মনসুর কৌতূহলী হয়ে তাকালেন।
তোমার মনে আছে বোধহয়, আলতাফের বাসায় আমি একটা তেলাপোকা মেরেছিলাম। আলতাফ তাতে দুঃখিত হয়েছিল।
আলতাফ দুঃখিত হয়েছিল কিনা জানি না, তুমি তেলাপোকা মেরেছিলে তা মনে আছে।
বাসায় ফিরলাম, শরীর কেমন ঘিন ঘিন করতে লাগল। সারাক্ষণ মনে হতে লাগল জুতার নিচে তেলাপোকার রক্ত-মাংস লেগে আছে। প্রথমেই কাজের ছেলেটিকে দিয়ে জুতা ধুয়ালাম। আমার মনে হল, সে ঠিকমত ধোয়নি। সাবান দিয়ে নিজে ধুলাম। মনে হল, সর্বনাশ হয়েছে। আমার হাতে রক্ত লেগে গেছে। গোসল করলাম। ভাবটা দূর হল না। শরীর ঘিন ঘিন করতে লাগল।
রাতে ভাত খেতে পারলাম না। রেবেকা ফিরল রাত দশটায়। ততক্ষণে আমার প্রায় মাথা-খারাপের মত হয়ে গেছে। আমার ধারণা হয়ে গেছে, তেলাপোকার রক্ত মাংস সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়েছে। দুজন কাজের লোককেই ঘর মুছতে লাগিয়ে দিয়েছি। বালতি ভর্তি পানিতে ডেটল গুলে ওরা মেঝে ন্যাকড়া দিয়ে মুছছে এবং অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে। রেবেকা ঘরে ঢুকে বলল, কি হয়েছে?
আমি ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করলাম। ব্যাখ্যা করার সময় বুঝলাম, আমি নিতান্ত বোকার মত কথা বলছি। না, বোকা না, পাগলের মত কথা বলছি।
রেবেকা বলল, তুমি নিওরোটিক পেশেন্টের মত আচরণ করছ।
আমি বললাম, আমি মোটেই নিওরোটিক পেশেন্টের মত আচরণ করছি না। আমি যা অনুভব করছি তা বলছি।
রেবেকা কাজের লোক দুটিকে ধোয়াধুয়ি বন্ধ করতে বলল। ঝগড়া শুরু হল এই পর্যায়ে। কুৎসিত ঝগড়া। আমি একেবারে তুই-তোকারির পর্যায়ে চলে গেলাম। চিৎকার করে বলতে লাগলাম–তোর সঙ্গে বাস করে আমি নিওরোটিক পেশেন্ট হয়েছি। বুঝেছিস? তোর ধবধবে শাদা গায়ের রঙের জন্যে তো তোর খুব অহংকার। এই শাদা রঙের জন্যে তোকে দেখায় শাদা তেলাপোকার মত। শাদা তেলাপোকা কখনো দেখেছিস? এরা থাকে কমোডের ভেতরে। তোর গায়েও তেলাপোকার মতই গন্ধ। তার পরেও কিছু বলি না। সহ্য করি।
রেবেকা আমার কথাবার্তা শুনে হতভম্ব হয়ে গেল। এক পর্যায়ে বলল–তোমার ঘুমানো দরকার। আমি পেথিড্রিন ইনজেকশনের একটা এম্পুল রেখে যাচ্ছি। ইসমাইলকে বললেই সে তোমার শরীরে পুশ করে দেবে। আমি চলে যাচ্ছি।
এর উত্তরে আমি আরো সব কুৎসিত কথা বলতে লাগলাম। এমন সব কুৎসিত কথা যে, তুমি শুনলে তিনতলা থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে যাবে। উদাহরণ দেব? শুনতে চাও?
না, শুনতে চাই না।
শুনতে না চাওয়াই ভাল।
মনসুর বললেন, তুমি মদ্যপানটা মনে হয় বেশি করছ?
