মনসুর সাহেব বললেন, সরি, আপনাকে কষ্ট দিলাম।
দুলারী বলল, কষ্ট কিসের? কোন কষ্ট না। বলেই খানিকটা অস্বস্তির সঙ্গে বলল, ওর অফিসে কোন ঝামেলা হয়নি তো?
মনসুর সাহেব বললেন, না, কোন ঝামেলা হয়নি। আপনি কোন দুশ্চিন্তা করবেন না।
দুলারী বলল, ওকে নিয়ে আমি খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে খাকি।
ওসমান সাহেব কৌতূহলী গলায় বললেন, দুশ্চিন্তা কেন?
এম্নি দুশ্চিন্তা।
ওসমান সাহেব খানিকটা ঝুঁকে এসে বললেন, উনার পোকার ব্যাপারটা কি আপনি জানেন?
দুলারী হকচকিয়ে গেল। নিজেকে সে চট করে সামলে নিয়ে বলল, ঐসব কিছু না।
আপনার সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হয় না?
মাঝে মধ্যে বলে।
কি বলে?
দুলারী শংকিত গলায় বলল, পোকা নিয়ে কি অফিসে কোন সমস্যা হয়েছে?
মনসুর সাহেব বললেন, না, কোন সমস্যা হয়নি। উনি বলছিলেন, পোকাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আছে। শুনে আমি কৌতূহল বোধ করছি। এরকম তো সাধারণত শোনা যায় না। ব্যাপারটা কি সত্যি?
জানি না।
আপনার সঙ্গে এ নিয়ে কোন আলাপ হয় না?
ও কথাটথা বিশেষ বলে না।
আপনাদের বিয়ে হয়েছে কতদিন হল?
অল্পদিন।
আচ্ছা, আলতাফ সাহেবের এক মামাতো বোন আছে–দুলারী। সে কি এ বাড়িতে আছে?
দুলারী চমকে উঠে বলল, আমার নামই দুলারী।
মনসুর সাহেব অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, আচ্ছা আচ্ছা। আলতাফ সাহেব তার মামাতো বোনের কথা আমাকে বলেছিলেন, কিন্তু তাকেই বিয়ে করেছেন তা বলেননি।
ও নিজ থেকে কিছু বলবে না। জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেবে। জিজ্ঞেস না করলে চুপ করে থাকবে।
আপনি পোকাদের ব্যাপারে তাঁকে কিছু জিজ্ঞেস করেননি?
করেছি।
উনি কি বলেন–আসলেই পোকারা তাঁর সঙ্গে কী বলে?
হুঁ।
আপনি তাঁর কথা বিশ্বেস করেন?
হুঁ।
কেন বিশ্বেস করেন? আপনি কি কোন প্রমাণ পেয়েছেন?
না।
তাহলে বিশ্বেস করেন কেন?
ও তো কখনো মিথ্যা কথা বলে না।
আলতাফ এই পর্যায়ে বাজারের ব্যাগ হাতে ঘরে ঢুকল। মনসুর সাহেবেকে দেখে সে মোটেই অবাক হল না। যেন এটাই স্বাভাবিক। অফিসের বড় সাহেবকে সন্ধ্যাবেলা ঘরে বসে থাকতে দেখা যেন খুবই সাধারণ ঘটনা। মনসুর সাহেবই আগ বাড়িয়ে কথা বললেন, আলতাফ সাহেব, ভাল আছেন?
জ্বি স্যার।
বাজার করে ফিরলেন?
জি স্যার।
আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্যে এসেছি। আমার বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। উনি ডঃ ওসমান। মাস্টারি করেন। আপনি বরং হাত-মুখ ধুয়ে আসুন।
জ্বি আচ্ছা, স্যার।
আমরা অসময়ে এসে আপনার অসুবিধা করলাম না তো?
