এরা মানুষের চিন্তা-ভাবনা কাজ-কর্ম নিয়ন্ত্রণ করে।
এটাও নতুন তত্ত্ব। আপনি বলতে চাচ্ছেন যে, আমরা কি করব না করব তা ঠিক করে দেবে পোকারা?
জ্বি স্যার। এরা খুব সূক্ষভাবে করে। চট করে ধরা যাবে না।
আপনার মত দুই-একজন লোক শুধু ধরতে পারে, তাই না?
জ্বি।
মনসুর সাহেব এতক্ষণ চুপ করেছিলেন। তিনি চুপ করে থাকবেন বলেই ভেবেছিলেন, এখন আর কথা না বলে পারলেন না। বিরক্ত গলায় বললেন, তাহলেতো আলতাফ সাহেব, আমাদের ধরে নিতে হয় যে পোকাদের প্রচণ্ড ক্ষমতা।
ঠিক বলেছেন, স্যার। অসম্ভব ক্ষমতা। একবার পৃথিবী জুড়ে প্লেগ মহামারি হল। কোটির উপর মানুষ মারা গেছে। পোকারাই এটা করেছে।
আমি যতদূর জানি প্লেগ ছড়িয়েছিল ইঁদুর।
প্লেগের জীবাণু এনে দিয়েছিল তেলাপোকারা। তারা ইঁদুর দিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছে। পোকার মানুষদের যেমন নিয়ন্ত্রণ করে, অন্য জীব-জন্তুদেরও নিয়ন্ত্রণ করে।
ওসমান সাহেব হাসি চাপার জন্য কয়েকবার কাশলেন। আলতাফ বলল, স্যার, এই পৃথিবীটা পোকাদের। ওরা আমাদের থাকতে দিচ্ছে বলেই থাকতে পারছি। অর্থাৎ আমরা ওদের করুণায় বেঁচে আছি।
ওসমান সাহেব বললেন, আপনার কথা শুনে আনন্দিত হলাম। মজা পাওয়া গেল। শেষ প্রশ্ন–পোকারা এইসব কথা বলার জন্যে আপনাকে খুঁজে বের করল? আরো তো লোক ছিল–না-কি তাদের মতে আপনিই একমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তি? আপনাকে ওদের পছন্দ করার কারণ কি?
ওদের জিজ্ঞেস করিনি।
সময় পেলে জিজ্ঞেস করবেন। আজ উঠি?
জ্বি আচ্ছা, স্যার।
উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ওসমান সাহেব বললেন, পোকাদের একটা ডেমনস্ট্রেশন হলে মন্দ হত না। আলতাফ সাহেব পোকাদের সঙ্গে কথা বলছেন। আমরা শুনছি এরকম একটা কিছু। পারবেন আলতাফ সাহেব?
আলতাফ বলল, জ্বি না স্যার।
কিছু মনে করবেন না আলতাফ সাহেব। আমার ধারণা, আপনি অন্যদের বোকা বানিয়ে আনন্দ পান। এই কাজটি করবেন না।
আলতাফ কিছু বলল না। ওসমান সাহেব বললেন, আপনার উচিত কোন সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে কথা বলা। মানুষকে ভাওতা দিয়ে বেড়ানো এক ধরনের অসুস্ততা। বুঝতে পারছেন?
পারছি স্যার। কিন্তু আমি সত্যি কথাই বলছি।
সত্যি কথা বললে তো ভালই।
ঠিক তখন উড়তে উড়তে ঘরে একটা তেলাপোকা ঢুকল। পোকাটা বসল ওসমান সাহেবের পায়ের কাছে।
আলতাফ চমকে উঠে বলল, ওকে স্যার মারবেন না।
ওসমান সাহেব পোকাটাকে মারতেন না। পোকা মেরে আনন্দ পাবার বয়স তার নেই। কিন্তু আলতাফের কথা শুনেই সম্ভবত–জুতো দিয়ে পিষে ফেললেন।
পথে নেমেই ওসমান সাহেব বললেন, মনসুর, তোমার প্রথম কাজ হচ্ছে–এই মহা বেকুবকে তুমি অফিস থেকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে। তোমার দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে–আমার সময় নষ্ট করার জন্য জরিমানা দেবে। বড় ধরনের জরিমানা।
.