তা ঠিক, বেশিই করছি। আমার অবস্থায় পড়লে তুমি বাথটাবে মদ ভর্তি করে তার ভেতরে শুয়ে থাকতে। আসল স্টোরিটা শোন। আসল স্টোরিতে এখনো আসিনি।
বল আসল স্টোরি।
রেবেকা রাতেই চলে গেল। আমি কাজের লোক দুটিকে বললাম, তোমরা ননস্টপ ঘর মুছে যাও। আমি না বলা পর্যন্ত থামবে না। তারপর হুইস্কির একটা বোতল নিয়ে বসলাম। তুমি ভাল করেই জান আমি প্রফেশনাল মাতাল নই। বিদেশে পড়াশোনার জন্যে যখন গিয়েছিলাম তখন মাঝে-মধ্যে খেতাম। দেশে এসে ছেড়ে দিয়েছিলাম। ইদানিং কখনো কখনো খাওয়া হয়। তা-ও যখন বন্ধু বান্ধব আসে, তখন। যাই হোক, রাত একটার ভেতর ২৫০ মিলিলিটারের স্কচ হুইস্কির একটা পুরো বোতল শেষ করে ফেললাম। মাতাল হলাম না। শুধু অনুভব করলাম, মাথাটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। আমি নিজেও সাবানের বড় একটা ফেনা হয়ে গেছি। বাতাসে ভাসতে শুরু করেছি। হার্ড লিকার চার পেগের বেশি আমি খেতে পারি না। আমার বমি ভাব হয়। পুরো বোতল খেয়েও আমার কিছু হল না। শুধু বাথরুম পেতে লাগল। আমার তখন বাথরুমে যেতেও ইচ্ছা করছে না। মনে হচ্ছে চেয়ারে বসেই কাজ সেরে ফেলি। মেঝে তো ধোয়া হচ্ছেই। যাই হোক, বাথরুমে গেলাম। এই অংশটা মন দিয়ে শোন। খুব মন দিয়ে শুনবে।
আমি তোমার সব অংশই মন দিয়ে শুনছি।
এই অংশটা অনেক বেশি এটেনশন দিয়ে শুনতে হবে। বাথরুমে ঢুকেছি। বাতি জ্বালিয়ে দরজা বন্ধ করতেই এক ধরনের হামিং সাউন্ড হতে লাগল। যেন লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষ খুব নিচু গলায় কথা বলছে। লো ফ্রিকোয়েন্সি সাউড আসছে কমোডের ভেতর থেকে। আমি অবাক হয়ে কমোডের কাছে গিয়ে নিচু হয়ে তাকাতেই গায়ের সমস্ত রক্ত জমে গেল। দেখি, কমোডভর্তি তেলাপোকা। তারপর দেখি শুধু কমোড নয়, বাথরুমের মেঝে থিকথিক করছে পোকায়। অথচ ঘরে ঢোকার সময় ছিল না। কখন এল? কোত্থেকে এল? হঠাৎ দেখি পোকারা আমার গা বেয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। অন্য যে-কেউ হলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেত। আমি বুঝলাম–অতিরিক্ত মদ্যপানের জন্যে আমার হেলুসিনেশন হচ্ছে। আসলে কোন পোকা নেই কিন্তু আমার মস্তিষ্ক পোকা দেখছে। বাথরুমের দেয়ালগুলি একটু আগেই শাদা দেখেছি–এখন দেখি ব্রাউন রঙ। তেলাপোকায় দেয়াল ডেকে গেছে। আমি তখন এদের কথাও শুনতে পেলাম। পরিস্কার শুনলাম–এরা বলছে …
কি বলছে?
কি বলছে, তা তোমাকে বলতে চাচ্ছি না। কারণ ওরা তো আসলে কিছু বলছে না। যা বলার আমার মস্তিষ্কই আমাকে বলছে। যাই হোক, আমি কি করলাম শোন। বাথরুম থেকে বের হয়ে এলাম। আমার গা ভর্তি তেলাপোকা। এদের নিয়েই বের হয়েছি। কাজের লোক দুটি তখনও মেঝে ঘসে যাচ্ছে। আমি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম–তোমরা কি আমার গায়ে তেলাপোকা দেখতে পাচ্ছ? ওরা ভয়ে ভয়ে বলল, জি না স্যার। আমি বললাম, তাহলে যাও, ইসমাইলকে ডেকে আন। আমাকে পেথিড্রিন ইনজেকশন নিতে হবে। ইসমাইল এসে আমাকে পেথিড্রিন ইনজেকশন দিল। আমার ঘুম ভাঙল পরদিন দুপুর দুটায়। আমি তখন পুরোপুরি সুস্থ। তেলাপোকা ব্যাপারটা আর মাথায় নেই।
