এই যে আলতাফ সাহেব। কি করছেন একা একা?
গনি সাহেব চা নিয়ে এগিয়ে এলেন।
আলতাফ সাহেব! বসব আপনার সঙ্গে?
বসুন।
আপনি তো দেখি বিরাট ভেজাল লাগিয়ে ফেলেছেন।
কি ভেজাল লাগিয়েছি?
স্টোর-ইন-চার্জ খায়রুল কবির সাহেবকে আপনি নকি চোর বলেছেন? উনি তো দারুণ রেগেছেন। আমি ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করেছি। লাভ হয়নি। উনি বোধহয় বড় সাহেবের কাছে কমপ্লেইন করতে যাবেন। আমার সে রকম মনে হল।
আলতাফ কিছু বলল না। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। গনি সাহেব বললেন, আপনার তো চিন্তার কিছু নেই। বড় সাহেব হলেন আপনার খাতিরের লোক। সিগারেট খাবেন নাকি আলতাফ সাহেব?
আমি সিগারেট খাই না।
খেয়ে দেখুন। টেনশানের সময় কাজে লাগে। ব্রেইন পরিষ্কার হয়। এই সময় ব্রেইনটা পরিষ্কার থাকা দরকার। বড় সাহেবকে ফাইলের ব্যাপারে কি বলবেন ভেবে রাখুন। উনি দারুণ রেগেছেন। আপনাকে এক্ষুণি ডেকে পাঠাবেন।
গনি সাহেব সিগারেট ধরিয়ে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তৃপ্তি ষোলআনা হচ্ছে না। আলতাফ তেমন ভয় পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। আশ্চর্য মানুষ! ভয়ে অস্থির হয়ে যদি তাকে ধরে পড়ত, কান্নাকাটি করত, সে সামাল দিতে চেষ্টা করত। হারানো ফাইলও তো মাঝে মাঝে পাওয়া যায়। আলতাফ পাথরের মত মুখ করে বসে আছে। ভয়-ভীতির কোন লক্ষণ নেই। চাকরি এখনো কনফার্ম হয়নি। এক কথায় চাকরি চলে যাবে–সেই চিন্তাও মাধ্যায় নেই।
নিন, সিগারেট নিন আলতাফ সাহেব।
আমি সিগারেট খাই না।
আহ, একটা খেলে কিছু হবে না।
জ্বি-না।
আচ্ছা থাক। খেতে হবে না। আর শুনুন, এত চিন্তা করবেন না। চিন্তা করে লাভ ত কিছু নেই। যা হবার হবেই।
আলতাফ ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। গনি সাহেব বললেন, যাচ্ছেন কোথায়? বড় সাহেবের কাছে? নিজ থেকে যাওয়া ঠিক হবে না। বড় সাহেব ডাকুক, তারপর যাবেন। এর মধ্যে ভেবে ভেবে একটা প্ল্যান অব একশান বের করুন।
বড় সাহেবের খাস বেয়ারা মকবুল এসে ঢুকল। গনি সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার আপনেরে ডাকে।
গনি সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, আমাকে কেন? তুমি বোধহয় ভুল করছ। উনি আলতাফ সাহেবকে ডাকেন।
জে না। আপনেরে ডাকেন। স্পষ্ট কইরা বলছেন–গনি।
.
গনি সাহেব দরজার বাইরে থেকে বললেন, স্যার আসব?
বড় সাহেব বললেন, ইয়েস! কাম ইন প্লীজ।
তিনি ঘরে ঢুকে হাসিমুখে বললেন, কেমন আছেন স্যার?
বড় সাহেব তার উত্তর না দিয়ে বললেন, বসুন।
তিনি বসলেন। বসতে বসতে তাঁর মনে হল–কিছু একটা হয়েছে। দুয়ে দুয়ে চার মিলছে না। ব্যাপারটা কি?
মনসুর সাহেব ফাইলে চোখ বুলাচ্ছিলেন। ফাইল বন্ধ করে তাকালেন। তাঁর চোখ কালো চশমার আড়ালে বলে গনি সাহেব বড় সাহেবের চোখের ভাব ধরতে পারলেন না। তার অস্বস্তি আরো বাড়ল।
গনি সাহেব?
জ্বি স্যার।
ব্যাপারটা কি বলুন তো?
কি ব্যাপার স্যার? আমি তো কিছু জানি না।
আমি আলতাফ সাহেবকে একটা জরুরি ফাইল দিয়েছিলাম, সেটা জানেন?
