তাঁর ব্যক্তিগত বেয়ারা মকবুল ছুটে এল।
কাল ঘরে এরোসল দিয়েছিলে?
একটা পুরা বোতল দিছি স্যার।
কাছে আস তো।
মকবুল ভয়ে ভয়ে কাছে এগিয়ে এল। মনসুর সাহেব সহজ গলায় বললেন, টেবিলের গায়ে এই যে পোকা, এদের দেখতে পাচ্ছ?
পাচ্ছি স্যার।
কি পোকা এগুলি জান?
জানি না স্যার।
একটা পরিষ্কার বোতল জোগাড় কর। বোতলে কয়েকটা পোকা ভর।
জি আচ্ছা স্যার।
মকবুল বোতল আনতে ছুটে গেল। মনসুর সাহেব টেলিফোন হাতে তুলে নিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে টেলিফোন করবেন। ভঃ ওসমান সেখানে আছেন। বিলেতে তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। ভাল পরিচয়। বিদেশের অন্তরঙ্গতা দেশে এলে থাকে না। তাদের রয়ে গেছে। মাঝে মাঝে তাদের কথা হয়। মনসুর সাহেব ঠিক করলেন ওসমানকে জিজ্ঞেস করবেন–এই পোকাগুলির নাম কি? এতে লাভ কি হবে? আপাতত তিনি কোন লাভ দেখতে পাচ্ছেন না। জানার জন্যেই জানা। মকবুল খালি বোতল নিয়ে এসেছে। বোতলে পোকা ভরার চেষ্টা করছে। ফাঁকে ফাঁকে বড় সাহেবের দিকে তাকাচ্ছে। মনসুর সাহেব খুব বিরক্তি বোধ করছেন।
.
গনি সাহেব লক্ষ্য করলেন আলতাফ চোখ বন্ধ করে আছে। দীর্ঘ সময় চোখ বন্ধ করে থাকে, তারপর চোখ খুলে–কাগজে কি-সব যেন লিখে–আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে। গনি সাহেব এগিয়ে গেলেন।
কি করছেন আলতাফ সাহেব?
আলতাফ চোখ মেলে শান্ত গলায় বলল, এখন যান।
করছেনটা কি?
একটা জরুরি কাজ করছি।
আমি তো দেখছি চোখ বন্ধ করে আছেন, মাঝে মাঝে বিড় বিড় করছেন।
প্লীজ, এখন বিরক্ত করবেন না।
এমন কি কাজ যে চোখ বন্ধ করে থাকতে হয়। চোখ বন্ধ করে একটা কাজই ভাল করে করা যায়। তার নাম ঘুম।
গনি সাহেব, দয়া করে আমাকে বিরক্ত করবেন না।
আচ্ছা ভাই, আচ্ছা। আর বিরক্ত করব না। আপনি বড় সাহেবের পেয়ারের লোক। বিরক্ত করে শেষে কোন ঝামেলায় পড়ি! শেষে দেখা যাবে চাকবিই খতম। নো জব। ছেলেমেয়ে নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।
আলতাফ কিছু বলল না। চোখ বন্ধ করে ফেলল। তাকে পোকাদের সাহায্য নিয়ে লেখাটা শেষ করতে হচ্ছে। তারা তেমন সাহায্য করে না। একটা শব্দ বলে আবার সেটা দিয়ে অন্য শব্দ বলে। আলতাফ লিখেছে–
হে মানব সম্প্রদায়। তোমাদের জন্যে আছে অন্ধকার ভবিষ্যৎ। কারণ তোমরা অন্ধকারের জীব। তোমাদের সৃষ্টি হয়েছিল অন্ধকারের জন্যে। তোমরা সেখানেই ফিরে যাবে। ফিরে যেতে হবে শুরুতে।
একই লেখা আবার অন্যভাবে লিখতে হয়েছে। কারণ পোকারা কিছু কিছু শব্দ বদলে দিয়েছে। আলতাফ আবার লিখল–
অভিবাদন মানব সম্প্রদায়! তোমাদের জন্য আছে মঙ্গলময় অন্ধকার। কারণ তোমাদের মঙ্গল অন্ধকারে। মঙ্গলের জন্য তোমাদের সৃষ্টি। তোমরা সৃষ্টিতে ফিরে যাবে। এক বিন্দুতেই আদি ও অন্ত।
এ নিয়ে মোট চারটা অনুবাদ তৈরী হল। আলতাফ এই চারটার মধ্যে কোনটা রাখবে বুঝতে পারছে না। পোকারা বলছে–কোনটা ফেলা যাবে না। প্রতিটিই সত্য। সত্য এক ও অভিন্ন নয়। সত্যের অনেক ছবি। প্রতিটি ছবি আলাদা আলাদা সত্য।
.
