গনি সাহেব ইতস্ততঃ করে বললেন, উনি কখন আসেন কে জানে। আমরা কি এই ফাঁকে একটু খুঁজে দেখব?
দেখতে চাও, দেখ। আমি দুলারীকে বলছি, ও তোমাকে তাদের ঘরে নিয়ে যাবে।
দশ মিনিটের মাথায় গনি সাহেব ফাইল হাতে দোতলা থেকে নেমে এলেন। বজলুর রহমানকে দেখে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, পাওয়া গেছে চাচাজী। খাটের নিচে খবরের কাগজের সঙ্গে ছিল।
বজলুর রহমান বললেন, পাওয়া গেছে বলে এত আনন্দিত হয়ো না। আবার হারাবে। কে জানে কাল অফিসে যাওয়ার সময় হয়ত বসে ফেলে রেখে যাবে।
গনি সাহেব বললেন, আপনাকে কি চাচাজী একটা ছোট্ট রিকোয়েস্ট করব? যদি কিছু মনে না করেন।
মনে করাকরির কি আছে? বল কি রিকোয়েস্ট?
ফাইলটা আলতাফ সাহেবের হাতে না দিয়ে আপনি নিজে যদি নিয়ে যান। বড় সাহেবকে একটু বুঝিয়ে বলেন। স্যার তো খুব রেগে আছেন।
কোন অসুবিধা নেই। আমিই বলব।
আমি যে এসেছিলাম এটা যদি না বলেন তাহলে খুব ভাল হয়। বড় সাহেব আমাকে আবার ঠিক পছন্দ করেন না। উনি যদি শুনেন একজন ফাইল হারিয়েছে আর আমি ছোটাছুটি করছি তাহলে আরো রেগে যাবেন।
না না, তুমি নিশ্চিন্ত থাক। তোমার কখা কিছুই বলব না।
গনি চা খেলেন। মুড়ি খেলেন। দুলারীর সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করলেন। দুলারীর কাজের মেয়ে নেই শুনে দুঃখিত হলেন। যাবার সময় বলে গেলেন, কাল সকালের মধ্যে কাজের মেয়ের ব্যবস্থা করবেন।
এই কাজটা তিনি অবশ্যি ভালই পারেন। কাজের মেয়ের সাপ্লাই চ্যানেল তাঁর খুব ভাল। অফিসের অনেকেরই তিনি এই উপকার করেছেন। দুলারীর জন্যেও একটা ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁর নিজের বাসায় এই মুহূর্তে দুজন আছে। তাদের একজনকে দিয়ে যেতে হবে।
.
আলতাফ বাসায় ফিরল রাত নটার কিছু আগে। সে ভিজে চুপসে গেছে। চোখ লাল। দুলারী বলল, আবার বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে এসেছ? কতক্ষণ ভিজেছ বৃষ্টিতে?
অনেকক্ষণ।
হাত-পা একদম নীল হয়ে গেছে। চোখ লাল। আজ নির্ঘাৎ তোমার জ্বর আসবে।
হুঁ।
তোমাদের অফিসের একজন কলিগ আজ বাসায় এসেছিলেন। নাম হল গনি সাহেব। কি যেন খোঁজাখুঁজি করলেন।
হুঁ।
খুবই ভাল লোক। আমার কোন কাজের লোক নেই শুনে খুব দুঃখ করলেন। বলেছেন, কাল সকাল দশটার মধ্যে একজনকে দিয়ে যাবেন।
হুঁ।
তুমি তো ঘুমুচ্ছ না, তাহলে এমন হুঁ হুঁ করছ কেন? যাও, বাথরুমে গিয়ে কাপড় ছাড়। ভাত দিয়ে দি। আজ আবার মার শরীরটাও খারাপ। মা শুয়ে আছেন।
হুঁ।
দুলারী টেবিলে ভাত বেড়ে আলতাফকে নিতে এসে দেখে আলতাফ ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। তার গা গরম। আলতাফ বলল, আমার ভাল লাগছে না। আমি কিছু খাব না।
দুধ এনে দেই এককাপ। দুধ খাও?
