পাগলাগারদে?
অবশ্যি পাগলাগারদে।
শুধু শুধু একটা লোক কেন বলবে–সে পোকাদের কথা বুঝতে পারে?
অন্যদের বোকা বানানোর জন্যে বলবে। তোমার অফিসের ঐ কর্মচারি তোমাকে এই কথা বলেছে, কারণ, সে তোমাকে বোকা বানাতে চেয়েছে। তার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। তুমি বোকা বনেছ। কারণ তুমি খানিকটা হলেও ব্যাপারটা বিশ্বাস করেছ।
আমার অফিসের ঐ কর্মচারিটা বোকা ধরনের। আমার মনে হয় না সে আমাকে বোকা বানাতে চায়।
তাহলে ধরে নিতে হবে–তোমার ঐ কর্মচারিটির মাথা খারাপ। কায়দা করে তাকে দু-একটা প্রশ্ন করলেই পুরো ব্যাপার বের হয়ে যাবে। তুমি কি তাকে জেরা করেছ?
না।
জেরা কর। সহজ জেরা না। ঘাঘু উকিলের জের। দেখবে সব বের হয়ে আসবে। তারপর তাকে গলাধাক্কা দিয়ে অফিস থেকে বের করে দাও। এ জাতীয় লোক প্রতিষ্ঠানের জন্যে ক্ষতিকর।
মনসুর সাহেব চুপ করে রইলেন। ওসমান সাহেব বললেন, তোমার হয়ে আমি তাকে প্রশ্ন করতে পারি। করব?
বেশ তো কর। এখনি চল আমার সঙ্গে। যাবে?
ওসমান সাহেব বললেন, যাওয়া যেতে পারে।
.
তাঁরা অফিসে পৌঁছলেন পাঁচটার কিছু পরে। আলতাফকে পাওয়া গেল না। সে ঠিক পাঁচটায় অফিস থেকে বের হয়ে গেছে।
ওসমান সাহেব বললেন, লোকটার বাসায় যাওয়া যায়। সেটাই ভাল হবে। বাসার ঠিকানা জানা আছে?
মনসুর সাহেব বললেন, ঠিকানা বের করা কোন সমস্যা না। তুমি কি সত্যি যাবে?
হ্যাঁ যাব।
চল যাই। যদিও আমার এখন মনে হচ্ছে আমরা খানিকটা বাড়াবাড়ি করছি।
ওসমান সাহেব কিছু বললেন না। তার মুখের বিরক্ত ভাব আরো স্পষ্ট হল। তিনি কোন রকম আগ্রহ বোধ করলেন না। তবে তা মনসুর সাহেবকে জানাতে চান না। ক্ষমতাবান বন্ধুদের সামান্য আগ্রহকেও বড় করে দেখতে হয়। এটাই নিয়ম। একটা লোক পোকার সঙ্গে কথা বলে–ব্যাপারটাই হাস্যকর। হাস্যকর জেনেও তিনি প্রশ্রয় দিচ্ছেন, কারণ মনসুরকে প্রশ্রয় দিতে হয়। সবাই দেবে। সমাজ এটা ঠিক করে দিয়েছে।
দরজার কড়া নড়ছে
১১.
অনেকক্ষণ ধরে দরজার কড়া নড়ছে। সন্ধ্যাবেলা কেউ এলে বজলুর রহমান অত্যন্ত বিরক্ত হন। বেকুব লোকজন বেছে বেছে সন্ধ্যাবেলা মানুষের বাসায় যায়। এদের কানে ধরে ঠাশ করে মাথায় একটা বাড়ি দেয়া উচিত। সভ্য সমাজে বাস করে এই কাজ করা সম্ভব না। বজলুর রহমান দরজা খুললেন। দূজন লোক দাঁড়িয়ে। একজনের চোখে আবার সন্ধ্যাবেলাতেই কাল চশমা।
এটা কি আলতাফ সাহেবের বাসা?
বজলুর রহমান বিরক্ত গলায় বললেন, এটা আলতাফের বাসা হবে কেন? এটা আমার বাসা। বাসাও না, এটা হল বাড়ি। আমার নিজের বাড়ি।
আলতাফ সাহেব কি ভাড়াটে?
হ্যাঁ, ভাড়াটে বলা যায়। তবে ওর কাছ থেকে ভাড়া নেই না। আমি ওর মামা। আপনারা কে?
আমরা উনার অফিসেই আছি।
কলিগ?
