কোক পাওয়া গেল না, সেভেন আপ নিয়ে এসেছে।
আপনি দোকানে যাবেন না নাজির ভাই?
যাব। গাড়ি আসবে এগারটায়, ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে মতিঝিল গেছে।
আমি চমকে উঠে বললাম, গাড়ি কিনেছেন কবে? গত মাসে।
নতুন গাড়ি?
নতুন গাড়ি কেনবার পয়সা কোথায়? পুরনো। ড্রাইভারের বেতন দিতে গিয়ে অবস্থা কাহিল।
কত দেন বেতন?
আট শ। তোমার খবর বল।
কী খবর চান?
করছ কী?
তেমন কিছু করছি না।
নাজির ভাই বিরক্ত স্বরে বললেন, কখন তো কিছু করতে শুনি না। ফলে কী ভাবে?
চলে কোথায়? চলে না। থেমে থাকে।
চার-পাঁচটা প্রাইভেট ট্যুশনি করতে, এখনো কর?
একটা এড-ফার্মে কাজ করি। দুটা টিউশনি করি।
এটাও খারাপ বিজনেস না। এক ঘন্টা পড়াতে এক জন চার শ পাঁচশ টাকা চায়, দেখ অবস্থা।
আমি কিছু বললাম না। নাজির ভাইকে মনে হল ক্রমেই বিরক্ত হয়ে উঠছেন। কেন কে জানে।
এত বড়ো অপারেশন করা, হাতে টাকাপয়সা আছে?
আছে কিছু।
কত আছে?
তিন হাজার টাকার মতো আছে।
বল কি। প্রাইভেট টুশনি করে এত টাকা জমিয়েছ?
আমি উত্তর দিলাম না। নাজির ভাই শুকনো গলায় বললেন, দরকার লাগলে চাইবে আমার কাছে। লজ্জা করবে না।
না, দরকার হবে না।
হবে না, বুঝলে কী ভাবে? তিন হাজার টাকা আজকাল কিছুই না।
তা ঠিক।
শোন ফরিদ, তোমার যে ভাই সুইডেনে আছে, তার নামটা কি যেন? বাবুল না? বাবুলই তো নাম?
জ্বি।
তাকে টাকাপয়সার জন্য লেখ না কেন? ভাইয়ের কাছে চাইতে আবার লজ্জা কি? সভাইও না। নিজের মায়ের পেটের ভাই। তোমাদের দাবি আছে।
দেখি, লিখব এবার। তার নিজেরই বোধহয় চলে না।
না চললেও লিখবে। বুড়ো বাপ আছে, তাঁর দায়িত্ব আছে না?
জ্বি, তা তো ঠিকই।
তার উপর তোমার এত বড় অপারেশন।
আমি লিখব।
এর মধ্যে লজ্জার কিছু নেই। যে দেখে না, তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয়। এটাই নিয়ম।
এগারটার আগেই গাড়ি এসে পড়ল। সেকেণ্ডহ্যাণ্ড গাড়ি মনেই হয় না। নতুন কাঁচা টাকার মতো চকচক করছে।
ফরিদ, আমি গেলাম। দুপুরে খেতে আসব। তুমিও দুপুরে খেয়ে তারপর যাবে। হুট করে চলে যে না।
দেখি।
দেখাদেখি না। আমি আসলে তারপর যাবে। ড্রাইভার পৌছে দিয়ে আসবে। অসুবিধা হবে না।
বাবা এলেন বারোটায়। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত। এই শরীরে কোথায় হাঁটাহাঁটি করছিলেন কে জানে। আমাকে দেখে প্রথম যে-কথাটি বললেন, সেটি হচ্ছে–কি, আমাকে নিতে এসেছিস?
কোথায় যাবেন?
অনুর বাসায়। আর কোথায় যাব? যাওয়ার জায়গা আছে? অপদাৰ্থ ছেলেপুলে তৈরি করে শেষ বয়সে এই কষ্ট। ছিঃ ছিঃ।
আমি প্ৰসঙ্গ পাল্টাবার জন্য বললাম, আমার অপারেশনের কথা শুনেছেন?
হুঁ। অপারেশন কবে?
