শব্দটা কমোডের ভেতর থেকে আসছে। দেয়াশলাইয়ের আরেকটা কাঠি কি জ্বলাবেন? তাঁর সাহস হল না।
.
১৩.
দুলারী অলঅফের মাথার কাছে বসে আছে। জ্বরে মানুষটার গা পুড়ে যাচ্ছে। থার্মোমিটার থাকলে জ্বর দেখা যেত। থার্মোমিটার নেই। জ্বর কমানোর জন্যে কিছু একটা করা দরকার। কি করবে দুলারী বুঝতে পারছে না। দুটা প্যারাসিটামল খাওয়ানো উচিত। ঘরে কোন প্যারাসিটামল নেই। মাথায় পানি ঢালা উচিত। দোতলায় এক ফোঁটা পানি নেই। পানি ঢালতে হলে বালতিতে করে একতলা থেকে নিয়ে আসতে হবে। দুলারী তাও করতো কিন্তু মানুষটা তাকে ছাড়ছে না। তার হাত ধরে বসে আছে। এত শক্ত করে হাত চেপে ধরে আছে যে হাত ব্যথা করছে।
আলতাফ ক্ষীণ স্বরে ডাকল, দুলারী!
দুলারী বলল, কি?
খুব খারাপ লাগছে।
মাকে ডেকে আনব?
না। এখন কটা বাজে দুলারী?
রাত দুটা।
আলতাফ অনেক কষ্টে পাশ ফিরল। দুলারী বলল, বাবাকে ডেকে তুলি। বাবা তোমার জন্যে ডাক্তার নিয়ে আসুক।
তুমি আমার হাতটা ছাড়, আমি তোমার জন্যে পানি নিয়ে আসি। মাথায় পানি ঢালতে হবে।
না।
আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি তোমার জন্যে পানি আনতে যাচ্ছি না। তুমি এত শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরবে না। আমার হাত ব্যথা করছে। আচ্ছা, আমার হাতটা একটু ছাড় তো, বাতি জ্বালাই। অন্ধকারে বসে থাকতে আমার ভয় ভয় লাগছে।
আলতাফ দুলারীর হাত ছাড়ল না। বরং আরো শক্ত করে হাত চেপে ধরল। দুলারীর ভয়-ভয় করছে। তার হঠাৎ করে মনে হচ্ছে, তাদের খাটের নিচটা তেলাপোকায় ভর্তি হয়ে গেছে। পোকার আলতাফকে দেখতে আসছে, আরো আসবে। ঘর ভর্তি হয়ে যাবে পোকায়। কেন তার এরকম মনে হচ্ছে সে জানে না। আলতাফকে জিজ্ঞেস করলে কি কোন লাভ হবে? আলতাফ কি কিছু বলবে?
দুলারী বলল, এই শোন, শোন!
উঁ।
ভয় লাগছে। আমার ভয় লাগছে।
উঁ।
আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, খাটের নিচটা পোকায় ভর্তি হয়ে গেছে। আমার প্রচণ্ড ভয় লাগছে।
উঁ।
এই দেখ শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে। পোকারা কি এরকম শব্দ করে?
উঁ।
এরকম উঁ উঁ করবে না। শুনতে বিশ্রী লাগছে। হাতটা ছাড়, আমি বাতি জ্বালাব।
না।
দুলারী প্রায় জোর করে আলতাফের হাত ছাড়িয়ে দিল। বাতি জ্বাললো। উঁকি দিল খাটের নিচে। সারি সারি তেলাপোকা চুপচাপ অপেক্ষা করছে। একটিও নড়ছে না। দুলারী বলল, যা! যা! এতেও কিছু হল না। আলতাফ ক্লান্ত গলায় বলল, এরা যাবে না। এরা থাকবে। তুমি এদের কিছু বলো না। বাতি নিভিয়ে দাও।
দুলারী বাতি নেভাল। তার কান্না পাচ্ছে। সে কি করবে বুঝতে পারছে না। এত রাতে বাবা-মাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে ইচ্ছা করছে না।
.
১৪.