জ্বি, কলিগ। আলতাফ সাহেব কি বাসায় আছেন?
না, নেই। কাঁচা বাজারে পাঠিয়েছি। ঘরে দুদিন ধরে বাজার নেই। আপনারা বসুন, এসে পড়বে।
আসতে কি দেরি হবে?
দেরি হবার কথা না। তবে গাধা টাইপের ছেলে তো–হতেও পারে। কিছুই বলা যায় না।
আমরা না হয় কিছুক্ষণ বসি?
বসুন।
বজলুর রহমান বসার ঘর খুলে দিলেন। ঘর অন্ধকার। বজলুর রহমান বিরক্ত গলায় বললেন, অন্ধকারে বসে থাকতে হবে। ইলেকট্রিক লাইনে গণ্ডগোল হয়েছে। বাতি জ্বলে না। গাধাটাকে বলেছি একটা মিস্ত্রি ডেকে আনতে। সেটা মনে থাকে না। আপনারা বসুন, দেখি ঘরে মোম-টোম কিছু আছে কিনা।
মনসুর সাহেব বললেন, আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না।
ব্যস্ত হচ্ছি না। ঘরে মোমবাতি আছে কি না সেটা খোঁজা কোন ব্যস্ততা না। আপনারা চা খাবেন?
ওসমান সাহেব বললেন, অসুবিধা না হলে খেতে পারি।
অসুবিধা তো হবেই। সন্ধ্যাবেলা হল কাজকর্মের সময়, নামাজের সময়। তার উপর ঘরে নেই কাজের লোক। অসুবিধা হবে না তো কি?
তাহলে থাক।
থাকবে কেন? চা খেতে চেয়েছেন, খাবেন। অসুবিধা হলেও ব্যবস্থা হবে।
বজলুর রহমান ঘর ছেড়ে বের হয়ে গেলেন। ওসমান সাহেব নিছু গলায় বললেন, ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার। এই পরিবারের একজন সদস্য পোকার সঙ্গে কথা বলবে, এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এটাই স্বাভাবিক।
মোমদানে মোমবাতি নিয়ে ঘরে ঢুকল দুলারী। মনসুর সাহেব এবং ড: ওসমান দুজনই চমকে উঠলেন। অসম্ভব রূপবতী একজন তরুণী। মোমবাতি হাতে ধরে ঢুকতেই ঘরের চেহারা পাল্টে গেল। দুলারী বলল, ও এসে পড়বে। আপনারা একটু বসুন। আমি চা দিচ্ছি। বাবা নামাজ পড়ছেন। আপনাদের কিছুক্ষণ একা একা বসতে হবে।
মনসুর সাহেব বললেন, কোন অসুবিধা নেই।
দুলারী বলল, আপনারা কি ওর অফিস থেকে এসেছেন?
জ্বি।
অফিসে কি কোন ঝামেলা হয়েছে?
না, কোন ঝামেলা হয়নি। আপনার পরিচয় কি জানতে পারি?
দুলারী লজ্জিত গলায় বলল, আমি ওর স্ত্রী।
তারা দুজন আবারো একটা ধাক্কা খেলেন। বড় ধরনের ধাক্কা। আলতাফ টাইপের লোকদের যেন এ রকম স্ত্রী মানায় না। এরকম স্ত্রী থাকা উচিতও নয়। এদের স্ত্রীরা হবে হাবাগোবা ধরনের। কালো, রোগ মুখে মেছেতার দাগ। ঘরের কাজ সারতে সারতে যাদের নাভিশ্বাস উঠবে। যাদের কোলে সব সময় রোগভোগা একটা শিশু থাকবে। যার একমাত্র লক্ষ্য থাকবে মায়ের বুকের দুধের দিকে।
.
দুলারী চা নিয়ে ঢুকল। শুধু চা। মনসুর সাহেব লক্ষ করলেন, কাপ পরিস্কার, পিরিচে চা জমে নেই। তারচেয়েও বড় কথা–তিনটা কাপ। মেয়েটিও বোধহয় তাঁদের সঙ্গে চা খাবে। এইসব পরিবারে এ ধরনের ভদ্রতা ঠিক আশা করা যায় না। এরা সচরাচর সর-ভাসা ঠাণ্ডা চা কাজের লোক দিয়ে পাঠিয়ে দেয়। একটা পিরিচে থাকে মিয়ানো টক স্বাদের কিছু বাসি চানাচুর।
