আলতাফ বসে আছে বেঞ্চিতে। তার হাতে বাদামের ঠোঙা এবং খানিকটা ঝাল লবণ। আলতাফ বাদাম ভেঙে মুখে দিচ্ছে। দুটাকার ঠোঙায় বাদাম থাকে ১৮ থেকে ২৫টা। আজ বাদাম বেশি দিয়েছে–আজ বাদাম আছে ত্রিশটা। শেষ করতে অন্য দিনের চেয়ে বেশি সময় লাগবে। লাগুক। তেমন তাড়া নেই। তবে আকাশের অবস্থা ভাল না। মেঘ ডাকছে। বৃষ্টি হবে। ভাল বৃষ্টি হবে। বৃষ্টি শুরু হলে ভিজতে হবে। ভিজতে তার খারাপ লাগে না। একটাই শুধু সমস্যা হয়। ভেজা কাপড়ে বাসে উঠতে দেয় না। ভিজে গেলে হেঁটে হেঁটে ফিরতে হবে। আলতাফ ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল। আজ তার মনটা খারাপ। শুধু যে খারাপ তা না–বেশ খারাপ।
সে বুঝতে পারছে না সবাই মিলে তার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলছে কেন? সে তো সবই বুঝতে পারছে। গনি সাহেবের কাছে ফাইলটা বর্তমানে আছে। তিনি এই ফাইল নিয়ে আজ রাতে এক সময় তার বাসায় যাবেন এবং বলবেন, আলতাফ সাহেব, আপনার বাসাটা একটু পরীক্ষা করে দেখব। এমন তো হতে পারে, মনের ভুলে ফাইলটা ফেলে গেছেন।
আলতাফ জানে গনি সাহেবের বাজারের ব্যাগে বর্তমানে ফাইলটা আছে। ফাইলটা নিয়ে তাঁর অনেক কাজকর্ম আছে বলে তিনি আজ বাজারে যেতে পারবেন না। গনি সাহেবের স্ত্রী বলে দিয়েছেন, ঘরে কোন সবজি নেই। সবজি লাগবে। আজও সবজি কেনা হবে না। অথচ এই মহিলা মাছ-মাংস কিছু খেতে পারেন না।
সব তথ্য পোকারা আলতাফকে জানাচ্ছে। কেন জানাচ্ছে সে জানে না। কিভাবে জানাচ্ছে তাও বুঝতে পারে না। জানতে না পারলেই বোধহয় ভাল হত। মনের কষ্ট কম হত। এরা তাকে দেখতে পারছে না কেন? সে কি কোন অন্যায় করেছে?
বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে। আলতাফ উঠে দাঁড়াল। হালকা ফোঁটা পড়ছে। বাসস্ট্যান্ডে লোকজন নেই। ইচ্ছা করলে বাসে উঠা যায়। কিন্তু উঠতে ইচ্ছা করছে না।
হেঁটে হেঁটে যাওয়া যাক। পৌঁছতে সন্ধ্যা পার হয়ে যাবে। তাড়া নেই কিছু। আর বাসায় ফিরতে দেরি হলেই ভাল। ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই গনি সাহেব চলে যাবেন। তার সঙ্গে দেখা হোক তা আলতাফ চাচ্ছে না। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। আলতাফ নির্বিকার ভঙ্গিতে বৃষ্টির ভেতর দিয়ে এগুচ্ছে। লোকজন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকে দেখছে। বৃষ্টিতে ভিজে অনেকেই রাস্তায় হাঁটে, তবে তাদের মধ্যে এক ধরনের তাড়া থাকে। কেউ এমন নির্বিকার ভঙ্গিতে হাঁটে না।
.
১৩.
বজলুর রহমান বললেন, কাকে চান?
গনি সাহেব বললেন, আমি আলতাফ সাহেবের খোঁজে এসেছি।
ও তো এখনো বাসায় ফিরে নাই।
সে কি! পাঁচটার সময় উনি অফিস থেকে বের হলেন।
বজলুর রহমান বিরক্তমুখে বললেন, এই গাধার কি কিছু ঠিক আছে? কিছু ঠিক নাই। অফিসে কি করে তাই আমি বুঝি না। আসুন, ভেতরে এসে বসুন।
গনি সাহেব অন্ধকার বসার ঘরে ঢুকলেন। বজলুর রহমান বললেন, আপনাকে অন্ধকার ঘরে বসে থাকতে হবে। গাধাটাকে বুলেছিলাম চল্লিশ পাওয়ারের একটা বাল্ব এনে লাগাতে। লাগিয়েছে ঠিকই কিন্তু বা্ল্ব জ্বলছে না। সমস্যাটা কোথায় সে দেখবে না?