ভোরবেলাতেই বজলুর রহমান হোমিওপ্যাথ ডাক্তার বিধু বাবুর দরজার কড়া নাড়তে লাগলেন। দুলারীর কাছ থেকে খবর পেয়েছেন আলতাফের জ্বর। সারারাতই না-কি জ্বর গেছে। এখন খুব বাড়ছে। ডাক্তার না ডাকলেই নয়।
অনেকক্ষণ কড়া নাড়ার পর বিধু বাবু দরজা খুলে হাসিমুখে বললেন, তোমার মাছের কাঁটার অবস্থা কি?
বজলুর রহমান হতভম্ব হয়ে বললেন, কি বলছ তুমি! সে তো বৃটিশ আমলের কথা। আমার গলা থেকে তো কবেই কাটা গেছে, এখন তোমার মাথায় বিঁধে আছে। কাটা বিঁধা মাথা নিয়ে ডাক্তারি কর কিভাবে? যাই হোক, তুমি আস আমার সঙ্গে। আলতাফকে দেখবে।
ওর কি হয়েছে? গলায় কাটা?
গলায় কাঁটার ব্যাপারটা মাথা থেকে দূর কর। ওর জ্বর।
চল দেখি।
.
বিধু বাবু আলতাফের কপালে হাত দিয়েই প্রায় লাফিয়ে উঠার জোগাড় করলেন–সর্বনাশ! এ তো অনেক জ্বর! রাগে বজলুর রহমানের গা জ্বলে গেল। অনেক জ্বর বলেই তো ডাক্তার ডেকে আনা। কুসুম-কুসুম জ্বর হলে কে আনতো?
বিধু বাবু রোগিকে দেখে টেখে শুকনো গলায় বললেন–অবস্থা তো কেমন কেমন মনে হচ্ছে–ইয়ে। বজলুর রহমান বললেন, ইয়েটা কি?
না মানে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই ভাল। জ্বর খুব বেশি।
বজলুর রহমানের ইচ্ছা হল, বিধু বাবুকে ধরে একটা আছাড় দেন। এম্নি মুখে বড় বড় কথা–ক্যানসার সারাই, হাঁপানি সারাই, এইডস রোগ সারাই। আর সামান্য একটু জ্বর দেখে মুখ শুকিয়ে আমশি! ধাক্কা দিয়ে দোতলার বারান্দা থেকে নিচে ফেলা দেয়া উচিত।
তিনি তা করলেন না। নিজেকে সামলালেন। অনেক কাজ আছে। কব্জিগুলি আগে শেষ করা দরকার। যেমন আলতাফের অফিসে ফাইলটা দিয়ে আসতে হবে। প্রতিমাসে ঠিক সময় ইলেকট্রিসিটি বিল দেয়ার পরেও তার ঘরে ইলেকট্রিসিটির লাইন কেন কেটে দিল সেই খোঁজটাও নেয়া দরকার। আলতাফকে হাসপাতালে নিতেই যদি হয়, সন্ধ্যার দিকে নিলেই হবে।
বজলুর রহমান আলতাফের অফিসের ফাইল বগলে নিয়ে প্রথমে আলতাফের কাছে গেলেন। অফিসের ঠিকানাটা দরকার। আলতাফ ঠিকানা বলল, বেশ ভালভাবেই বলল। অফিসটা কোন জায়গায় বুঝিয়ে দিল।
এটা একটা ভাল লক্ষণ। জ্বরে আলতাফের মাথা খারাপ হয়ে যায়নি। বেশি জ্বর উঠলে মাথা খারাপের মত হয়ে যায়।
আলতাফ!
জ্বি।
তোর ফাইলটা দিয়ে আসি।
আচ্ছা।
তোর বড় সাহেবকে বুঝিয়ে বলব যে, বাই মিসটেক তুই ফাইলটা নিয়ে চলে এসেছিলি।
আচ্ছা।
উনাকে রিকোয়েস্ট করব যাতে ভুলটা বড় করে না দেখেন। মানুষমাত্রই ভুল করে। ভুল করাই মানবধর্ম।
জ্বি আচ্ছা।
তুই চিন্তা করিস না। শুয়ে থাক। দুলারী তোর মাথায় পানি ঢালুক।
জ্বি আচ্ছা।
হাসপাতালে যদি নিতেই হয়, সন্ধ্যার দিকে নিয়ে যাব।