না। তুমি বাতি নিভিয়ে দাও।
দুলারী বাতি নিভিয়ে দিল। তার খানিকটা মন খারাপ হল। বৃষ্টি হচ্ছে দেখে সে আজ তেহারী রান্না করেছে। এই জিনিসটা আলতাফ খুব পছন্দ করে খায়।
দুলারী!
কি?
আমার মাকে যে পোকা খেয়ে ফেলেছিল তা কি তুমি জান?
এসব কি ধরনের কথা?
তুমি জান কি-না বল।
জানি, বাবা বলেছিলেন।
আমার চোখের সামনে তারা মাকে খেয়ে ফেলল।
চুপ কর তো।
আচ্ছা চুপ করলাম। দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘর অন্ধকার করে দাও।
.
১৪.
ওসমান সাহেব থাকেন ধানমণ্ডি আট নম্বরে। চার ইউনিটের নতুন ফ্ল্যাট বাড়িগুলির তিনতলায়। ফ্ল্যাটটি কিনেছেন ওসমান সাহেবের স্ত্রী রেবেকা। ভদ্রমহিলা ডাক্তার এবং পসারওয়ালা বড় ডাক্তার। এদের কোন ছেলেপুলে নেই। স্বামী-স্ত্রী দুজনে বিশাল বাড়িতে বাস করেন। কুকুর, বেড়াল এবং পাখি পুষেন।
মনসুর সাহেব ওসমানদের ফ্ল্যাট বাড়িতে কলিংবেল টিপলেন রাত দশটায়। কলিংবেলে শব্দ হল না। কড়া নাড়তে হল। শব্দ করেই নাড়তে হল। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। ইলেকট্রিসিটি নেই। তবে ঘরে আলো আছে। চার্জলাইট জ্বলছে। ওসমান সাহেব দরজা খুলে বললেন, এত দেরি! আমি সন্ধ্যা থেকে অপেক্ষা করছি।
বৃষ্টি দেখে ভাবছিলাম বৃষ্টি কমলে আসব। মনে হচ্ছে কমবে না, তাই বৃষ্টির মধ্যেই এসেছি।
খেয়ে আসনি তো?
না।
গুড। আমি পূর্বাণী থেকে খাবার আনিয়েছি। আজ রাতে থেকে গেলে অসুবিধা হবে? রেবেকা বাসায় নেই। একা আছি। তুমি থাকলে দুজন মিলে বেচেলারদের মত সারারাত গল্প করব।
বেচেলাররা সারারাত গল্প করে না। এটা নব্য স্বামী-স্ত্রীদের ব্যাপার। রেবেকা কোথায়?
ওর সঙ্গে ভয়াবহ ধরনের ঝগড়া হয়েছে। প্রায় ছাড়াছাড়ি পর্যায়ের ঝগড়া। ও তার বাবার বাসায় চলে গেছে। মনে হচ্ছে আর ফিরবে না।
মনসুর সাহেব কিছু বললেন না। তেমন গুরুত্ব দিলেন না। রেবেকা প্রায়ই প্রচণ্ড রকমের ঝগড়া করে তার বাবার বাসায় চলে যায়, আবার ফিরে আসে। এবারও আসবে। এদের একের অন্যকে ছাড়া গতি নেই।
ওসমান সাহেব বললেন, এসো খেতে বসে যাই। প্যাকেট করা খাবার ঠাণ্ডা হয়ে গেলে মুসকিল।
টেবিলভর্তি খাবার। শিভাস রিগেলের পেটমোটা বোতল। এই ব্যাপারটিও পুরানো। ওসমান সাহেব মদ্যপান করেন শুধু যখন রেবেকার সঙ্গে তাঁর ঝগড়া হয় তখন। মনসুর হাসতে হাসতে বললেন, ঝগড়া মনে হয় গুরুতর পর্যায়ের হয়েছে?
হ্যাঁ।
কি নিয়ে ঝগড়া?
সেটা বলার জন্যেই ডেকেছি।
আলতাফকেও আনতে বলেছিলে–তাকেও বলতে চাচ্ছিলে?
হ্যাঁ, তাকেও বলতে চাচ্ছিলাম। ঝগড়ার সূত্রপাত তাকে নিয়েই। তুমি খেতে শুরু কর, আমি বলি। খানিকটা হুইস্কি দেই? হুইস্কি থাকলে গল্প শুনে আরাম পাবে।