গনি সাহেব বললেন, স্যার, আপনি কাইন্ডলি একটা হারিকেন আনুন। আমি দেখে দিচ্ছি। মনে হয় কোথাও লুজ কানেকশন আছে।
না না, আপনি কি দেখবেন?
কোন অসুবিধা নেই, স্যার। আলতাফ সাহেব আমার কলিগ। খুবই বন্ধু মানুষ।
বজলুর রহমান খুশি হলেন। হারিকেন জ্বালিয়ে নিয়ে এলেন। গনি সাহেব কি করলেন কে জানে–বাতি জ্বলে উঠল। বজলুর রহমান হৃষ্টচিত্তে বললেন, বাবা, তুমি আরাম করে বস, চা খাও। ঘরে কিছু আছে কিনা কে জানে? মনে হয় শুধু চা খেতে হবে।
কোন অসুবিধা নেই, স্যার। চা না পেলেও হবে। আমার চায়ের তেমন অভ্যাস নেই। আলতাফ সাহেব কখন ফিরেন?
কোন ঠিক-ঠিকানা নেই। আগে সকাল সকাল ফিরত। এখন শুনেছি অফিস ছুটির পর কোন এক পার্কে গিয়ে বসে থাকে।
কেন?
কে বলবে কেন? ওর কি মাথার ঠিক আছে? ব্রেইন ডিফেক্ট।
চাচাজী, এসব কি বলছেন?
তোমাদের কলিগ, তোমরা জান না? কি করে অফিস চালায় সেটাই তো আমি বুঝি না। কাজকর্ম কিছু পারে?
উনি তো চাচাজী কাজকর্মে খুব ভাল। তবে…
তবে কি?
রিসেন্টলি একটা সমস্যা হয়েছে।
বজলুর রহমান আগ্রহ নিয়ে বললেন, কি সমস্যা?
থাক স্যার, বলতে চাচ্ছি না।
না না, তুমি বল। কোন অসুবিধা নাই।
অফিসের একটা জরুরি ফাইল হারিয়ে ফেলেছেন। আমাদের বড় সাহেব আবার খুবই রাগী। তিনি ভয়ংকর রেগেছেন। অথচ আলতাফ সাহেবের কোন মাথাব্যথা নেই।
ওর মাথাব্যথা থাকবে কেন? ওর কি মাথা বলে কিছু আছে?
বড় সাহেবের সঙ্গে দেখা করে দু-একটা কথা বললে হত, তাও বলবেন না। এই বাজারে যদি চাকরি চলে যায়, তাহলে অবস্থাটা, চাচাজী, একটু চিন্তা করুন।
চাকরি তো যাবেই। আরো আগেই যাওয়া উচিত ছিল। এখনো কেন যায়নি তাই তো আমি ভেবে পাই না।
বজলুর রহমান অত্যন্ত আনন্দিত বোধ করছেন। তাঁর কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাচ্ছে। এটাই তাঁর আনন্দের বিষয়। গনি সাহেব গলা নিচু করে বললেন, আমার ধারণা, উনি ফাইলটা বাসায় নিয়ে এসেছিলেন, তারপর অফিসে নিতে ভুলে গেছেন। আমি এসেছি একটু খুঁজে দেখতে। উনার তো মাথাব্যথা নেই।
বজলুর রহমান দরাজ গলায় বললেন, যাক, গাধাটার চাকরি চলে যাক। তুমি এই নিয়ে চিন্তা করবে না।
তবু স্যার, আমি ভাবছি একটু যদি খুঁজে দেখি, উনি তো খুঁজবেন না।
ও কিছুই করবে না। ও শুধু দরজা বন্ধ করে ঝিম ধরে বসে থাকবে। আর পোকা নিয়ে ভাববে।
