এই তোমার গল্প?
হ্যাঁ।
আলতাফকে এই গল্প শুনাতে চাচ্ছিলে কেন?
ওর কারণে এই ব্যাপারটা আমার মাথায় ঢুকে গেছে বলেই ওকে শুনাতে চাচ্ছিলাম। আমার ইচ্ছা ছিল–ওকে বলব যেন পোকা নিয়ে সে আর কখনো কারো সঙ্গে কোন কথা না বলে। এই হাস্যকর ব্যাপারটা যেন সে আর কারো মাথায় ঢুকিয়ে না দেয়।
মনসুর বললেন, ব্যাপারটা তোমার মাথা থেকে পুরোপুরি দূর হয়েছে?
হঁ, হয়েছে। তবে আমি পোকা নিয়ে খুব ভাবতে শুরু করেছি। অন্য এক দৃষ্টিভঙ্গিতে এদের দেখার চেষ্টা করছি।
অন্য দৃষ্টিভঙ্গি মানে?
ওদের প্রতি একটা সিমপেথিটিক এটিচুড তৈরি হয়েছে।
মনসুর গম্ভীর হয়ে বললেন, সিমপেথিটিক এটিচুডের ব্যাপারটা বুঝলাম না।
ওসমান গলা নিচু করে বললেন, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আলতাফের কথা সত্যি হতেও পারে। পোকাদের কিছু স্ট্রেজ ব্যাপার আছে, যা থেকে ধারণা করা অস্বাভাবিক না যে এদের বুদ্ধি আছে, ভালভাবেই আছে। যেমন ধর, যখন কোন বিশেষ জায়গায় আণবিক বোমার টেস্টিং হয় তখন যে জায়গায় এই টেস্টিং করা হয় তার এক মাইলের ভেতর কোন পোকা-মাকড় বিশেষ করে তেলাপোকা থাকে না। এরা মনে হয় কোন এক অদ্ভুতভাবে খবর পেয়ে যায় যে এখানে নিউক্লিয়ার বোমা টেস্টিং হবে। খবর পেয়ে সরে পড়ে। ইন্টারেস্টিং না?
সত্যি হয়ে থাকলে ইন্টারেস্টিং।
হিরোশিমা এবং নাগাশাকিতে আণবিক বোমা ফাটার পর এর আশেপাশের অঞ্চলগুলি তেলাপোকায় ছেয়ে গিয়েছিল। আমার ধারণা, এরা এসেছে হিরোশিমা ও নাগাশাকি থেকে। এরা বুঝে গিয়েছিল এখানে বোমা ফাটবে, কাজেই সরে গিয়েছিল।
এই খবর পেলে কোথায়?
কোথায় যেন পড়েছিলাম।
সত্যি?
সত্যি তো বটেই। সমুদ্রগামী জাহাজ থেকে হঠাৎ দেখা যায় ইঁদুর আর তেলাপোকা নেমে পড়ছে। তখন বুঝতে হবে জাহাজটা পানিতে ডুবে যাবে বা এই জাতীয় কিছু একটা হবে। এরা খবরটা পায় কিভাবে?
মনসুর বললেন তুমি বলতে ঢাচ্ছ পোকাদের বুদ্ধি আছে। তারা ইন্টেলিজেন্ট।
নিশ্চিত করে কিছু বলছি না, তবে সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছি না।
একসময় তুমিই কিন্তু বলেছ ওদের মস্তিষ্ক নেই। কাজেই বুদ্ধি থাকবে না। এখন অন্য কথা বলছ।
তা বলছি। এখন কালেকটিভ ইন্টেলিজেন্সের কথা মাথায় আসছে। অর্থাৎ আলাদা-আলাদাভাবে এক একটা পোকা বুদ্ধিমান নয়–কিন্তু তাদের সবাইকে একত্র করলে তারা বুদ্ধিমান। প্রচণ্ড বুদ্ধিমান। এত বুদ্ধিমান যে এরা মানুষকে ব্যবহার করছে। মানুষ তা-ই বুঝতে পারছে না। মানুষ এদের হাতে খুবই অসহায়।
পোকাদের হাতে মানুষ অসহায়?
