.
আলতাফ সাহেব!
জ্বি।
বড় সাহেবের কাছ থেকে আসছি।
ও আচ্ছা।
বড় সাহেবের ধারণা, আপনার ফাইল আমরা চুরি করেছি।
আলতাফ চুপ করে রইল। গনি সাহেব বললেন, আপনি স্যারকে এই কথা বলেছেন। তাই না?
আমি কিছু বলিনি।
স্পাইগিরি করছেন? পেয়েছেনটা কি?
আলতাফ তাকিয়ে রইল। গনি সাহেব ক্যান্টিনের দিকে রওনা হলেন। মাথা গরম করলে চলবে না। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। বড় ঝামেলার সময় মানুষ মাথা ঠিক রাখতে পারে না বলেই ঝামেলা সামাল দিতে পারে না। তিনি পর পর দুকাপ চা খেয়ে সিগারেট ধরালেন। মাথা এখন খানিকটা শান্ত হয়েছে–ঘেরাও করার পরিকল্পনা এখন আর সুন্দর পরিকল্পনা বলে মনে হচ্ছে না। অন্য চাল চালতে হবে। মারাত্মক কোন চাল। বড় সাহেব সে চাল ধরতে পারবেন না। কি চাল দেয়া যায়? হারানো ফাইল ফেরত দেয়া যায়। বড় সাহেবকে যদি বলা হয় ফাইল পাওয়া গেছে আলতাফের বাসায়–তাহলেই হল। খুব বিনয়ের সঙ্গে বলতে হবে। এতে বড় সাহেবের গালে একটা চড় দেয়া হবে। মোলায়েম চড়।
ফাইল গনি সাহেবের কাছেই আছে। তাঁর ড্রয়ারে তালাবন্ধ অবস্থায় আছে। যা করতে হবে তা হল–ফাইলটা লুকিয়ে নিয়ে চলে যেতে হবে আলতাফের বাসায়। আলতাফকে বলতে হবে–ভাই, আপনার বাসার কাগজপত্রগুলি একটু খুঁজে দেখুন। এমনও তো হতে পারে যে আপনি মনের ভুলে ফাইল নিয়ে বাসায় চলে এসেছেন। হতে পারে না? একটু খুঁজে দেখুন। আমিও আপনার সঙ্গে খুঁজি। দুজন খুঁজতে থাকবে–তখন গনি সাহেব চেঁচিয়ে বলবেন–পাওয়া গেছে, পাওয়া গেছে। এই তো পাওয়া গেছে। আপনার খাটের নিচেই ছিল। যাক, বাঁচা গেল! সবচে ভাল হয়–ফাইলটা যদি আলতাফ সাহেবকে দিয়েই ফেরত পাঠানো হয়।
গনি সাহেব আরেকটা সিগারেট ধরালেন। পুরো পরিকল্পনাটা আরো ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখতে হবে কোন ভুল-ত্রুটি থেকে গেল কি-না। সামান্য ভুল থাকাও ঠিক হবে না।
ফাইলটা যে এঁর ড্রয়ারে আছে এই খবর অফিসের আর একজনমাত্র মানুষ জানে–স্টোর-ইন-চার্জ খায়রুল কবির। তাঁর নিজের লোক। তা ছাড়া তিনিই চাবি দিয়ে ড্রয়ার খুলেছেন। কাজেই এই খবর বাইরে ছড়াবে না। খায়রুল কবির সাহেব অবশ্যি মাথা গরম লোক। ফট করে মাথা গরম হয়ে যায়। এই জাতীয় লোক মাথা গরম অবস্থায় বেফাস কথা বলে ফেলতে পারে। তাকে সাবধান করে দিতে হবে।
গনি সাহেব উঠলেন। আলতাফের টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন।
আলতাফ সাহেব।
আপনার বাসায় আজ সন্ধ্যায় একটু যাব।
জ্বি আচ্ছা। বিবাহ করেছেন তো–তাই না?
জ্বি।
ভাবীর হাতে এক কাপ চা খেয়ে আসব।
জ্বি আচ্ছা।
অধিকাংশ অফিসেই দেখি কর্মচারিদের যুধ্যে কোন সদ্ভাব নেই। এটা ঠিক না। অফিসের বাইরেও আমাদের একটা জীবন আছে। তাই না?