১২.
কড় সাহেব জরুরি একটা ফাইল দিয়েছিলেন। সেই ফাইল আলতাফ ড্রয়ারে তালাবন্ধ করে রেখেছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার, ফাইলটা নেই! ড্রয়ার ঠিকই তালাবন্ধ। ড্রয়ারের চাবি আলতাফের কাছে।
গনি সাহেব পান চিবুতে চিবুতে কাছে এসে বললেন, সমস্যাটা কি?
আলতাফ বলল, ফাইল পাচ্ছি না।
তালাবন্ধ ছিল?
হুঁ।
তাহলে তো রিবাট সমস্যা। চিন্তার বিষয়। ভাল করে চিন্তা করে দেখুন–বাসায় নিয়ে যাননি তো?
না।
এ অফিসে তো এরকম কখনো হয়নি। বদরুল সাহেবকে ইনফর্ম করুন।
তাকে ইনফর্ম করব কেন?
গনি সাহেব বিরক্তমুখে বললেন, আপনি তো ভাই বড় প্যাঁচালের লোক। তাকে ইনফর্ম করবেন না কেন? তিনি হচ্ছেন আপনার সেকশনের চার্জে। যে কোন সমস্যা হলে আগে তাকে বলতে হবে। না-কি আপনি ঘোড়া ডিঙ্গিয়ে ঘাস খাবেন? সরাসরি চলে যাবেন বড় সাহেবের কাছে? আপনার নৌকা তো আবার বড় খুঁটিতে বাঁধা।
আলতাফ ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছে না। কেউ কি ড্রয়ার খুলে ফাইল নিয়ে গেছে? কেন নেবে? স্টোর ইন-চার্জের কাছে বার ড্রয়ারেরই চাবি থাকে। তিনি কি কোন কারণে খুলেছেন? অসম্ভব কিছু না। বড় সাহেব হয়ত ফাইল চেয়েছেন। স্টোর-ইন-চার্জ খুলে দিয়েছেন। এ ছাড়া আর কি হতে পারে?
আলতাফ স্টোর-ইন-চার্জ খায়রুল কবিরকে খুঁজে বের করল। খায়রুল কবির আকাশ থেকে পড়লেন।
কি বলছেন আপনি! আমি কেন আপনার ড্রয়ার খুলব? এ ধরনের এলিগেশন সাবধানে দেবেন।
আমি এলিগেশন দিচ্ছি না। জানতে চাচ্ছি।
ব্যাপার একই। বড় সাহেবের সঙ্গে দহরম-মহরম বলে ধরাকে সরা দেখছেন? পেয়েছেন কি আপনি? কী ভাবেন আমাকে?
আপনি শুধু-শুধু রাগ করছেন।
আপনার সঙ্গে কোন কথা বলতে চাচ্ছি না। দয়া করে বিদেয় হোন। আপনার সাহস দেখে অবাক হচ্ছি। আমাকে সরাসরি চোর বললেন–
চোর তো বলিনি –।
অবশ্যই বলেছেন। ভেবেছেন কি আপনি?
আলতাফ হতভম্ব হয়ে গেল। এই লোকটা এমন করছে কেন? কেন শুধু শুধু রেগে যাচ্ছে? সে নিজের জায়গায় ফিরে এল। কি করবে বুঝতে পারছে না। বড় সাহেবকে জানানো উচিত। সাহসে কুলুচ্ছে না। ভয়-ভয় লাগছে। আলতাফ ড্রয়ার বন্ধ করে ক্যান্টিনের দিকে রওনা হল। ক্যান্টিনে সে কখনো আসে না। এই প্রথম আসা। কোণার দিকে একটা খালি টেবিলে একা একা বসে রইল। ক্যান্টিনের বেয়ারা এক কাপ চা না চাইতেই দিয়ে গেল। অসময়ে চা খাওয়া তার অভ্যাস নেই। তবু সে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না অফিসের মানুষগুলি তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে কেন। সে তো কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে না।