জ্বি না।
মনসুর সাহেব কৈফিয়ত দেবার মত ভঙ্গিতে বললেন, পোকা-মাকড় হচ্ছে আমার বন্ধুর বিষয়। সে এই বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়। তার আগ্রহেই আপনার কাছে আসা।
জ্বি আচ্ছা, স্যার।
যান, আপনি হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসুন।
আলতাফ চলে গেল। আলতাফের সঙ্গে দুলারীও বের হয়ে গেল। তার অনেক কাজ। রান্না চড়াতে হবে। ঘরে মসলা নেই। মসলা পিষতে হবে। বাজারের গুঁড়া মসলা বজলুর রহমান খান না। ঘরে কাজের লোক নেই।
ডঃ ওসমান মনসুর সাহেবের দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, বেকুব ধরনের মানুষ বলে মনে হচ্ছে।
মনসুর কিছু বললেন না। ডঃ ওসমান বললেন, এদের পেছনে সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না।
চলে যেতে চাও?
এসেছি যখন বসি।
আলতাফ এসে সামনে বসল। তার বসার ভঙ্গিতে কোন রকম দ্বিধা বা সংকোচ দেখা গেল না। ডঃ ওসমান হাসিমুখে বললেন, আলতাফ সাহেব, আপনার পোকাদের বিষয়ে কিছু বলুন।
কি বলব?
যা বলতে চান বলুন।
কিছু বলতে চাই না, স্যার।
বলায় সমস্যা আছে?
জ্বি না। ইচ্ছ! করে না।
ওসমান সাহেবের ভ্রু কুঁচকে উঠল। লোকটা যে নির্বোধ এ বিষয়ে তিনি পুরোপুরি নিঃসন্দেহ হলেন। একমাত্র নির্বোধরাই অফিসের বড় সাহেবের সামনে এমন ভঙ্গিতে কথা বলার সাহস পায়। ওসমান সাহেব কঠিন গলায় বললেন, আমি শুনেছি পোকাদের সঙ্গে আপনার ভাবের আদান-প্রদান হয়।
আলতাফ চুপ করে রইল। ওসমান সাহেব অসহিষ্ণু স্বরে বললেন, জবাব দিচ্ছেন না কেন? ওদের চিন্তা-ভাবনা আপনি নাকি বুঝতে পারেন?
সবসময় পারি না। ওরা যখন ইচ্ছা করে তখনই শুধু বুঝি। ওরা ইচ্ছা না করলে পারি না।
ওদের কথা বুঝতে হলে তো ওদের বুদ্ধিবৃত্তি আপনার স্তরে আসতে হবে।
ওদের অনেক বুদ্ধি, স্যার।
তাই নাকি?
জি।
ওদের বুদ্ধির একটা প্রমাণ দিতে পারেন?
আলতাফ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমার বাসায় যে তেলাপোকা আছে সে যে কোন সময় আমেরিকার একটা তেলাপোকার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। মানুষ তা পারে না।
ডঃ ওসমান হেসে ফেলতে যাচ্ছিলেন। অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বললেন, তাহলে তো ইচ্ছা করলে আপনি যে কোন মুহূর্তে একটা খবর তেলাপোকার মাধ্যমে আমেরিকায় পাঠিয়ে দিতে পারেন। আপনি একটা কাজ করুন তো …
কি কাজ?
আমার এক ভাই থাকে ক্যালিফোর্নিয়ার পেনসিলভেনিয়ায়। তার ঠিকানা দিচ্ছি। আপনি তেলাপোকার মাধ্যমে খবর এনে দিন ওদের ছেলেমেয়ে কটি। তাহলে বুঝব আপনার তেলাপোকার ক্ষমতা আছে। পারবেন না?
জি না, স্যার।
পারবেন না কেন?
আমরা যেমন ঠিকানা বলি–এত নং বাড়ি, এই রাস্তার নাম–সেটা তেলাপোকাদের অজানা। আমি আমেরিকা বললেও কিছু বুঝবে না। তারা জায়গা চিনে গন্ধ দিয়ে। ওদের কাছে এক এক জায়গার এক এক রকম গন্ধ।
ও আচ্ছা, একেক জায়গার একেক রকম গন্ধ।
জ্বি স্যার।
ভাল। নতুন জিনিস জানা গেল।