জ্বি।
গনি সাহেব খায়রুল কবির সাহেবের খোঁজে গেলেন। তাকে এখন বেশ হাসি খুশি দেখাচ্ছে। টেনশান অনেকখানি কমে গেছে। তার মাথায় একটাই চিন্তা। ফাইলটা কী করে আলতাফের বাসায় নিয়ে যাবেন। শীতকাল হলে সমস্যা ছিল না ––কোটের ভেতর নিয়ে যেতে পারতেন। গরম কাল হওয়ায় ঝামেলা হয়ে গেছে। বাজারের ব্যাগে করে নিয়ে যাওয়া যায়। তাঁর সঙ্গে বাজারের ব্যাগ আছে। অফিস ফেরত হাতিরপুল কাঁচাবাজার থেকে কিছু শব্জি নিয়ে যাবার কথা। আজ আর নেয়া হবে না।
.
অফিস ছুটি হবার ঠিক আগে আগে মনসুর সাহেবের টেলিফোন বেজে উঠল। টেলিফোন করেছেন ডঃ ওসমান। কিন্তু তাঁর গলার স্বর অন্যরকম। মনসুর সাহেব গলা চিনতে পারছেন না। মনে হচ্ছে, অনেক দূর থেকে পাতলা গলায় কে যেন কথা বলছে–মনসুর সাহেব বললেন, হ্যালো, কে? কে কথা বলছেন?
আমি বলছি। আমি!
কিছু মনে করবেন না। আমিটা কে?
ওসমান।
ও আচ্ছা। তোমার ঠাণ্ডা লেগেছে না-কি? গলার স্বর চিনতে পারছি না।
তোমাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমি নিজেও আমার গলার স্বর চিনতে পারছি না।
হয়েছে কি?
ভয়াবহ কিছু হয়নি, তবে যা হয়েছে তাকে ঠিক অগ্রাহ্য করাও ঠিক না।
কি হয়েছে?
তুমি বাসায় আস, তারপর বলব।
আসছি। এখনি আসছি।
বাই দ্যা ওয়ে, তোমাদের অফিসের কর্মচারি–কি যেন নাম–আলতাফ না? ও কি আছে?
থাকার কথা না–এখন বাজছে পাঁচটা। সে কাটায় কাঁটায় পাঁচটা বাজলে বিদেয় হয়ে যায়। তবু খোঁজ নিচ্ছি। কেন বল তো?
ওকে আমার দরকার। তাকে নিয়ে আসতে পারবে?
দরকার হলে অবশ্যই নিয়ে আসব।
মনসুর সাহেব আলতাফের খোঁজে লোক পাঠালেন। তাকে পাওয়া গেল না। সে ঠিক পাঁচটার সময়ই বের হয়ে গেছে।
আলতাফ অফিস থেকে সরাসরি বাসায় ফেরে। ফেরার সময় বাসে প্রচণ্ড ভিড় হয়। ভিড় কমার জন্যে সে ইদানিং অফিসের পাশে একটা মিউনিসিপ্যালটি পার্কে অপেক্ষা করে। পার্কটি মিউনিসিপ্যালটির কর্মকর্তারা শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য তৈরি করলেও এটি এখন ভিক্ষুক এবং নেশারুদের দখলে। নেশারুরা আলে সন্ধ্যার পরে। তাদের সঙ্গে আলতাফের দেখা এখনো হয়নি। তবে পার্কের স্থায়ী ভিক্ষুকরা আলতাফকে চেনে। তারা এই লোকটির স্বভাব-চরিত্রও জানে। তারা জানে, এই সাহেব পার্কে ঢোকার মুখে দুটাকার বাদাম কিনবে। পার্কের সবচে উত্তরের বেঞ্চির এক কোণায় চুপচাপ বসে বাদাম খাবে। খাবে খুব ধীরে ধীরে। দুটাকার বাদাম শেষ করতে করতে তার সময় লাগবে এক ঘণ্টার উপর। তখন সে উঠে দাঁড়াবে–যাবে বাসস্ট্যান্ডের দিকে। এই লোকের কাছে ভিক্ষা চেয়ে কোন লাভ হবে না জানে বলেই ভিক্ষুকরা কেউ এখন আর অকে বিরক্ত করে না।