হ্যাঁ অসহায়। পঙ্গপালের কথা ভেবে দেখ। পঙ্গপালের আক্রমণ ঠেকানোর কোন বুদ্ধি কি মানুষের আছে? মেশিনগান দিয়ে ঠেকাবে? পৃথিবীতে বিউবোনিক প্লেগ ছড়িয়েছিল ইঁদুর। ১৩৪৭ থেকে ১৩৫১–এই পাঁচ বছরে প্লেগে সারা পৃথিবীতে মানুষ মারা গেছে ৭৫ মিলিয়ন। ঊনবিংশ শতাব্দীতেও বিউবোনিক প্লেগ হল–মানুষ মারা গেল ২০ মিলিয়ন। যেমন হঠাৎ করে অসুখটা এসেছিল তেমনি হঠাৎ করে চলে গিয়েছে। আমার এখন মনে হচ্ছে, এইগুলি পোকাদের সাবধানবাণী। পোকারা মানুষদের সাবধান করে দিচ্ছে। তারা বলছে–হে মানব সম্প্রদায়, সাবধান। আমরা কিন্তু ইচ্ছা করলেই তোমাদের শেষ করে দিতে পারি। তোমাদের অতি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান কোন কাজেই লাগবে না।
মনসুর সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, এদের ক্ষমতা থাকলে মানুষকে এরা শেষ করে দিচ্ছে না কেন? মানুষ তো নানানভাবে এদের বিরক্ত করছে। ইনসেকটিসাইড ছড়াচ্ছে–পোকা-মাকড় মারার কত কায়দা-কৌশল বের করছে। পোকাদের যদি এতই বুদ্ধি তাহলে ওরা চুপ কেন?
ওসমান গলার স্বর নিচু করে বললেন, এই বিষয়েও আমার একটা হাইপোথিসিস আছে। মানুষকে এরা শেষ করছে না, কারণ মানুষকে তাদের প্রয়োজন। মানুষের টেকনোলজি প্রয়োজন। শুধুমাত্র মানুষেরই ক্ষমতা আছে মহাশূন্য জয় করার। মানুষ একদিন সৌরজগতের বাইরেও পা বাড়াবে, কিন্তু পোকাদের এই ক্ষমতা নেই। তারা যদি পৃথিবীর বাইরে ছড়িয়ে পড়তে চায় তাহলে মানুষের সাহায্য তাদের নিতেই হবে।
পৃথিবীর বাইরে ছড়িয়ে পড়ার তাদের দরকার কি?
দরকার আছে। বুদ্ধিমান প্রাণির লক্ষণ হল, সে চেষ্টা করবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে–পোকারা তাই করছে। মানুষ যখন মঙ্গলগ্রহ থেকে যাবে বৃহস্পতির উপগ্রহে, এরাও যাবে মানুষের সঙ্গে। বুঝতে পারছ?
পারছি, কিন্তু তুমি কি এই হাইপোথিসিস বিশ্বাস কর?
বিশ্বাস করি না–আবার অবিশ্বাসও করি না। আলতাফ নামের তোমার ঐ লোকটির সঙ্গে আমার কথা বলতে হবে।
মনসুর গম্ভীর গলায় বললেন, আলতাফের সঙ্গে তোমার কথা বলতে হবে না। কথা বলার পরিণাম তো দেখতেই পাচ্ছি। তোমার উচিত বিশ্রাম নেয়া এবং মাথা থেকে পোকা-মাকড় পুরোপুরি দূর করা। যেভাবে হুইস্কি খাচ্ছ, মনে হয় একটা কেলেংকারি করবে। যাও, ঘুমুতে যাও।
রাত খুব একটা বেশি হয়নি। দুটা বাজে। দুটা অনেক রাত।
মনসুর উঠে দাঁড়ালেন। এখনো ইলেকট্রিসিটি আসেনি। মনে হয় আজ রাতে আর আসবে না। বৃষ্টি থামেনি। মাঝখানে কিছুটা কমেছিল, এখন আবার মুষলধারে শুরু হয়েছে।
বাথরুম থেকে অদ্ভুত একটা শব্দ আসছে। কিসের শব্দ? মনসুর কৌতূহলী হয়ে উঁকি দিলেন। অন্ধকার বাথরুম। চার্জলাইটের আলো বাথরুম পর্যন্ত পৌঁছেনি। তিনি পকেট থেকে দেয়াশলাই বের করলেন। দেয়াশলাই জ্বালাবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সারা শরীর কেঁপে উঠল–এসব কি? হাজার হাজার কোটি কোটি পোকা তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। শুঁড় নাড়ছে। এটা কি এক ধরনের হেলুসিনেশন? অবশ্যই তাই। ওসমানের কথা শুনে তিনি প্রভাবিত হয়েছেন। আলতাফ প্রভাবিত করেছিল ওসমানকে। তাকে দিয়ে অন্য আরেকজন প্রভাবিত হবে। এক সময় দেখা দেবে মাস হিস্টিরিয়া। দেয়াশলাইয়ের কাঠি নিভে গেছে। তিনি এখন আর কিছুই দেখছেন না, শোঁ শোঁ শব্দ শুনছেন।