জি-না স্যার। আমি তো কিছুই জানি না। কি ফাইল?
মনসুর আলি জবাব দিলেন না। স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন। গনি সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেলেন, তিনি একটা বড় বোকামি করেছেন। ফাইল সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না তা বলা ঠিক হয়নি। কারণ এর মধ্যে স্টোর-ইন-চার্জ খায়রুল কবির নিশ্চয়ই বড় সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছে। কথা প্রসঙ্গে তার কথা আসতে পারে। আসাটাই স্বাভাবিক।
গনি সাহেব!
জ্বি স্যার।
ফাইল সম্পর্কে আপনি কিছুই জানেন না দেখে অবাক হচ্ছি। একটু আগে খায়রুল কবির এসেছিলেন। তিনি বললেন, আপনি এই ফাইল হারানোর ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তিত।
ও আচ্ছা। আমি স্যার কিছুক্ষণ আগেই জেনেছি। আগে কিছুই জানতাম না। আমি ভেবেছি, আপনি জানতে চাচ্ছেন আগে কিছু জানতাম কি না।
মনসুর সাহেব ড্রয়ার খুলে সিগারেটের কেইস থেকে সিগারেট বের করলেন। গনি সাহেব বললেন, আমি স্যার খুব চিন্তা করছি–এটা হল কি করে? ড্রয়ারে তালাবন্ধ করা ফাইল হাওয়ায় তো উড়ে যেতে পারে না।
আপনার কি মনে হয়? কোথায় গেছে?
বুঝতে পারছি না। তবে আলতাফ সাহেব বাসায় নিয়ে যেতে পারেন। মাঝে মাঝে তিনি বাসায় ফাইল নিয়ে যান।
তাই নাকি?
জ্বি।
ও আচ্ছা।
স্যার, আমি কি চলে যাব?
একটু বসুন।
মনসুর আলি সিগারেট টানতে লাগলেন। গনি সাহেব এই ঠাণ্ডা ঘরে বসেও ঘামতে লাগলেন।
গনি সাহেব!
জ্বি স্যার।
ফাইলটা খুব জরুরি। আজ সন্ধ্যার মধ্যে আপনি এটা বের করে দেবেন।
আমি কোত্থেকে বের করব?
আপনি খুব কর্মঠ মানুষ। আপনার বুদ্ধিশুদ্ধিও পরিষ্কার। আপনি কিভাবে বের করবেন তা আপনি জানেন।
স্যার, আপনার কথায় আমি মর্মাহত।
মর্মাহত হবার কিছু নেই। এখন যান–ফাইলের ব্যাপারে ব্যবস্থা করুন।
গনি সাহেব বের হয়ে এলেন। তাঁর কান ঝা ঝা করছে। বড় সাহেব লোকটি ক্ষমার অযোগ্য একটা কাজ করেছে। সরাসরি চোর বলেছে। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। কত বড় সাহস! এত সাহস সে পেল কোথায়? খায়রুল কবির কিছু বলেছে নাকি? বলে ফেলতে পারে। বোকা টাইপের লোক। মনে হচ্ছে, বড় সাহেব তাকে প্যাঁচে ফেলে দু-একটা প্রশ্ন করেছেন, আর সে ভর ভর করে পেটের সব কথা বলে ফেলেছে।
গনি সাহেব অতি দ্রুত চিন্তা করছেন। যে ভাবেই হোক বড় সাহেবকে একটা শিক্ষা দিতে হবে। চোর বলার জন্যে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে হবে। শুধু হাতজোড় করে ক্ষমা চাইলেই হবে না, কাগজে-পত্রেও থাকতে হবে। ইউনিয়ন কি জিনিস এটা বড় সাহেবকে টের পাইয়ে দিতে হবে। কিছু জরুরি টেলিফোন করা দরকার। বড় সাহেবকে ঘেরাও করতে হলে শুধু অফিসের লোক দিয়ে হবে না। বাইরের কিছু লোকজনও দরকার। বড় ধরনের কিছু করতে হলে কয়েকটা জর্দার কৌটা লাগবে। কত ধানে কত চাল তা জানার সময় হয়ে গেছে। গনি সাহেব আলতাফের টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। আলতাফ শুকনো মুখে বসে আছে। একে একটা শিক্ষা দিতে হবে। শালা স্পাই! স্পাইগিরি বের করে দিতে হবে। হাত পা ভেঙে হাসপাতালে দাখিল হয়ে গেলে আর স্পাইগিরি করবে না।