১০.
ডঃ ওসমান বোতলে ভর্তি পোকাগুলির দিকে তাকিয়ে আছেন। মনসুর বললেন, এদের নাম কি?
ডঃ ওসমান হাসিমুখে বললেন, এদের নাম হল পোকা। ইনসেক্ট।
কি পোকা?
বৈজ্ঞানিক নাম চাও, না সাধারণ নাম হলেই চলবে?
সাধারণ নাম জানলেই হবে।
এরা এক ধরনের উইপোকা। উইপোকার অনেক ভ্যারাইটি আছে। এটা হল বিশেষ এক ভ্যারাইটি। এরা সাধারণত মৃত জীবজন্তুর গায়ে ঘুরে বেড়ায়। দেখতে পিঁপড়ার মত হলেও পিপড়াদের সঙ্গে তাদের খানিকটা প্রভেদ আছে। পিপড়ার মৃত জীবজন্তু খেয়ে ফেলে। এরা খায় না। শুধু ঘুরে বেড়ায়।
কেন?
কেন তা জানি না। ওদের জিজ্ঞেস করা হয়নি।
ডঃ ওসমান শরীর দুলিয়ে হাসতে লাগলেন। মনসুর সাহেব বন্ধুর হাসিতে যোগ দিতে পারলেন না। রসিকতা কখনোই তাঁকে আকর্ষণ করে না। হাসি থামিয়ে ওসমান সাহেব বললেন, মুনসুর!
হু।
হঠাৎ পোকা নিয়ে মেতেছ কেন? পোকা তোমার বিষয় না।
মানুষের বিষয় তো বদলায়। তোমার কি বদলেছে?
বুঝতে পারছি না। আচ্ছা, আরেকটা কথা–পোকাদের কি বোধশক্তি আছে? মানে চিন্তা বা কল্পনা করার ক্ষমতা আছে?
বোধ চিন্তা কল্পনা এইসব উচ্চমার্গের বিষয়ের জন্যে দরকার মস্তিষ্ক, ঘিলু। তা পোকাদের নেই বললেই হয়। ওরা বেঁচে থাকে instinct-এর উপর। ওদের চালিকাশক্তি instinct, মস্তিষ্ক নয়।
ঘিলুর পরিমাণ বেশি থাকলেই বোধ চিন্তা এবং কল্পনা এইসব বেশি থাকবে?
অবশ্যই।
গরু এবং গাধার মাথায় তো অনেকখানি মগজ থাকে। অন্তত মুরগির চেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু গরুর বোধ বা বুদ্ধি কোনটাই মুরগির চেয়ে বেশি না।
ডঃ ওসমান কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে বললেন, তোমার মূল সমস্যাটা বল। তারপর যুক্তিতর্কে যাওয়া যাবে।
সমস্যা কিছু না।
কিছু না বললে তো হবে না। কিছু-একটা তো আছেই। What is that?
মনসুর সাহেব সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, আমাদের অফিসের একজন কর্মচারি–তার ধারণা, সে পোকাদের সঙ্গে কমুনিকেট করতে পারে। পোকার তার সঙ্গে কথা বলে।
ওসমানি সাহেব মোটেই চমকালেন না। স্বাভাবিক গলায় বললেন, পৃথিবীতে অনেক লোক আছে যারা জ্বীন, পরী বিশ্বাস করে। এদের সঙ্গে তারা কথা বলে। অনেকে আছে যারা প্রেতাত্মার সঙ্গে কথা বলে। তাতে কি যায় আসে। পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ। তাদের অতি ক্ষুদ্র এক ভগ্নাংশ কি বলছে না বলছে তা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের স্থান হওয়া উচিত পাগলাগারদে।