এখনো ডেট হয় নি। সোমবার হাসপাতালে ভর্তি হব। একুশ নম্বর কেবিন।
বাবাকে খুব চিন্তামগ্ন মনে হল। মাথা নিচু করে বসেছিলেন। বেশ কয়েকবার মুখ তুলে তাকালেন। পরাজিত মানুষের মুখ। সারা জীবন অসংখ্য যুদ্ধ করেছেন। এখনো করছেন। একটিতেও জয়লাভ করেন নি। কিছু কিছু মানুষ কি শুধু পরাজিত হবার জন্যেই জন্মায়। এক সময় থেমে থেমে বললেন, নাজিরের বাসায় আর থাকতে পারব না। হারামজাদা ছোেটলোক।
অতি সামান্য আহতই হলাম। বাবা আমার কথা মমাটেই ভাবছেন না। আমার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া না-হওয়ায় তার কিছুই যায় আসে না। তিনি ভাবছেন তার নিজের কথা।
ফরিদ।
বলেন।
ওরা খায়দায় ভাল। খাওয়াটাই তো সব না। ইজ্জত নিয়ে থাকতে হয়। এখানে পদে পদে বেইজ্জত।
অনুর বাসাতেও তো তাই।
তবু সেটা মেয়ের বাসা। নিজের লোকের কাছে বেইজ্ঞাতি হওয়া অন্য কথা।
বাবা আবার চিন্তায় ড়ুবে গেলেন। আমি মৃদু স্বরে বললাম, বাবা আমার কিছু টাকা দরকার। হাজার দুই।
টাকা, আমি টাকা পাব কোথায়? তোর কি মাথাটাথা খারাপ?
বাবা দারুণ চমকে উঠলেন। এতটা চমকানর প্রয়োজন ছিল না। কারণ তার কছে টাকা আছে। চার-পাঁচ হাজার থাকার কথা। বেশিও হতে পারে।
মার মৃত্যুর পর বাবা ঘরের যাবতীয় জিনিসপত্র বিক্রি করে বড় ছেলের বাড়িতে থাকতে গেলেন। আলনা, চেয়ার, টেবিল থেকে শুরু করে শিল-পাটা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে গেল। এ ছাড়াও মায়ের দু ভরি ওজনের একটা গলার হার ছিল, যা বাবা বহু চেষ্টা করেও মার জীবদ্দশায় বিক্রি করতে পারেন নি, সেটিও নিশ্চয় এত দিনে বিক্রি হয়েছে। এবং তাঁর মতো কৃপণ লোক একটি টাকাও খরচ করবে বিশ্বাস হয় না–সবই জমা আছে।
বাবা, অপারেশনে অনেক খরচপত্ৰ আছে।
সরকারী হাসপাতালে অপারেশনের আবার খরচ কিসের?
কেবিন নিয়েছি। কেবিনের চার্জ আছে।
কেবিন নিলি কেন? কেবিনে কি আলাদা করে চিকিৎসা হয়? সব একপদের চিকিৎসা। চেষ্টাচরিত্র করে জেনারেল ওয়ার্ডে চলে যা।
বাবা, কিছু টাকা দিন। আপনার কাছে তো আছে।
যা আছে, সেটা বিড়ি-সিগ্রেট খাওয়ার খরচ। একটা পয়সা কেউ দেয়? বাবুল দিয়েছে কিছু?
আমি তো দিতাম! মাসে পঞ্চাশ করে দিতাম।
পঞ্চাশে কী হয়? হটেলে এক বেলা খেতে লাগে কুড়ি টাকা।
যা পেরেছি দিয়েছি। আপনি এখন কিছু দিন।
আমার কাছে টাকা নেই। বাবুলের কাছে এতগুলি চিঠি লিখলাম, টাকাপয়সার কথা লিখলাম। তার কোনো উত্তর নেই। সে তার মেমসাহেবের ছবি পাঠিয়েছে। হারামজাদা!
দেখি ছবিটা।
বাবা ছবি আনতে গেলেন। বাড়ির কাজের মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, আমি গোসল করব কিনা। আমি বললাম, আমি এখানে ভাত খাব না। চলে যাব। মেয়েটি মনে হল বেশ অবাক হয়েছে। আমাকে বোধ হয় সেই শ্রেণীর গরিব আত্মীয়দের মতো দেখাচ্ছে, যারা ভাত না খেয়ে কখনো যায় না। যাবার আগে টাকা ধার চায়।
