্নাঘরে বসে থাকেন নাকি?
রান্নাঘরে বসে থাকব কেন? মাঝেমধ্যে যাই।
বাস-স্ট্যাটা অনেকখানি দুরে। দেখলাম, বাবার কষ্ট হচ্ছে। বয়স হয়েছে। কষ্ট হওয়ারই কথা। আমি বললাম, চলে যান। আসতে হবে না। গোসল করে খাওয়াদাওয়া করেন। বাবা উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে হাঁটতে থাকলেন। বেচারা।
ফরিদা।
বলুন।
কড়া করে একটা চিঠি লেখ বাবুলকে। বাপ-মার হক আছে ছেলেপুলের উপর। আছে না?
তা তত আছেই।
খুব কড়া করে চিঠি দে। লিখে দে–বাবা অন্যের বাড়িতে ভিক্ষুকের মতো অবস্থান করিতেছেন।
আমি বহু কষ্টে হাসি সামলালাম। ভিক্ষুকের মতো অবস্থান। কঠিন শব্দের প্রতি বাবার খুব টান। এক বার চিঠি লিখলেন–বড়ো বৌমার আচরণে কিংকৰ্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় আছি। গ্লাস ভাঙার বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করা তার উচিত হয় নাই। আমি তার পিতৃস্থানীয়। গ্লাস এমন কোনো মূল্যবান বস্তু নহে। জগই অনিত্য।
দারুণ ফিলসফি। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দার্শনিক ভাবটা বাবার মাথায় চাড়া দিয়ে উঠেছে। কথায় কথায় জীবন-দর্শন চলে আসছে।
চিঠি কিন্তু দিবি বাবুলকে।
দেব।
আর বেশি করে পানি খাবি।
কেন?
পানিটা পেটের জন্যে ভালো। জল-চিকিৎসা। খুব উপকার হয়।
ঠিক আছে, খাব।
আর শোন, একটা বিয়ে-শাদিক। বুড়ো হয়ে গেলি তো।
রোজগারপাতি নেই।
রোজগারপাতি নেই বলেই সংসার করবি না? ভিক্ষুকরাও তো বিয়েটিয়ে করে। করে না?
আবার একটা কঠিন শব্দ–ভিক্ষুক।
হাসপাতাল থেকে ফিরেই বিয়ে করে ফেল। চিঠি লিখে দে বাবুলকে টাকা পাঠাতে। তুই ছোট, তোর হক আছে। বিয়ের খরচ দিতে বল।
ঠিক আছে, লিখব।
বাড়ি ফেরার জন্যে বাবাকে আমি একটা রিকশা করে দিলাম। দু টাকা দিয়ে দিলাম রিকশাওয়ালাকে। বাবা আকাশ থেকে পড়লেন।
এখান থেকে ওখানে রিকশা? পাগল নাকি?
রোদের মধ্যে কষ্ট করবেন কেন? চলে যান। হুড তুলে দেন।
বাবা খুবই অবাক হলেন। অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলেন। এত অবাক হবার কী আছে। এক জন বুড়ো মানুষের প্রতি আমি কি একটু মমতা দেখাতে পারি না? মমতার পরিমাণ খুবই সামান্য, তাতে কি? কিন্তু বাবা এমনভাবে তাকাচ্ছে, যেন কেঁদে ফেলবেন।
কত নম্বর বেড বললি?
একুশ নম্বর।
আচ্ছা এক দিন যাব। তুই বাবুলকে চিঠি লিখবি মনে করে।
লিখব।
খুব কড়া করে লিখবি।
আচ্ছা লিখব।
বাবা ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। রিকশাওয়ালা রিকশা নিয়ে চলে গেল। বাবা বেশ হাত-পা ছড়িয়ে বসেছেন। হুড তোলেন নি। কড়া রোদ। তবু আমার মনে হল, তাঁর খুব কষ্ট হচ্ছে না। গিয়েই হয়তোে গোসল সেরে চিতল মাছের পেটি নিয়ে বসবেন। খাওয়াদাওয়ার পর ঘুমুবেন। সন্ধ্যাবেলা টিভি সেটের সামনে বসবেন।
আজকের দিনটা বাবার সঙ্গে কাটালেই হত। ফিরে যাবার একটা ক্ষীণ ইচ্ছা হতে লাগল। যাব নাকি ফিরে? বললেই হবে–শরীরটা ভালো লাগছে না। বিকেলে বাসায় যাব। কিংবা হয়তো থেকেই গেলাম আজ রাতটা। দোটানা ভাব দীর্ঘস্থায়ী হল না। বাসে উঠে পড়লাম। পাশের ভদ্রলোক একটা চিত্রালী কিনেছেন। প্রথম পাতায় কোনো এক জন নায়িকার ছবি ছাপা হয়েছে। মোটা মোটা ঠোট। ইয়া লাশ। বডিবিল্ডারদের মতো ফিগার। এমন একটি ধুমসী মেয়ে কী করে খুকিদের মতো কামিজ পরে আছে কে জানে? নাম কি নায়িকাটির? নাম-ধাম লেখা নেই। হয়তো এত পরিচিত যে নামের প্রয়োজন নেই। আমি আগ্রহ নিয়ে ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, এই নায়িকার নাম কি? ভদ্রলোক অত্যন্ত বিরক্ত হলেন। কেন হলেন কে জানে? বিরক্তি কি আমার অজ্ঞতার জন্যে? আমার বোধ হয় জানা উচিত ছিল, কী নাম।
আজ সোমবার
আজ সোমবার।
